পৃথিবীতে মেসিরা একবারই আসে
পেলের খেলা দেখিনি। ম্যারাডোনার সময়টাও খুব ছোট ছিলাম। তাই ফুটবলটা তখন কতটা বুঝতাম, সেটাও মনে নেই। কিন্তু প্রাণভরে মেসির খেলা উপভোগ করেছি। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে মেসি যে আনন্দ দিয়েছেন, তার কোনো তুলনা হয় না।
মেসি মানেই যেন অনেক কিছুর সমাহার।
একদিকে ব্যক্তি মেসি—এত বিনয়ী, এত নম্র, এত সহজ-সরল একজন মানুষ, ভাবাই যায় না। মানুষের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার এতটাই আন্তরিক যে এত বড় একজন তারকা হয়েও তাঁকে কখনো দূরের মানুষ মনে হয়নি।
অন্যদিকে খেলোয়াড় মেসি—যেন যুদ্ধের মাঠের এক সেনাপতি, এক লড়াকু যোদ্ধা। শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়ে যান। দেশের জন্য তাঁর ভালোবাসা ছিল অনন্য। অন্য অনেক দেশ থেকে প্রস্তাব এলেও নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসাকে কখনো বিসর্জন দেননি।
অধিনায়ক হিসেবে শুধু নিজে খেলেননি, জানতেন কার কাছ থেকে কীভাবে সেরাটা বের করে আনতে হয়। দলের ঐক্যকে যেভাবে ধরে রেখেছেন, সেভাবে খুব কম খেলোয়াড়কেই দেখেছি। তাঁর সতীর্থরা যেন তাঁর জন্য মাঠে জীবন দিয়ে লড়তে প্রস্তুত থাকতেন। এই বন্ধনই ছিল অমূল্য।
মেসির সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি ছিল—তিনি শুধু নিজের জন্য খেলতেন না। নিজে গোল করার সুযোগ পেয়েও সতীর্থকে বল বাড়িয়ে দিয়েছেন। আবার কখনো নিজেই সতীর্থকে দিয়ে গোল করিয়েছেন। তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছেন, উজ্জীবিত করেছেন। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চেও সতীর্থদের উৎসাহ দেওয়া, পুরস্কৃত করা—এসব তাঁর নেতৃত্বকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
অন্য স্ট্রাইকাররা যেখানে গোলের সুযোগ পেলেই গোল করার চেষ্টা করেন, মেসি সেখানে যেন প্রতিপক্ষের দুর্বল জায়গাটা খুঁজে বের করতেন। কোথায় ফাঁক, কোথায় দুর্বলতা—সব যেন তাঁর চোখে ধরা পড়ত। ডানে যাওয়ার ভান করে মুহূর্তেই বাঁয়ে বল ছুড়ে দেওয়া, একমুহূর্তে জায়গা বদলে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে ফেলা—মেসির মুভমেন্ট বোঝা ছিল অসম্ভব কঠিন।
আর মেসির সেই বাঁকানো শট—যেন বলটাকে কোনো অদৃশ্য সুতায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কর্নার থেকে কোথায় বল ফেলতে হবে, মনে হতো যেন গজফিতা দিয়ে মেপে রেখেছেন। কখনো মাঠে ধীরপায়ে হাঁটছেন, পরের মুহূর্তেই সেই মানুষটি ক্ষিপ্র চিতার মতো ছুটে যাচ্ছেন। প্রতিপক্ষ বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ।
মেসি যেন এক জাদুর বাক্স। কখন কী বের হবে, কেউ জানত না। কিন্তু ভক্তরা জানতেন—তিনি কিছু না কিছু করে দেখাবেনই।
প্রবল খ্যাতি, অর্থ আর মানুষের ভালোবাসা অনেক সময় মানুষকে বদলে দেয়। মেসিকে বদলাতে পারেনি। মাঠের বাইরে তিনি একজন সাদাসিধে মানুষ—একজন স্বামী, একজন বাবা, একজন পরিবারের মানুষ। সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটান, হাসিঠাট্টা করেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। এত বড় তারকা হয়েও তাঁর জীবনযাপনের সরলতা আজও মুগ্ধ করে।
মেসি হয়তো শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি একটি প্রজন্মের শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য আর অসংখ্য স্মৃতির অংশ।
কত রাত জেগে মেসির খেলা দেখেছি। কত গোলের পর আনন্দে চিৎকার করেছি। কতবার মনে হয়েছে—এই মানুষটি হয়তো আরেকবার অসম্ভবকে সম্ভব করবেন। এমনকি প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের মধ্যেও মেসির জন্য পাগল ভক্ত আছে। এটাই তো কিংবদন্তির পরিচয়।
মেসি নিজেকেও যেন বারবার ছাড়িয়ে গেছেন।
একসময় মনে হতো, মেসি হয়তো শুধু অসাধারণ একজন ফুটবলার। পরে বুঝলাম, তিনি একটি প্রজন্মের আবেগ।
অনেকে আসবেন, অনেকে চলে যাবেন। নতুন তারকা জন্ম নেবে। নতুন রেকর্ড হবে। নতুন নায়ক তৈরি হবে। কিন্তু মেসিকে মুছে ফেলা যাবে না।
কারণ, কিছু মানুষ শুধু মাঠে খেলেন না, তাঁরা মানুষের মনের ভেতর জায়গা করে নেন।
হয়তো আর আগের মতো মেসির পায়ের সেই কারুকাজ দেখা যাবে না। হয়তো সেই দৌড়, সেই ড্রিবলিং, সেই নিখুঁত পাস, সেই বাঁকানো শট—একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে।
কিন্তু মেসি আমাদের যে আনন্দ দিয়েছেন, যে আবেগ দিয়েছেন, যে অসংখ্য রাত জাগিয়েছেন, যে মুহূর্তগুলোয় আমাদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন, বুকভরে গর্ব করতে শিখিয়েছেন—সেগুলো কখনো পুরোনো হবে না।
আসলে কিংবদন্তিদের বিদায় হয় না।
তাঁরা মাঠ থেকে সরে যান, কিন্তু মানুষের মন থেকে নয়।
মেসিও থাকবেন।
কোনো পুরোনো ভিডিওতে, কোনো গোলের রিপ্লেতে, কোনো রাতজাগা স্মৃতিতে, কোনো শিশুর পায়ে ফুটবল নিয়ে ছুটে চলার মধ্যে।
আর আমরা হয়তো একদিন নিজেদের সন্তানদের বলব,‘আমাদের সময়ে একজন মেসি ছিলেন। এমন একজন, যাঁকে দেখে আমরা ফুটবলকে শুধু খেলা হিসেবে দেখিনি—ভালোবাসতে শিখেছিলাম।’
পৃথিবীতে অনেক ফুটবলার আসবেন, অনেক কিংবদন্তি তৈরি হবেন।
কিন্তু মেসিরা পৃথিবীতে একবারই আসে।
লেখক: বেসরকারি চাকরিজীবী। ঠিকানা: ৭৬ বি খাজা প্লাজা, বনানী-১১, ঢাকা
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]