ছয় বিন্দুর জাদুকরি বিপ্লব: অন্ধকারের দেয়ালে আলোর হাতছানি
আজ ৪ জানুয়ারি, বিশ্ব ব্রেইল দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি আমাদের কাছে কেবল একটি সাধারণ তারিখ মনে হতে পারে, কিন্তু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা যাঁদের দুই চোখে কোনো আলো নেই, তাঁদের কাছে এটি এক পরম আশার দিন।
আজ থেকে প্রায় দুই শ বছর আগে ১৮২৪ সালের কথা। ফ্রান্সের এক ছোট্ট ছেলে লুই ব্রেইল মাত্র তিন বছর বয়সে এক দুর্ঘটনায় নিজের চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছিলেন। সেই অন্ধকার শৈশবে লুই দমে যাননি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি আবিষ্কার করলেন এমন এক জাদুকরি লিখনপদ্ধতি, যা আজ কোটি কোটি দৃষ্টিহীন মানুষের হাতের আঙুলে জ্ঞানের মশাল জ্বেলে দিয়েছে। তিনি কাগজের ওপর ছোট ছোট ছয়টি বিন্দু উঁচু করে এক বিশেষ কৌশল তৈরি করলেন, যা স্পর্শ করলেই অন্ধকারের মানুষগুলো পৃথিবীর সব বর্ণমালা আর সংখ্যা চিনতে পারেন। অতীতের দিকে ফিরে তাকালে বুকটা হাহাকার করে ওঠে। একটা সময় ছিল যখন মানুষ ভাবত, যাঁদের চোখ নেই, তাঁদের বুঝি আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু লুই ব্রেইলের সেই ছোট ছোট ছয়টি বিন্দু এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এল।
লুই আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে চোখের আলো হারিয়ে গেলেও মনের আলো আর ইচ্ছাশক্তি দিয়ে জগৎ জয় করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশে এই ব্রেইল শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে দেশের ৬৪টি জেলায় সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। এর পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালের মতো বড় শহরগুলোতে রয়েছে বিশেষায়িত সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রতিবছর হাজার হাজার ব্রেইল বই বিনা মূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। বিশেষ করে টঙ্গীর সরকারি ব্রেইল প্রেসের আধুনিকায়ন এই প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করেছে।
এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এনজিওগুলো ব্রেইল লাইব্রেরি ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই আলোর মশাল গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে দিচ্ছে। আজকের এই আধুনিক সময়ে কেবল কাগজের বই নয়, কম্পিউটার ও মুঠোফোনেও ব্রেইল পদ্ধতি ব্যবহার করা যাচ্ছে। ‘রিফ্রেশেবল ব্রেইল ডিসপ্লে’ এবং ‘মাল্টিমিডিয়া টকিং বুক’-এর মতো প্রযুক্তি এখন দৃষ্টিহীনদের পড়ার টেবিলকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। লিফটের বোতামে কিংবা ওষুধের প্যাকেটে এই উঁচু বিন্দুগুলো এখন একজন দৃষ্টিহীন মানুষকে পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি দিচ্ছে। বাংলাদেশের ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ এই মানুষদের অধিকারকে দিয়েছে আইনি ভিত্তি। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের এক বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। আমাদের আগামী প্রজন্মের শিশুদের শেখাতে হবে যে শারীরিক সীমাবদ্ধতা কোনো মানুষের আসল পরিচয় হতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই যদি আমরা সন্তানদের মনে এই বোধ তৈরি করতে পারি যে কোনো দৃষ্টিহীন বন্ধুকে দেখে করুণা নয়, বরং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে, তবেই আমাদের সমাজ সার্থক হবে। কাউকে পিছিয়ে রেখে কোনো দেশ বড় হতে পারে না। আজকের এই দিনে আমাদের শপথ হোক, আমরা যেন কোনো মেধাকে কেবল সুযোগের অভাবে হারিয়ে যেতে না দিই। লুই ব্রেইলের সেই ছয়টি বিন্দুর পথ ধরে আমরা যেন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক পৃথিবী গড়তে ঐক্যবদ্ধ থাকি। আসুন, আমরা মানুষের অভাব নয়, বরং তার ভেতরের শক্তিকে সম্মান জানাতে শিখি। প্রতিটি মানুষ যেন সম্মানের সঙ্গে নিজের জীবন গড়ার সুযোগ পায়, আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের বড় চাওয়া।
*লেখক: সুমন পাল, সলংগা, সিরাজগঞ্জ।
নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]