২০২৬ সাল অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ফল এবং বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

ছবি: সংগৃহীত

২০২৫ সালকে যদি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য সমন্বয় ও পুনর্বিন্যাসের বছর হিসেবে ধরা হয়, তবে ২০২৬ সাল হবে সেই পুনর্বিন্যাসের ফলাফল দৃশ্যমান হওয়ার সময়কাল। যেখানে নীতিগত পরিবর্তন, উৎপাদন কাঠামোর রূপান্তর, ভূ-অর্থনৈতিক অবস্থানের স্থিতিশীলতা এবং মুদ্রানীতি ও বাণিজ্য প্রবণতার প্রভাব একত্রে বাস্তব অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে। কোভিড-পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠন এবং ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিকীকরণ প্রবণতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ২০২৫ সালে এসব প্রবণতা স্থিতিশীলতার দিকে অগ্রসর হলেও সম্পূর্ণ স্বস্তি ফিরে পায়নি; বরং অনিশ্চয়তাই ধীরে ধীরে বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, যা ২০২৬ সালে আরও গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে।

২০২৫ সালে মার্কিন ডলার বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থায় তার শক্ত অবস্থান বজায় রাখে। উচ্চ সুদের হার এবং নিরাপদ বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে মার্কিন অর্থনীতির আকর্ষণ ডলারের চাহিদা বাড়িয়ে তোলে। ফলে ডলার আরও শক্তিশালী হয় এবং প্রভাব হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রা চাপের মুখে পড়ে। স্থানীয় মুদ্রা অবমূল্যায়নের ফলে এসব দেশে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বৈদেশিক ঋণের পরিশোধ আরও ভারী হয়ে ওঠে; যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। কারণ, ২০২৫ সালে ডলারের শক্তিশালী অবস্থানগত কারণে আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য এবং ভোগ্যপণ্যের দামে চাপ সৃষ্টি করে। যদিও রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা চলে। ২০২৬ সালে ডলারের মূল্য কিছুটা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সুদের হার কমাতে শুরু করে এবং একই সময়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা অন্যদিকে ঝুঁকে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ডলারের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। ফলে তার অবস্থান কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। তবে সেই শিথিলতা হবে ধীরগতির এবং অসম। যদিও বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সালেও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভোক্তার চাহিদা উচ্চ সুদহারের জন্য সীমিত ছিল। চীন তার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ব্যস্ত থাকায় বৈশ্বিক চাহিদায় প্রত্যাশিত গতি আনতে পারেনি। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত ২০২৫ সালে চাপের মুখে পড়ে। ক্রেতাদের মূল্যচাপ, অর্ডার স্থগিত ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে দর-কষাকষির প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। তবে একই সঙ্গে সরবরাহ বৈচিত্র্যকরণের বৈশ্বিক প্রবণতা বাংলাদেশকে অনেক সুযোগ এনে দেয়। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তা আগের দশকের মতো দ্রুত সম্প্রসারণশীল হবে না; বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটের দিকে ঝোঁক বাড়বে, যা বাংলাদেশের জন্য দ্বিমুখী বার্তা বহন করে। যদি উৎপাদন দক্ষতা ও অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব হয়, তবে নতুন বাজার ধরার সুযোগ তৈরি হবে। তা ছাড়া কাঠামোগত সংস্কার না হলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পুনঃপ্রবর্তিত নীতি বিশেষত শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিশীলতাকে বাধাপ্রাপ্ত করেছে। মার্কিন প্রশাসনের শুল্ক বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কিছু বৃদ্ধি পেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ সরকারি ব্যবস্থাগুলোর শুল্কনীতি ও জটিল আন্তর্জাতিক নীতির কারণে বাণিজ্য বৃদ্ধির গতিকে স্থিতিশীল করে রাখা কঠিন হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবাহে ঝুঁকি বিবেচনায় বিনিয়োগের প্রবণতা ছিল। উচ্চ সুদহার ও রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে কম আগ্রহ দেখিয়েছেন। উন্নয়নশীল দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ সীমিত ছিল, যেখানে কিছু অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ অব্যাহত থাকে। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ কিছুটা অনুকূল হবে, যদি সুদের হার কমে এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি স্বচ্ছ ও নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করবেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সংস্কার, আর্থিক খাতের সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য হয়ে উঠবে।

রেমিট্যান্স ২০২৫ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে কাজ করে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে শ্রমবাজারের চাহিদা পুরোপুরি না কমায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়। যদিও বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা ও শ্রমবাজারের কাঠামোগত পরিবর্তন ভবিষ্যৎ ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৬ সালে রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি নির্ভর করবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক নীতি ও অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর। বাংলাদেশের জন্য দক্ষ শ্রম রপ্তানি ও বৈধ চ্যানেল জোরদার করা তখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাত ২০২৫ সালে উচ্চ সুদের হার ও তারল্যসংকটের চাপ মোকাবিলা করে। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কড়াকড়ি হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ফাইন্যান্সের প্রসার বাড়বে। বাংলাদেশের জন্য এটি একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। কারণ, প্রযুক্তিগত অভিযোজনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি হয়ে উঠবে।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ২০২৫ সালে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ ও নবায়নযোগ্য শক্তি রূপান্তর টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যায়। তেলের দাম তুলনামূলকভাবে অস্থির থাকে; যা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করে। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেয়। ফলে সার্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়। ২০২৬ সালে জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসতে পারে, যদি নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ে এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রিত থাকে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের জন্য নিজস্ব জ্বালানি বৈচিত্র্য ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য হবে। এ ছাড়া ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণমুখী করে তোলে; যা ডলার ও শেয়ারবাজারের সঙ্গে একটি জটিল সম্পর্ক তৈরি করে। বাংলাদেশে স্বর্ণের উচ্চ মূল্য ভোক্তা ব্যয় ও সঞ্চয় প্রবণতায় প্রভাব ফেলে। ২০২৬ সালে যদি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা কিছুটা ফিরে আসে, তবে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমে আসতে পারে।

যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম বড় অনিশ্চয়তার উৎস হিসেবে রয়ে যায়। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত বাণিজ্য, জ্বালানি ও বিনিয়োগ প্রবাহে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ সরাসরি সংঘাতে জড়িত না থাকলেও আমদানি ব্যয়, রপ্তানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের মাধ্যমে এর অর্থনৈতিক প্রতিফলন স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। ২০২৬ সালে সংঘাত নিরসনের চেষ্টা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়তে পারে। তবে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ ও শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সার্বিকভাবে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি ধীরগতির পুনরুদ্ধার ও কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে দ্রুত প্রবৃদ্ধির যুগ পেছনে পড়ে স্থিতিশীলতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়ন সামনে চলে এসেছে। বাংলাদেশের জন্য এই দুই বছর একদিকে চাপের, অন্যদিকে সুযোগের। কারণ, বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংস্কার, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ এই অস্থির বৈশ্বিক বাস্তবতায় নিজস্ব অবস্থান শক্ত করতে পারে। অন্যথায় বৈশ্বিক ঝুঁকির ঢেউ দেশীয় অর্থনীতিকে আরও গভীর চাপে ফেলতে পারে। ফলে ২০২৫ সালকে যদি প্রস্তুতির বছর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে ২০২৬ সাল হবে সেই প্রস্তুতির ফলাফল নির্ধারণের সময়; যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

লেখক: অনজন কুমার রায়, ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট