মাওয়া ঘাটের ইলিশের সাতসতেরো
ইলিশ পছন্দ করে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ইলিশের যে দাম, কাছে গেলে যেন শরীরটাই পুড়ে যায়। তারপরও টাকাপয়সা জমিয়ে হলেও মাসে দু–একবার ইলিশ না হলে এই শহরের মধ্যবিত্তের যেন চলেই না। এর সঙ্গে একটু সুযোগ করে রাতের বেলা মাওয়া যেতে পারলে তো বেশ। একেবারে জমে যায়। মাওয়া ঘাটের ইলিশ ও পদ্মার ইলিশ, এ নিয়ে যতটা মুখরোচক গল্প, তা নিয়ে নেহাত দু–একটা সিনেমাও হয়ে যেতে পারে।
পদ্মা সেতু হওয়ার পরে মাওয়ার সে সুদিন এখন আর নেই। ইলিশপ্রেমীরা মাওয়া আসেন। তাই মাঝেমধ্যে কিছুটা জমজমাট হয়ে ওঠে এই আরকি। রাতের নিয়ন আলো ভেদ করে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মাওয়া পৌঁছে যেতে পারবেন। সেটা যদি প্রাইভেট কার, জিপ, মাইক্রোবাস ইত্যাদি। বাসে গেলে আরেকটু বেশি সময় লাগতে পারে। গুলিস্তান ও মিরপুর থেকে বাস পাওয়া যাবে।
আসলে কি পদ্মার ইলিশ?
আসেন ভাই, আসেন। একদম তাজা পদ্মার ইলিশ। একবার খেলে বারবার খেতে মন চাইবে। এমন মুখরোচক বাণী কর্ণকুহরে প্রবেশ করবে। দূরে তাকিয়ে দেখলেন, পদ্মার বুকে তো বিশাল চর। ইলিশ এল কীভাবে? আসলে তাঁরা বোঝাতে চান, এটা চাঁদপুরে পদ্মার মোহনায় ধরা ইলিশ। যেটাকে সবচেয়ে সুস্বাদু বলে ইলিশ নিন্দুকেরাও স্বীকার করে। আর তাজা হয় কীভাবে? মাছ তো দেখাবে পুরো বরফ থেকে বের করে। তাজা বলতে তাঁরা বোঝান, বেশি বরফে মাছ ছিল। কোয়ালিটি নষ্ট হয়নি।
ব্যতিক্রম কী?
আপনি ইলিশ পছন্দ করবেন। তারপর আপনার সামনে ইলিশ কাটাকুটি করে ধুয়ে মসলা মাখিয়ে শর্ষের তেলে ভাজবেন। চাইলে ভাজার খুন্তি হাতে নিয়ে আপনি ছবি তুলতে পারবেন। যেন আপনি একজন ইলিশ রাঁধুনি। শর্ষের তেলে ডুবিয়ে ইলিশ ভাজা হয়। ভাজার পরে যে তেল থাকে, তা লেজসহ অন্যান্য ভর্তায় দেওয়া হয়। হামানদিস্তায় লেজ পিষে কাঁটা ছাড়িয়ে ভর্তা করা হয়। এটা খেতে বেশ ভালো লাগে। আপনি চাইলে ইলিশের ডিম ভর্তা করে দিতে বলতে পারবেন। বিশেষ এক আচারের তেল তাঁরা ভর্তার মধ্যে দেন। ফলে খেতে অন্য রকম লাগে। ভর্তার মধ্যে আছে মাছের ডিম, লেজ, পেঁয়াজ, মরিচ, কালিজিরা, বেগুন ইত্যাদি। এর সঙ্গে ভাত ও ডাল তো থাকবেই। কিছু রেস্তোরাঁয় গরু, মুরগি এসবও আছে। আলাদাভাবে কিনে খেতে পারবেন।
কোথায় খাবেন
ইলিশবাড়ি, শখের হাঁড়ি, তাজমহল, শখের ইলিশ, ইলিশ আড্ডা, ঘরোয়া, কুটুমবাড়ি, ফরচুন, কাঁচালঙ্কা ইত্যাদি যে রেস্তোরাঁ পছন্দ হয়। যেখানে ইলিশ আপনার ভালো লাগে, সেটা বেছে নেবেন। বিখ্যাত প্রজেক্ট হিলশা আছে, তবে এটা মধ্যবিত্তের নাগালের একদমই বাইরে। আর ঝুপড়িতে যেসব ইলিশ বিক্রি হয়, তার অধিকাংশই ইলিশ নয়। ইলিশের মতো দেখতে সার্ডিন মাছ, চন্দনা ইলিশ। এখানে প্রতারিত হওয়ার সুযোগ অনেক বেশি।
ইলিশের দরদাম
আপনার আশপাশের বাজারে ইলিশের যেমন দাম, মাওয়া ঘাটে তার চেয়ে এক পয়সা কমেও পাবেন না; বরং জনপ্রিয় রেস্তোরাঁয় গেলে দাম বেশিও হতে পারে। এক কেজির মাছের দাম ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা। সময় ও রেস্তোঁরাভেদে দাম কম–বেশি হতে পারে। বেড়াতে এসেছেন, ইলিশ ভাজা দেখবেন আর খাবেন। তাই দামটা একটু নাহয় সয়েই নিলেন।
ভালো ইলিশ চেনার উপায়
ইলিশ বড় বিচিত্র মাছ। এর হাবভাবই আলাদা। অনুকূল পরিবেশ না এলে এরা ডিমই ছাড়ে না। তবে একটি পূর্ণবয়স্ক ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম ছাড়তে পারে। সাগর ও নদী—এ দুই জায়গায় ইলিশ থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাগর থেকে যত দূরের নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়, তা তত বেশি স্বাদের হয়। ইলিশ সব সময় দৌড়ের ওপর থাকে। অর্থাৎ ছুটে চলে। এই ছুটে চলার সময় ইলিশের গায়ে একধরনের তেল উৎপাদিত হয়। যে কারণে খেতে মজা লাগে। আর নদীতে ইলিশ যে খাবার খায়, সেগুলোর কারণেও সাগরের ইলিশের চেয়ে স্বাদে ভিন্নতা আসে।
ইলিশের ঘাড় হবে মোটা। মাছ লম্বাকৃতির না হয়ে গোলাকৃতির হবে। চোখ বসে যাবে না। কাংকসা লাল হতে পারে। মাছ থেকে দুর্গন্ধ আসবে না। এমন গুণের ইলিশ খেতে ভালো হয়। ডিম ছাড়া ইলিশ ডিমওয়ালা ইলিশের চেয়ে খেতে মজার। নদীর ইলিশের শরীর চিকচিক করে। একটা রুপালি আভা ছড়িয়ে পড়ে। চোখ দুটি দেখলে মনে হবে, ড্যাব ড্যাব করে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। ঘোলাটে, বসে যাওয়া চোখ হবে না। সাধারণত সাগরের ইলিশ লম্বা হয় বেশি কিন্তু চওড়া কম।
সতর্কতা
মাওয়া ঘাটে যা–ই খাবেন না কেন, দাম জেনে নিয়ে খাবেন। তা না হলে খাওয়া শেষে পকেট ফাঁকা হওয়া সময়ের ব্যাপার। কাঁচালঙ্কা রেস্তোরাঁর পাশে গরুর খাঁটি দুধের চা পাওয়া যায়। প্রতি কাপ ২০ টাকা। চা–প্রেমীরা চা খেতে পারেন। ভ্রমণের সময় কোথাও নোংরা করা থেকে বিরত থাকবেন।