ফুটপাত–বাণিজ্য: অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরছে

রাজধানীতে দখল হয়ে যাওয়া একটি ফুটপাত, যেখানে দোকানিরা পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেনফাইল ছবি: প্রথম আলো

সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে অবৈধভাবে ফুটপাত দখলকারীদের বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে, তা আমরা খুব গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি। বিগত দিনগুলোর চেয়ে এবার প্রশাসনকে অনেক বেশি সোচ্চার দেখা গেছে। সবাই আশা করেন, ঢাকা শহর এবার হয়তো একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে।

ফুটপাত দখলকে সবাই শুধু চলাচলের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন। তবে এর সঙ্গে এক বিপুল অঙ্কের অর্থনৈতিক হিসাব–নিকাশ জড়িত। কারণগুলো আমাদের জানা থাকলেও হিসাবটি অজানা। সেটি ব্যাখ্যা করার আগে আসুন কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করি।

১. ফুটপাতে প্রতিদিন কী পরিমাণ ব্যবসা হয় অর্থাৎ লেনদেনের পরিমাণ কত?

২. ফুটপাতের ব্যবসায়ে কর্মসংস্থান হচ্ছে কতজনের?

৩. ফুটপাতের ব্যবসার বিকল্প কী হতে পারে?

৪. দেশের অর্থনীতিতে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের অবদান কী?

অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আমি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাইনি। কারণ, এ ধরনের কোনো সমীক্ষা বা গবেষণা ইতিপূর্বে করা হয়নি। আসুন দেখে নিই, ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লাগাম কীভাবে টেনে ধরছেন।

সরাসরি রাজস্ব ক্ষতি

ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের লাইসেন্স বা রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই ব্যবসা করার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে যাঁরা আইন মেনে, সরকারকে ট্যাক্স ও ভ্যাট দিয়ে, ট্রেড লাইসেন্স করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তাঁরা ক্রেতা হারান এবং আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হন। এতে প্রকৃত ব্যবসায়িক খাতগুলোয় অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। যাঁরা নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তাঁদের অতিরিক্ত মুনাফা করার তাগিদ বেড়ে যায়, তাঁরা অতিরিক্ত লাভ করতে চান, ফলে ক্রেতারা আবার ফুটপাতের সস্তা পণ্যের দিকেই ঝুঁকে পড়েন। এ সমস্যাটি একটি দুষ্টচক্রের মতো প্রবাহ তৈরি করে। ফুটপাতের লাইসেন্সবিহীন অপ্রাতিষ্ঠানিক এই ব্যবসায়ীরা সরকারের রাজস্ব আয়ের বাইরে থাকায় তাঁদের কখনোই ব্যবসায়ের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।

শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণ

সহজেই ফুটপাত দখলের সুযোগ থাকায় দেশের শ্রমবাজার এতটাই সস্তা হয়ে উঠেছে যে, হকাররা এখন কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চাঁদাবাজদের ম্যানেজে সহজেই মানহীন কিছু পণ্য নিয়ে ফুটপাতে বসে যেতে পারছেন। ফুটপাতের অধিকাংশ ব্যবসায়ী ভ্রাম্যমাণ হওয়ায় তাঁরা বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের শনাক্ত করতে পারেন না। তাঁরা কোনো নিয়মকানুন মানেন না এবং বিভিন্ন দলীয় চাঁদাবাজদের ম্যানেজ করে টিকে থাকেন।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

সম্পদের অপচয়

এসব ব্যবসায়ী অবৈধভাবে বিদ্যুৎ–সংযোগ নিয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত ব্যবসা পরিচালনা করেন, যা বিদ্যুৎ অপচয়ের অন্যতম কারণ। অনেক সময় এসব অবৈধ সংযোগের ফলে অগ্নিদুর্ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। আর ইতিপূর্বে হঠাৎ বৃষ্টিতে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত হওয়ার বড় কারণ হলো এই ফুটপাতের অবৈধ বিদ্যুৎ–সংযোগ।

জননিরাপত্তার জন্য হুমকি

যত্রতত্র গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা আজকাল খাবারের দোকান বা ফুডকোর্ট বসিয়ে থাকেন। আবার দেখা যায়, রেস্তোরাঁর রান্নার চুলা রাখা হয় ফুটপাতে। এসব কর্মকাণ্ড জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

যানজট

ফুটপাত দখলের ফলে পথচারীরা মূল সড়কে নেমে আসেন। আবার অনেকে না হেঁটে স্বল্প দূরত্বেও রিকশা বা ইজিবাইক ব্যবহার করেন, যা যানজটের অন্যতম কারণ। ফুটপাত দখলদারত্বের কারণে পরিবহন খাত প্রভাবিত হচ্ছে। পথচারীদের হাঁটার সুযোগ তৈরি করে দিয়ে ঢাকা শহর থেকে রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যাও কমিয়ে ফেলা সম্ভব। এতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

উৎপাদনশীল খাতে শ্রমিকের সংকট

বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে শ্রম সস্তা। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা কোনো উৎপাদনশীল খাতের সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁরা বেচাকেনা বা ট্রেডিং সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি উৎপাদননির্ভর। গ্রামে কৃষিকাজের শ্রমিকসংকট, গ্রামীণ উৎপাদন তথা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে শ্রমিকসংকট, শিল্পাঞ্চলে দক্ষ শ্রমিকের অভাব অথচ ফুটপাতে ট্রেডিং সেক্টরে লোকের অভাব নেই। ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের গ্রামে কর্মসংস্থানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে গ্রামীণ অর্থনীতি বিকাশের স্বার্থে তাঁদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ জন্য তাঁদের উপযুক্ত কাউন্সেলিং প্রয়োজন।

ফুটপাতে অবৈধ দখলদারত্ব একদিনে তৈরি হয়নি। অনেক বছর ধরে আমাদের উদাসীনতা ও প্রশাসনের গাফিলতির কারণে আজ এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখন সময় এসেছে প্রশাসনের কঠোর হওয়ার। ফুটপাত দখলমুক্তকরণে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থাকলে ধীরে ধীরে এসব ব্যবসায়ী ভিন্ন পেশায় ফিরে যাবেন। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা শৃঙ্খলার মধ্যে আসবেন। লাইসেন্সবিহীন অপ্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় অর্থনীতির অংশ না হয়ে কোনো ব্যবসায়ী যেন ব্যবসা করতে না পারেন। আমরা আর রাজস্ব হারাতে চাই না।

লেখক: সাজ্জাদ হোসেন রিজু, প্রিন্সিপাল অফিসার, পূবালী ব্যাংক পিএলসি