ঈদস্মৃতি
ঈদ মানেই আনন্দ, আর সেই আনন্দের সবচেয়ে নির্মল রূপটা লুকিয়ে আছে গ্রামের জীবনে। আজকের প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের কাছে হয়তো এসব গল্পের মতো শোনাবে, কিন্তু আমাদের শৈশবের ঈদ ছিল একেবারেই অন্য রকম—সরল, আন্তরিক আর প্রাণভরা।
ঈদের দিন শুরু হতো ঈদগাহে নামাজ দিয়ে। বৃষ্টির আশঙ্কা থাকলে আমরা আশ্রয় নিতাম দক্ষিণ নাজিরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ঈদের আগের দিনগুলোতে ঈদগাহ বা স্কুল পরিষ্কার করা ছিল এক আনন্দময় আয়োজন। বালতি বালতি পানি ঢালা, বেঞ্চ সরানো, আর কাজের ফাঁকে একে অপরকে ভিজিয়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে যেন এক উৎসব। কাজ শেষে সাম চাচার দোকান থেকে চানাচুর আর মুড়ি এনে খাওয়ার আনন্দ ছিল অপরিসীম। চাঁদরাত থেকেই বাড়ি বাড়ি ছড়িয়ে পড়ত ঈদের আমেজ।
ঈদের আরেকটি মজার দিক ছিল ঈদকার্ড। আমরা ছোটরা দোকান বসাতাম। সমাজকল্যাণ কেন্দ্রের নামে পাতলা কাগজে ছাপানো কার্ড পাঞ্জাবিতে লাগিয়ে দিতাম নামাজে আসা মানুষদের, আর তাঁরা খুশিমনে দিতেন ঈদি। তখন কেউ প্রশ্ন করত না—এই টাকা কেন নিচ্ছি বা কী করব। মাঠ সাজানো হতো লাল তিনকোনা কাগজ দিয়ে, যা পুরো পরিবেশকে উৎসবমুখর করে তুলত।
ঈদের দিন ছিল ঘুরে বেড়ানোর দিন। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি—শরবত, পোলাও, মাংস, আর গল্পে ভরা আড্ডা। মনে আছে, একবার ১৭টি বাড়িতে খেয়েছিলাম! এমন অনেক বাড়ি ছিল যেখানে সারা বছর যাওয়া হতো না, কিন্তু ঈদের দিন ঠিকই যেতাম। সেই বন্ধনগুলো ছিল অদ্ভুত মধুর।
ঈদের বিকেলে মাঠে হতো বিবাহিত বনাম অবিবাহিতদের ফুটবল ম্যাচ। নিয়ম-কানুনের বালাই ছিল না—আনন্দটাই ছিল আসল। কেউ কেউ বল হাতে নিয়েই গোল করে ফেলতেন, আর আমরা হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়তাম।
ঈদের আগে চাঁদরাতে গ্রামের বড় ভাইয়েরা গরিব মানুষের বাড়িতে চিনি, সেমাই, তেল, পোলাওর চাল পৌঁছে দিতেন। এমন কোনো বাড়ি ছিল না, যেখানে ঈদের দিন ভালো খাবার রান্না হতো না। সবার মুখে ছিল আনন্দের হাসি।
ঈদসালামির সেই কচকচে নতুন টাকা—যেন অমূল্য সম্পদ! তা দিয়ে সেভেন আপ, ফান্টা খাওয়ার আনন্দ ছিল অন্য রকম। অল্প টাকাতেই নিজেকে ধনী মনে হতো।
আমাদের বাড়িতে ঈদের দিন থাকত অতিথির ভিড়। মা সবার আগে রান্না শেষ করতেন, কারণ তাঁর রান্না ছিল বিখ্যাত। সন্ধ্যার মধ্যে খাবার শেষ হয়ে গেলে আবার রান্না বসাতেন। সেই ব্যস্ততা, সেই ভালোবাসা—আজও চোখে ভাসে। ঈদ মানেই ফুফুবাড়ি যাওয়া। মাটির চুলায় রান্না করা দেশি মুরগির বড় রান—তার স্বাদ আজও জিবে লেগে আছে।
ঈদের দিনে নতুন জামা পরে সেজেগুজে ঘুরে বেড়াত মেয়েরা। চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ, পারফিউমের ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে এক অন্য রকম আবহ। কেউ প্রিয় মানুষটিকে দেখার জন্য অপেক্ষা করত, কেউ আবার লাজুক ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়াত।
এমনই এক ঈদের দিনে, এক বাড়িতে খেতে গিয়ে হঠাৎ করেই চোখে পড়ে এক মেয়েকে। নতুন জামা, চুড়ির শব্দ, আর মিষ্টি হাসি—কেন যেন বারবার তাকাতে ইচ্ছা করছিল। কথাও হয়নি ঠিকভাবে, তবু অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করছিল মনে। ঈদের কয়েকটা দিন যেন তাকে ঘিরেই কেটে গেল—দূর থেকে দেখা, হালকা হাসি, আর না বলা কিছু অনুভূতি।
কিন্তু ঈদ শেষ হতেই সে চলে গেল—হয়তো শহরে, হয়তো অন্য কোথাও। আর কোনো দিন দেখা হয়নি। নামটাও জানা হয়নি ঠিকভাবে। তবু সেই অল্প সময়ের পরিচয় আজও স্মৃতির পাতায় রয়ে গেছে—একটি অসমাপ্ত গল্প হয়ে।
সবচেয়ে বড় কথা, সেই ঈদে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। ধনী-গরিব, ছোট-বড়—সবাই একসঙ্গে আনন্দ করত। নামাজ শেষে কোলাকুলি যেন হৃদয়ের দূরত্ব মুছে দিত।
আজ সেই ঈদের আমেজ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। এখনকার প্রজন্ম মুঠোফোনের পর্দায় ব্যস্ত, প্রাণখোলা হাসি খুব একটা দেখা যায় না। তাই মাঝে মাঝে মনে হয়—সেই সরল আনন্দগুলোই ছিল প্রকৃত সুখ।
ঈদ আজও আসে, কিন্তু সেই অনুভূতিগুলো আর আগের মতো ফিরে আসে না। তবু স্মৃতির ভাঁজে রয়ে গেছে একটুকরা স্বর্ণালি সময়—আমাদের গ্রামের ঈদ।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]