হারিয়ে গেছে সাহ্‌রিজাগানিয়াদের সেই হাঁকডাক

পবিত্র রমজানের আকাশজুড়ে বাঁকা চাঁদ। সারা দিন রোজা শেষে ইফতার ও মাগরিবের নামাজ পড়ে বাড়ির ছাদে বসেছেন ঠাকুরগাঁও সদরের ঘনিমহেষপুর গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক মজলুম পারভেজ। আকাশের দিকে তাকিয়ে টাইম মেশিনে চড়ে তিনি যেন চলে গেছেন চার দশক পেছনে।

আনমনেই তাঁর কানে বাজছে সেই চিরচেনা সুর, ‘রোজাদার ঈমানদার ভাই ও বোনেরা...আপনারা উঠুন, সাহ্‌রি খেয়ে নিন।’

শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা, গভীর রাতে এই হাঁকডাক শুনেই একসময় ঘুম ভাঙত গ্রামের মানুষের। বাড়ির বধূরা উনুন জ্বালিয়ে রান্না চড়াতেন সাহ্‌রির জন্য। তারাবিহর আজান শুনে সংবিৎ ফিরে পান মজলুম পারভেজ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘সে এক সময় ছিল! আজও এই ছাদে বসলে মাঝেমধ্যে সেই ঘুমভাঙানোর ডাক যেন কানে বাজে।’

মাইক বা স্মার্টফোনের যুগে প্রবেশের আগে সাহ্‌রির সময় গ্রাম জাগানোর দৃশ্য ছিল উৎসবের মতো। তারাবিহর নামাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে গ্রামের মানুষ যখন ঘুমে কাদা, তখন রাত দুইটা নাগাদ রাস্তায় বের হতো কিশোর-তরুণদের দল।

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

মজলুম পারভেজ স্মৃতি হাতড়ে জানান, তখন পাড়ার ১৫-২০ জন বালককে নিয়ে ৮-১০টি দল করা হতো। মাথায় ফেট্টি বাঁধা, এক হাতে লাঠি আর অন্য হাতে হারিকেন নিয়ে তারা গ্রাম দাপিয়ে বেড়াত। কণ্ঠে থাকত ইসলামি গান ও গজল। দরজায় কড়া নেড়ে তারা ডেকে বলত, ‘সময় হয়ে গেছে, ঘুম থেকে উঠে পড়ুন।’

ঠাকুরগাঁও সদরের রুহিয়া ইউনিয়নের প্রবীণ নাগরিক সিরাজুল ইসলামও শোনালেন সেই সোনালি সময়ের গল্প। তাঁর চোখের দৃষ্টি এখন ক্ষীণ, কিন্তু অর্ধশতাব্দী আগের সাহ্‌রির স্মৃতি এখনো অমলিন। সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভোররাতে একদল যুবক কাঁসার ঘণ্টা নিয়ে রাস্তায় বের হতো। “ঢং ঢং” শব্দে পুরো গ্রাম জেগে উঠত। সাহ্‌রির সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগেও তারা বিশেষ ঘণ্টা বাজিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দিত।’

সাহ্‌রিজাগানিয়া এই দলগুলোকে বলা হতো ‘ঘুমভাঙানিয়া’। রমজান মাসজুড়ে নিঃস্বার্থভাবে এই কাজ করলেও ঈদের আগের দিন গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থেকে তাঁদের দেওয়া হতো নতুন পোশাক, সেমাই, চিনি ও নানাবিধ খাদ্যসামগ্রী। এটি ছিল গ্রামের মানুষের ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমানে মাইকের প্রচণ্ড শব্দ আর স্মার্টফোনের বিচিত্র রিংটোনে মানুষের ঘুম ভাঙে। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করলেও কেড়ে নিয়েছে সেই মানবিক ও ছন্দময় ঐতিহ্য। এখন আর হারিকেন হাতে কেউ গজল গায় না, কাঁসার ঘণ্টার শব্দে কেউ সতর্ক করে না যে সময় শেষ হয়ে আসছে।

মজলুম পারভেজের মতো প্রবীণদের কাছে আজ সেই ‘ঘুমভাঙানিয়া’ ডাক কেবলই বিবর্ণ ধূসর ইতিহাস। তবু কোনো কোনো নিস্তব্ধ রাতে কেউ কেউ হয়তো এখনো হ্যালুসিনেশনের মতো শুনতে পান, ‘উঠুন ঈমানদার ভাই ও বোনেরা, সাহ্‌রি খেয়ে নিন...’