তারুণ্যের সাংবাদিকতায় শিক্ষাভ্রমণ

ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় যাত্রা। চারদিকে ঘন কুয়াশা, শীতের কাঁপুনিতে জবুথবু। গাছের ডালে ঘুমিয়ে থাকা পাখিরা হুট ক‌রে ন‌ড়ে ওঠে। যেন অজানা শঙ্কায় মনের কোণে ভয় সৃষ্টি করে। বিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হলেও এমন পরিবেশে ভয় কাজ করাই স্বাভাবিক। তবে সেই ভয়কে পাশ কাটিয়ে ঠিক ভোর পাঁচটায়, তারুণ্যের সাংবাদিকতার জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে আমরা রওনা দিই দৈ‌নিক যুগান্তর প‌ত্রিকা ও যমুনা টেলিভিশনের দিকে। বাংলা‌দেশ কৃ‌ষি বিশ্ববিদ‌্যালয় থে‌কে দূরত্ব বে‌শি হওয়ায় ভো‌রে যাত্রা শুরু। উদ্দে‌শ্য ছিল, তা‌দের দৈন‌ন্দিন কাজ পর্যবেক্ষণ এবং সত‌্যনিষ্ঠা সংবাদ প্রচা‌রে খু‌টিনা‌টি জ্ঞানার্জন।

এই শিক্ষাভ্রমণ নিঃস‌ন্দে‌হে রোমাঞ্চকর। যাত্রাপ‌থে ঘ‌টে মজার ঘটনা। গা‌ন, ক‌বিতা ও গল্পে মে‌তে ওঠেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সাংবা‌দিক স‌মি‌তির সদ‌্যসরা। কী দারুণ সেই সময় উপ‌ভোগ কর‌তে ব‌্যস্ত সবাই। কেউবা ছোট ছোট ভি‌ডিও ক‌রে ফেসবু‌কে আপ‌লোড দি‌চ্ছেন।

এর আগে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পাঁচ দিনব্যাপী মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম ও ইনভেস্টিগেশন সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কীভাবে অনুসন্ধানমূলক সংবাদ তৈরি করতে হয়, কোন বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক, দুই পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার কৌশল এবং ব্যবহারিক লেখার দক্ষতা অর্জনের দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতায় ভিডিও রিপোর্টিং তৈরি এবং লাইভ ভিডিও ধারণের কলাকৌশলও শিখেছিলাম। সেই প্রশিক্ষণের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যই ছিল যমুনা টেলিভিশন এবং যুগান্তরের এই শিক্ষামূলক ভ্রমণ। বাকৃ‌বি‌তে সাংবাদিকতার কোনো পৃথক বিভাগ নেই। ফলে অন্যদের দেখে এবং শেখার ইচ্ছার মাধ্যমেই সাংবাদিকতার জ্ঞান অর্জন করতে হয়, যা কষ্টসাধ‌্য হলেও শিক্ষণীয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রার পর আমরা প্রথমে পৌঁছাই যমুনা টেলিভিশনে। সেখানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই অভিজাত পরিবেশে মুগ্ধ হই। স্টুডিওজুড়ে যেন হাজারো রহস্য লুকিয়ে আছে। ভেতরে ঢুকেই দেখি, সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন—সংবাদ প্রস্তুতি ও সম্প্রচারে।

এরপর একজন সহসম্পাদক (সাব–এডিটর) এসে আমাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তিনি পুরো স্টুডিও ঘুরিয়ে দেখান। কীভা‌বে সংবাদ তৈরি, পাঠ এবং টক শো পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ডেস্কের কাজ এবং স্টুডিওর কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেন। সর্বশেষে আমরা যাই অনুষ্ঠান রাজকাহনের স্টুডিওতে। সেখানে অনেকে কৌতুকপূর্ণভাবে নিজেদের ম‌তো টক শো করার চেষ্টা করেন, যা বেশ হাস্যরস সৃষ্টি করে।

যমুনা টেলিভিশনের পর আমরা যাই যুগান্তর পত্রিকায়। পত্রিকার অফিসে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই টাইপিংয়ের খটখট শব্দ এবং সত্যের রঙে মিশ্রিত কালির গন্ধ আমাদের বিমোহিত করে। পুরো অফিস ঘুরে ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। কীভাবে সংবাদ সংগ্রহ, বাছাই এবং প্রকাশ করা হয়, সেই প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিশদ জানতে পারি।

অফিসে ঘুর‌তে ঘুর‌তে যুগান্তরের পুরোনো পত্রিকা সংরক্ষণের ঘর চ‌লে যায়। সেখানে দেখতে পাই দুই দশকের পুরোনো পত্রিকার বাঁধাইসহ অন্যান্য পত্রিকার সংরক্ষিত কপি। পুর‌োনো কা‌লি, পুর‌োনো গন্ধ স‌ত্যিই রোমাঞ্চকর। সফরের শেষাংশে যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা দেন। যে‌কোনো প‌রি‌স্থি‌তি‌তে মানু‌ষের সাহ‌ায‌্য করার আবেদন জানান। পাশাপা‌শি পড়া‌লেখায় ম‌নো‌যোগী হ‌তে ব‌লেন।

বাকৃ‌বিসা‌সের ক‌য়েকজন নবীন সাংবা‌দিক জানান, সাংবাদিকতার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন এবংএর খুঁটিনাটি সম্পর্কে জানার জন‌্য এই শিক্ষাভ্রমণ অত্যন্ত ফলপ্রসূ। যমুনা টেলিভিশন ও যুগান্তরের কার্যক্রম আমাদের উৎসাহিত করে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালনে। এই সফর নিঃসন্দেহে আমাদের সাংবাদিকতার দক্ষতাকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।

বাকৃ‌বিসা‌সের সভাপ‌তি হা‌বিবুর রহমান র‌নি জানান, ক‌্যাম্পাস সাংবাদিকেরা বিশ্ববিদ‌্যাল‌য়ের দর্পণ। তাঁদের লেখনীর মাধ‌্যমেই বিশ্ববিদ‌্যাল‌য়ের সত‌্যনিষ্ঠ সংবাদ এবং শিক্ষার্থী‌দের নানাবিধ সমস‌্যা প‌ত্রিকায় উঠে আসে। এই কা‌জের দক্ষতা বৃ‌দ্ধির জন‌্য প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষামূলক ভ্রম‌ণের কোনো বিকল্প নেই। তারই অংশ হিসে‌বে নবীন সাংবাদিক‌দের নি‌য়ে যুগান্তর প‌ত্রিকায় এবং যমুনা টে‌লি‌ভিশ‌নে নি‌য়ে আসা। এই শিক্ষাভ্রম‌ণে অর্জিত জ্ঞান তাঁদের কা‌জের স্পৃহা‌কে দ্বিগুণ কর‌বে, এই আশা রা‌খি।

মো. রিয়াজ হোসাইন, শিক্ষার্থী, বাংলা‌দেশ কৃ‌ষি বিশ্ববিদ‌্যালয়