এ দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে দিন দিন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার প্রবণতা অদ্ভুত হারেই বেড়ে চলছে। অনেকেই জীবনে সফল হওয়া বলতেই বোঝেন ‘বিসিএস ক্যাডার’ হওয়া। এ প্রবণতা একটা জাতির সার্বিক উন্নতিতে অন্যতম অন্তরায়। এ বিসিএস-মোহের নেতিবাচক প্রভাব এখন লক্ষ করা যাচ্ছে।

সম্প্রতি দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম প্রথম আলোর সংবাদ শিরোনাম হয়েছে ‘বিজ্ঞপ্তি দিয়েও বিজ্ঞানী খুঁজে পাচ্ছে না সরকারি প্রতিষ্ঠান’। সরকারি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউট পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয় প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নিয়োগের। কিন্তু বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাচ্ছে না এ প্রতিষ্ঠান। এমন ঘটনা দেশের জন্য খুবই হতাশাজনক। দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্যারিয়ার বলতে যখন শুধু ‘বিসিএস ক্যাডার’ হওয়াকেই বোঝায়, পাশাপাশি দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন গবেষক-বিজ্ঞানী হওয়ার পরিবর্তে শুধু বিসিএস ক্যাডার হওয়ার সেমিনার আয়োজন করে, তখন এমন অবস্থা সৃষ্টি কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে শুধু আমলা হওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান, তা দেখেই দেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে, সেটা সহজেই অনুমেয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিসিএসই একমাত্র চাকরি, যেখানে বিশেষ মানসম্মান, যশখ্যাতি পাওয়া যায়, সরকারি ছায়াতলে থেকে পাওয়ার প্র্যাকটিস করা যায়। পাশাপাশি দুর্নীতি ও লুটপাট করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা যায়। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দিন দিন এ দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, তরুণ প্রজন্ম বিসিএসের দিকে ঝুঁকছে। আর এ চাহিদাই বিসিএসকে ‘সোনার হরিণে’ পরিণত করেছে।

বিসিএসকে আজ সোনার হরিণে পরিণত করা বা এ দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সফলতার চাবিকাঠি মনে করার পেছনে যে মাধ্যমটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে, সেটি হলো গণমাধ্যম। ‘এইচএসসিতে দুবার ফেল করেও বিসিএসে প্রথম’, ‘তারার আলোয় পড়েও বিসিএস ক্যাডার’—পত্রপত্রিকা, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত এমন সব চোখধাঁধানো শিরোনাম এ দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর, তরুণ প্রজন্মের বিসিএসমুখী হওয়ার প্রবণতায় কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখে বৈকি।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো দেশের উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো গবেষণা। আর এর প্রধান কাজ হলো শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করে তোলা। কিন্তু পরম পরিতাপের বিষয় হলো আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তেমন কোনো গবেষণা হয় না, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়। এখানকার শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরিতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা না করেন শুধু আমলা হওয়ার চর্চা। তাঁরা শুধু পড়ে থাকেন গুটিকয় বিষয়ের ওপর। প্রথম বর্ষে পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থীকে দেখা যায় বিসিএসের ওপর তুমুল নির্ভরশীলতা। একাডেমিক পড়াশোনা থেকেও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিসিএসের পড়াশোনা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়, লাইব্রেরিগুলোয় হওয়ার কথা ছিল বিভিন্ন ধরনের জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা আর গবেষণা। আর এভাবে চলতে থাকলে দেশের উচ্চশিক্ষা, বিশেষ করে বিশেষায়িত শিক্ষা যে মুখ থুবড়ে পড়বে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিসিএসের প্রতি এ দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর নির্ভরশীলতা এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ৪০তম বিসিএসে আবেদনকারীর সংখ্যা মালদ্বীপের জনসংখ্যাকেও অতিক্রম করেছে। পরবর্তী বিসিএসগুলোয় সংখ্যাটা বেড়েই চলছে। দেশের বিশাল এক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, উদ্যোক্তা, আবিষ্কারক হওয়ার নেশা ছেড়ে আমলা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। এটা প্রকৃতপক্ষে দেশের জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক নয়। হ্যাঁ, দেশের মেধাবীদের দেশ পরিচালনায় এগিয়ে আসা উচিত, কিন্তু তারও একটা সীমা রয়েছে। একটা দেশ তো শুধু আমলা বা আমলাতন্ত্র দিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।

বিসিএস পরীক্ষার সূচনায় হয় ২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার মাধ্যমে। এর মাধ্যমে বিশাল একটা অংশ বাছাই হয়ে যায়। প্রিলিমিনারির পরবর্তী ধাপ হলো লিখিত পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, গাণিতিক যুক্তি, মানসিক দক্ষতাসহ মোট ৯০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হয়।
সম্প্রতি ৪০তম বিসিএসের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ, কাস্টমস, ট্যাক্সের মতো ক্যাডার পদগুলোয় মনোনীত হয়েছেন দেশের বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে অনেক আলোচনার ঝড় উঠছে। কিন্তু কেন এমনটা হচ্ছে, এর নেপথ্যে কী? দিন দিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা তাঁদের নিজস্ব ক্যাডার পদ ছেড়ে কেন অন্য ক্যাডারে যাচ্ছেন! আমরা ৩৮তম বিসিএসেও এমনটা লক্ষ করেছি। ৩৮তম বিসিএসের ক্যাডার পদ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই তাঁদের পেশার সঙ্গে জড়িত ক্যাডার পদ ছেড়ে পররাষ্ট্র, প্রশাসন ও পুলিশ এবং অনেকেই সাধারণ ক্যাডার পদে যোগ দিয়েছেন। মোট ২ হাজার ২০৪ জনের মধ্যে পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ২৫ জন। এ ২৫ জনের ৭ জন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী, ১৩ জন বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আবার এ ১৩ জনের ১০ জনই বুয়েটের শিক্ষার্থী।

এখন সাদাসিধে প্রশ্ন—মেডিকেলে পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থী এত কষ্ট, এত পরিশ্রম করে, এত টাকা খরচ করে পাঁচ থেকে ছয় বছর ডাক্তারি পড়াশোনা করে কেন স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগদান না করে পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ বা কর ক্যাডারে যোগদান করলেন? এর নেপথ্যে কী? তাঁদের পেছনে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে। তাঁদের কি উচিত নয় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের সে ঋণ শোধ করা? আমাদের বাবা-মায়েরা একজন ছেলে বা মেয়েকে চোখভরা স্বপ্ন আর বুকভরা আশা নিয়ে মেডিকেলে ভর্তি করান, তাঁর ছেলে বা মেয়েটিকে ডাক্তার বানাবেন বলে। তা ছাড়া একজন ডাক্তার স্বাস্থ্য ক্যাডারে এলে সেটা আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য যেমন কল্যাণকর, তেমনি দেশ ও জাতির গর্বের বিষয়।

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থীদেরও একই অবস্থা। বুয়েটে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস সাবজেক্টে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীটা বিসিএস দিয়ে এখন পররাষ্ট্র ক্যাডার। এত বছর তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে এখন কর্মক্ষেত্রের কোনো মিল নেই। তিনি যদি তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পেশায় থাকতেন, আমরা হয়তো পেতাম সেরা আইটি চিপ নির্মাতা, ভবিষ্যৎ মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠান নির্মাতা, বিশ্বের সেরা প্রযুক্তিবিদ বা সফল বিজ্ঞানী।

ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদদের তাঁদের নিজস্ব পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যোগদানের কারণে সাধারণ বিষয় নিয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁদের অধিকার থেকে। সাধারণত, বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, দর্শনসহ ইত্যাদি সাধারণ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরাই তো যোগ্যতাবলে পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ, কর, সাধারণ ক্যাডার পাওয়ার কথা। সাধারণ এসব বিষয় নিয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল বা কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থীদের মতো আলাদা তেমন কোনো চাকরির বাজার নেই।

একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি মেডিকেলে চাকরি, অর্থের বিনিময়ে রোগী দেখার কর্মস্থল। একজন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন শিল্প, কলকারখানায় চাকরির সুযোগ। একজন কৃষিবিদেরও চাকরির আলাদা সেক্টর রয়েছে।

কমার্স ফ্যাকাল্টির শিক্ষার্থীদের জন্যও রয়েছে আলাদা চাকরির পরিবেশ। তাঁদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক ও বিমা সেক্টর, বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান। দেশের প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান সময় অনুযায়ী, আর্টস ও সোশ্যাল সায়েন্স ফ্যাকাল্টির শিক্ষার্থীদের ভরসার জায়গা এই বিসিএস। যদিও বিসিএস ছাড়া আরও ভালো ভালো সেক্টর রয়েছে।
এ প্রশ্ন না উঠে পারে না যে কৃষি ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা কেন কৃষিসচিব হবেন না? কেন স্বাস্থ্য ক্যাডারের একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরিবর্তে ইংরেজি সাহিত্যের একজন শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্যসচিব হতে হবে? কেন সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন শিক্ষক শিক্ষাসচিব হবেন না বা হতে পারবেন না?

বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে আন্তক্যাডার-বৈষম্য আছে। আর এ জন্য পেশাবদলের ঘটনা ঘটছে। একজন প্রশাসন ক্যাডার যে সুযোগ-সুবিধাগুলো পাবেন, সেগুলো কেন স্বাস্থ্য ক্যাডারের অধিকারী একজন ডাক্তার পাবেন না? একজন পুলিশ ক্যাডারের পুলিশ অফিসার যে সুযোগ-সুবিধাগুলো পাবেন, সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অধিকারী একজন শিক্ষক, যিনি জাতি গড়ার কারিগর বলে পরিচিত, তিনি কেন তা পাবেন না? এ ক্যাডার বৈষম্যের বিরূপ প্রভাব কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেও কর্মক্ষেত্রে এসে ক্যাডার বৈষম্যের বলি হয়ে নিজস্ব ক্যাডার ছেড়ে যোগ দিচ্ছেন জেনারেল ক্যাডারে। তাই মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে হচ্ছেন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, কাস্টমস ও পররাষ্ট্র কর্মকর্তা। এটা একটা দেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশে ভালো মানের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, গবেষক তৈরি হবে না।

* ইমরান ইমন: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়