বিশ্বব্যবস্থা পাল্টে দেওয়া ট্রাম্পের এক বছর

ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইল ছবি

বিশ্বরাজনীতি একটি কৌশলগত ও চলমান বিষয়বস্তু। সময়, অবস্থান, পররাষ্ট্রনীতি, কূটনীতিক প্রেক্ষাপটসহ বিভিন্ন দেশীয় ও  আন্তর্জাতিক বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বরাজনীতির অবস্থান ও প্রেক্ষাপটেরও বদল হয়। এই বদলের অনেকাংশে নির্ভর করে বিশ্বরাজনীতির ময়দানে নেতৃত্বদানকারী দেশগুলোর ওপর।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এরূপ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী অন্যতম প্রধান দেশ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রধান পদ হচ্ছে প্রেসিডেন্ট পদ। যেটি শুধু কোনো প্রেসিডেন্ট পদ নয়। তর্কযোগ্যভাবে এটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী পদ হিসেবে বিবেচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপ্রধানই অবিসংবাদিতভাবে সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা, নীতি, মনোভাব ও সিদ্ধান্তগুলো বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলে। তাই বিশ্বব্যবস্থাপনায় এই রাষ্ট্রপ্রধানের কদর অনেক বেশি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে এক বছর পার করে ফেললেন। এই এক বছরে অনেক কিছুই ঘটেছে। বলতে গেলে এই এক বছরে বিশ্বব্যবস্থাপনার কার্যাবলি ওলট–পালট হয়ে গেছে। এই বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে অর্থনীতি, সামাজিক নিয়মনীতি ও ভূরাজনীতির কর্মকাণ্ডে প্রভূত পরিবর্তন হয়েছে।

নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর গত বছর বিভিন্ন দেশের পণ্যের উপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অংশীদারভুক্ত দেশগুলোর ওপর গড়ে ১০ শতাংশ করে শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। তবে সবচেয়ে বেশি ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয় ভারতের ওপর। আর বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন অর্থ বিভাগের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্ক থেকে ২৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলার আয় হয়। ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের একেবারে প্রথমার্ধে ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট বা ইউএসএআইডির তহবিল সহায়তা ইসরায়েল ও মিশর বাদে বিশ্বব্যাপী বন্ধ করে দেয়। ইউএসএআইডির ফান্ড বন্ধের ফলে স্বাস্থ্য খাতে বড় প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে এইচআইভি, ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মা রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি অন্যতম। এক ধাক্কায় চাকরি হারায় কয়েক লাখ মানুষ। বাংলাদেশেও মার্কিন এই সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়।

ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর গত জুন মাসে সবচেয়ে বড় ঘটনার সৃষ্টি হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে মিলিত হয়ে সরাসরি ইরানে সামরিক হামলা করে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে হামলা চালায়। এতে যুক্তরাষ্ট্র  যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ২৩ জুন ইরান কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। এর পরে ট্রাম্প যুদ্ধ বিরতির কথা জানান। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। এর জেরে গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর অভিযানে সমাজবাদী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। ট্রাম্প প্রশাসন বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও গ্যাং সদস্য পাঠাচ্ছে। মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউইয়র্কে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পর থেকে শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার বিরুদ্ধেই শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিচ্ছেন ট্রাম্প।

রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প বরাবরই ইউক্রেনের বিপক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করে যুদ্ধ বন্ধের প্রতি আগ্রহ ছিল গত এক বছর। কিন্তু রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোন সমাধান হয়নি। ট্রাম্প কখনো রাশিয়া, কখনো ইউক্রেন আবার কখনো রাশিয়ার দিকে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে।

জো বাইডেনের মতো ইসরায়েল ফিলিস্তিন সংকটেও ইসরায়েলের প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন দিচ্ছেন ট্রাম্প। ইসরায়েল ফিলিস্তিন সংকটে যুদ্ধ বিরতিসহ ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার জন্য ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। গত বছরের এপ্রিলে পেহেলগাম হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধে জড়ালে যুদ্ধবিরতি কার্যকরে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এই এক বছরের মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয় ইউরোপ তথা পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে। ইউরোপের দেশ ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় ট্রাম্প। ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দ্বীপকে চীন ও রাশিয়ার হুমকি মনে করে। সে জন্য ইউরোপীয়দের সমালোচনার মুখেও ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের দখল নিতে অনড়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী নীতিতে বরাবরই কঠোর অবস্থানে ছিলেন ট্রাম্প। গত এক বছরে ২৫ লাখের বেশি মানুষকে বিতাড়িত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) জানিয়েছে, অন্তত ৬ লাখ ৫ হাজার মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার তথা নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

৭৫টি দেশের অভিবাসীদের জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়াকরণও স্থগিত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

হোয়াইট হাউস তথা ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক বছরে বিশ্বব্যবস্থাপনার হিসাব–নিকাশে পরিবর্তন হয়েছে। নানা আলোচনা–সমালোচনার জন্ম দিয়েছে তা বলার অপেক্ষা না। বলতে গেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থাকে কার্যত তছনছ করে দিয়েছেন গত এক বছরে। মোদ্দাকথা ট্রাম্পের নেওয়া একের পর এক আগ্রাসী পদক্ষেপ বিশ্বরাজনীতিকে এমন এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা বৈশ্বিক চিত্রপটে আগে কখনো দেখা যায়নি। হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের এখনো তিন বছর বাকি আছে। সামনের তিন বছরে আর্থিক, সামাজিক, ভূরাজনৈতিকসহ বৈশ্বিক কাঠামো ব্যবস্থাপনায় কেমন পরিবর্তন হয় সেই দিকে চোখ রাখবে বিশ্ববাসী।

  • লেখক: শাহ মুনতাসির হোসেন মিহান, এমএসএস শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়