শুভ জন্মদিন বিটিভি
বাংলাদেশ টেলিভিশন সংক্ষেপে বিটিভি। আমাদের মতো আশি অথবা নব্বই দশকে জন্ম নেওয়া মানুষের কাছে একটা আবেগ, ভালোবাসার নাম বিটিভি। এই সময়ে জন্ম নেওয়া মানুষের বিশেষ করে গ্রামে জন্মগ্রহণ করা আমাদের ছোটবেলার বিনোদনের অন্যতম উৎস ছিল বিটিভি। তখনকার দিনে গ্রামে বিদ্যুতের ব্যবস্থা ছিল না। ব্যাটারি দিয়ে সাদা–কালো টিভিতে বিটিভি দেখা সবার কাছে একটা অন্য রকম অনুভূতি ছিল। সপ্তাহজুড়ে বিটিভিতে বিভিন্ন আয়োজন থাকত। ওই সময় বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট খেলাও বিটিভিতে দেখেছি।
১৯৯৪ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা রাত জেগে বিটিভিতে দেখার স্মৃতি আজও অন্য রকম অনুভূতির জন্ম দেয়। বিশেষ করে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রায় প্রতিটি খেলা বাংলাদেশ সময় মাঝ অথবা শেষ রাতে অনুষ্ঠিত হতো। তাই রাত জেগে সবাই মিলে বিটিভিতে সেই খেলা উপভোগ করেছি, যা জীবনের সুখস্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।
বিটিভিতে প্রতি শুক্রবার আমাদের জন্য বিশেষ ভালোলাগার একটা দিন হয়ে আসত। শুক্রবার বেলা তিনটায় বিটিভিতে বাংলা সিনেমা দেখানো হতো। রাজ্জাক, আলমগীর, ববিতা, শাবানা, সালমান শাহ, হুমায়ুন ফরীদি—এই রকম আরও অনেক গুণী অভিনেতার স্মৃতিবিজড়িত সিনেমাগুলো পরিবার–পরিজন সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসে দেখার সময়গুলো এখনো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসে। নায়ক–নায়িকা ভিলেনের কাছে মার খেলে কিংবা কষ্ট পেলে মনের অজান্তে খারাপ লাগা কিংবা সিনেমার শেষে ভিলেন মার খেলে মনের আনন্দে নেচে ওঠা—এই আবেগ, ভালোবাসার মুহূর্তগুলো কখনোই ভোলার নয়।
নব্বই দশকে আমাদের মতো স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের জন্য আরেকটি আবেগের অনুষ্ঠান ছিল আলিফ লায়লা অথবা সিন্দাবাদ। আলিফ লায়লা, আলিফ লায়লা গানের সেই সুর এখনো মনের মধ্যে আলাদা একটা অনুভূতির সৃষ্টি করে। এ সুরের এতটাই জাদু যে জীবনের মাঝবয়সে এসে এখনো মনের মধ্যে সেই পুরোনো আবেগের জন্ম দেয়। আর সিন্দাবাদের সেই দৈত্যের কথা মনে পড়লে এখনো শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
ওই সময় বিটিভিতে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের নাটক আমাদের বিনোদনের মাধ্যম ছিল।
কিছু কিছু নাটক তো আবার ইতিহাস হয়ে আছে। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি যাতে না হয় এ জন্য সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ প্রতিবাদ মিছিল বের করেছিলেন। বাকের ভাইয়ের ফাঁসির বিরুদ্ধে প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দেওয়া হয়েছিল রাজপথ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। বাকের ভাই চরিত্র ও নাটকের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদের পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে জানতে পেয়েছি, ওই সময় অনেকে হুমায়ূন আহমেদকে অনুরোধ করেছিলেন, যাতে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কার্যকর না হয়।
এ ছাড়া ‘রূপনগর’, ‘আজ রবিবার’, ‘রবিনহুড’, ‘ম্যাকাইভার’, কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘কৃষি দিবানিশি’, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনবিষয়ক নাটক, সিনেমা—এ রকম আরও অনেক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রচার করে বিটিভি আমাদের মনে একটা আবেগের নাম হয়ে আছে। তাই তো এত বছর পর এসেও ইত্যাদি অনুষ্ঠান দেখার জন্য এখনো শত ব্যস্ততার মধ্যেও ইউটিউবে ঢুঁ মেরে আসি। ইত্যাদির টাইটেল গানের সুর আজও লাখো দর্শকের মনে দাগ কেটে যায়।
আজ ২৫ ডিসেম্বর। বিটিভির ৬০তম জন্মদিন। ৫৯ পেরিয়ে ৬০ বছরে পদার্পণ করল বিটিভি। আমাদের শৈশব, কিশোর বয়সকে বিনোদনে রাঙিয়ে স্মৃতিময় করে রাখার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ বিটিভি। শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)।
* লেখক: প্রীতম মন্ডল, ব্যাংক কর্মকর্তা