জেফরি এপস্টেইন: ভয়ের সংস্কৃতি, ক্ষমতার নীরবতা ও মানবতার সংকট
কিছু নাম থাকে, যেগুলো কেবল ব্যক্তিকে নির্দেশ করে না, একটি সময়কে নির্দেশ করে। জেফরি এপস্টেইন তেমনই একটি নাম। এই নাম উচ্চারিত হলেই আমরা আর একজন মানুষের কথা চিন্তা করি না। আমরা চিন্তা করি একটি ব্যবস্থার কথা। চিন্তা করি এমন এক কাঠামোর কথা, যেখানে ক্ষমতা প্রশ্নহীন, নীরবতা নিরাপদ আর মানবিকতা ক্রমেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। এপস্টেইন কেস আমাদের সামনে এমন এক বাস্তবতা উন্মোচন করে, যেখানে অপরাধ শুধু ব্যক্তিগত বিকৃতি নয়, বরং একটি সামাজিক কাঠামোর স্বাভাবিক ফল হয়ে ওঠে। এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনার গল্প নয়। এই কেসের দিকে তাকালে প্রথমেই যে প্রশ্নটি সামনে আসে সেটি হলো—দীর্ঘ সময় ধরে এত গুরুতর অভিযোগ কীভাবে অদৃশ্য থেকে গেল? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের চোখ পড়বে ভয়ের সংস্কৃতি নামক এক ভয়ংকর সংস্কৃতির দিকে। এই ভয় শুধু ভুক্তভোগীদের নয়, এই ভয় সমাজের, প্রতিষ্ঠানের, এমনকি নৈতিকতারও। যখন ভয় প্রশ্নকে থামিয়ে দেয়, তখন অপরাধ নিরাপদ আশ্রয় পায়। এটি একটি দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল। প্রশ্ন হলো, এই প্রস্তুতি কারা নিয়েছিল? আর আমরা কোথায় ছিলাম?
এপস্টেইন আমাদের প্রথম যে সত্যটির মুখোমুখি দাঁড় করায় তা হলো অপরাধ কখনো একা জন্মায় না। অপরাধের আগে জন্মায় ভয়। ভয় জন্মায় নীরবতা থেকে। আর নীরবতা ধীরে ধীরে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। যে সংস্কৃতিতে প্রশ্ন করা বেয়াদবি, সন্দেহ প্রকাশ বিপজ্জনক আর চুপ থাকাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। এই ভয় কেবল ভুক্তভোগীদের ভয় নয়, এই ভয় সমাজের, এই ভয় প্রতিষ্ঠানের, এই ভয় সেই সব মানুষের—যারা জানে কিন্তু জানার দায় নিতে চায় না।
এপস্টেইনের ঘটনা আমাদের শেখায় ক্ষমতা কখনো একা থাকে না। ক্ষমতার সঙ্গে চলে প্রভাব, প্রভাবের সঙ্গে চলে সুবিধা আর সুবিধার সঙ্গে চলে একধরনের সামাজিক চুক্তি। যেখানে সবাই জানে কিন্তু কেউ বলে না। এই চুক্তির ভাষা খুব সরল। যেমন তুমি চুপ থাকবে, আমিও থাকব। তাহলেই আমরা সবাই নিরাপদ থাকব। কিন্তু এই নিরাপত্তা কাদের জন্য?
এপস্টেইনের ঘটনা শুধু অপরাধের গল্প নয়, এটি দায়বদ্ধতার গল্প। এ ঘটনা আমাদের সামনে একটি আয়না। এই আয়নায় আমরা দেখতে পাই আমাদের সমাজের ফাটল, আমাদের নৈতিক দ্বিধা, আমাদের ভয়ের সীমা। প্রশ্ন হলো, এই আয়নায় তাকিয়ে আমরা কী করব?
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিক হলো এটি সবচেয়ে দুর্বলদের সবচেয়ে অসুরক্ষিত করে তোলে। শিশু ও কিশোরেরা এখানে কেবল ভুক্তভোগী নয়, তারা এই নীরবতার বলি। শিশু সুরক্ষা তখন আর অধিকার থাকে না, এটি হয়ে ওঠে একটি স্লোগান, যা বক্তৃতায় ভালো শোনায়; কিন্তু বাস্তবে কাউকে রক্ষা করে না। আমরা জানি আইন আছে। প্রশ্ন হলো, আইন কাদের জন্য কাজ করে? এই কেস দেখায়, আইন থাকা আর ন্যায়বিচার পাওয়া এক বিষয় নয়। আইন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা প্রয়োগের সাহস থাকে। আর সেই সাহসের অভাবই ভয়ের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সাফল্য। কারণ, ভয় মানুষকে শুধু নীরব করে না, ভয় মানুষকে যুক্তি খুঁজতে শেখায় কেন চুপ থাকা যুক্তিসংগত, কেন প্রশ্ন না করাই ভালো।
এই যুক্তির সমষ্টিই অতি বিপজ্জনক। ভয়ের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে আমাদের নৈতিক অনুভূতিকে ভোঁতা করে দেয়। প্রথমে আমরা বিস্মিত হই, পরে অভ্যস্ত হয়ে যাই। একসময় আর কিছুই অস্বাভাবিক মনে হয় না। এপস্টিন কেস তাই শুধু একটি অপরাধের দলিল নয়, এটি আমাদের অভ্যাসের দলিল। কীভাবে আমরা অন্যায়কে সহ্য করতে শিখি, কীভাবে আমরা বিবেককে সাময়িক ছুটিতে পাঠাই।
এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে অভিযুক্ত করা নয় কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও নয়। এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগও নয়। এটি একেকটা প্রশ্নের অনুসন্ধান। মূল উদ্দেশ্য হলো একেকটি প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া। আমরা কী ধরনের সমাজ তৈরি করছি? উত্তরে বলতে হবে—যে সমাজে খুব কমসংখ্যক ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা যায়, যে সমাজে শিশুদের কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পায় না, যে সমাজে নীরবতাকে বুদ্ধিমত্তা মনে করা হয়, সেই সমাজ কি আদৌ মানবিক থাকতে পারে?
এপস্টেইন কেস আমাদের মনে করিয়ে দেয় নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ নয়। নীরবতা সব সময় একটি পক্ষ নেয়। ইতিহাস বলে, ‘নীরবতা প্রায়শ শক্তিশালীদের পক্ষে দাঁড়ায়।’ আর সেই শক্তিশালীদের সুরক্ষার মূল্য দিতে হয় যাদের কণ্ঠ সবচেয়ে দুর্বল। এই কেস আমাদের আরও মনে করিয়ে দেয় ন্যায়বিচার কেবল আদালতের বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক চর্চা। সমাজ যদি প্রশ্ন না তোলে, প্রতিষ্ঠান যদি দায়িত্ব না নেয়, রাষ্ট্র যদি স্বচ্ছ না হয়, তাহলে অপরাধ নিজেই একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়। তখন অপরাধ আর ব্যতিক্রম থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে নিয়ম।
নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমরা প্রায়ই ভাবি, এ ধরনের ঘটনা হয় ‘ওখানে’, ‘অন্য কোথাও’, ‘অন্য দেশের’, ‘আমাদের সমাজে নয়’। কিন্তু এ ভাবনাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। এই কেস কোনো ভূগোলের গল্প নয়, এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ। যেখানে ক্ষমতা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে উঠে যায়, সেখানেই এপস্টিন ধরনের কাঠামো তৈরি হয়। ভয়ের সংস্কৃতির কোনো পাসপোর্ট লাগে না। যেখানে প্রশ্ন দমিয়ে রাখা হয়, যেখানে ক্ষমতার সমালোচনা অপরাধ হয়ে ওঠে, যেখানে ভুক্তভোগীকে সন্দেহ করা হয় আর সেখানেই এ সংস্কৃতি জন্ম নেয়।
এপস্টেইন কেস তাই আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি বলে দেয়, যদি আমরা এখনো প্রশ্ন না তুলি, যদি এখনো নীরবতাকে বুদ্ধিমত্তা ভাবি, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা বিস্মিত হওয়ার অধিকারও হারাব।
পরিশেষে বলব, এপস্টেইনের ঘটনা শুধু অপরাধের গল্প নয়, এটি দায়বদ্ধতার গল্প। এ ঘটনা আমাদের সামনে একটি আয়না। এই আয়নায় আমরা দেখতে পাই আমাদের সমাজের ফাটল, আমাদের নৈতিক দ্বিধা, আমাদের ভয়ের সীমা। প্রশ্ন হলো, এই আয়নায় তাকিয়ে আমরা কী করব? চোখ ফিরিয়ে নেব নাকি ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে মানবিকতার পক্ষে দাঁড়াব? আবারও মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছি, যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সে সমাজ একদিন নিজেই প্রশ্নের মুখে পড়ে। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে নিরাপত্তা কেনা যায় নীরবতার বিনিময়ে? নাকি আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে প্রশ্ন করাই মানবিক দায়িত্ব?
লেখক: সুমন চৌধুরী, শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।