করপোরেট মুনাফা বনাম জনস্বাস্থ্য: প্যাকেজের গায়ে কালো দাগের যুদ্ধ আর কিছু ‘আজগুবি’ যুক্তি
ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) বা প্যাকেটজাত খাবারের সামনের অংশে স্পষ্ট, সহজ সতর্কতামূলক লেবেল নিয়ে কাজ করতে আজকাল নিত্যনতুন আজগুবি তর্কের মুখোমুখি হতে হয়। বহুজাতিক কোম্পানির লবিস্ট থেকে শুরু করে আইনপ্রণেতাদের একাংশের মুখে এমন সব যুক্তি শোনা যায়, যা শুনলে হাসি পাওয়াটাই স্বাভাবিক, যদি না বিষয়টি সরাসরি কোটি কোটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত থাকত।
এসব আজগুবি তর্কের প্রথমটিই হলো: কেন আমরা বারবার লাতিন আমেরিকার কথা বলি? কেনই–বা চিলির নামটা সবার আগে আসে?
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
চিলিতে বিংশ শতাব্দীর শেষ ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চিলিতে স্থূলতা এবং অসংক্রামক রোগ (যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ) এক ভয়ংকর মহামারি রূপ নিয়েছিল। দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং প্রতি চারজন স্কুলশিক্ষার্থীর মধ্যে একজন অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা ভুগছিল। মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৩% থেকে ৮৫%–এর জন্য দায়ী ছিল এই অসংক্রামক রোগগুলো। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের হার ১০% ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এই ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য–সংকট দেশটিকে আর হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ রাখেনি। তৎকালীন সিনেটর গিদো গিরার্ডি এবং স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের নিরলস উদ্যোগে ২০১২ সালে পাস হয় যুগান্তকারী আইন নং ২০.৬০৬। দীর্ঘ আইনি লড়াই পেরিয়ে ২০১৬ সালের ২৭ জুন থেকে শুরু হয় এর মূল বাস্তবায়ন। চিলি সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে তিন ধাপে আইনটি কার্যকর করে-
• ২০১২: পুষ্টি উপাদান এবং বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের মূল আইন পাস।
• ২০১৬ (জুন): প্যাকেজের সামনে কালো রঙের অষ্টভুজাকার (অতিরিক্ত) সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করা হয়। একই সঙ্গে শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন এবং বিদ্যালয়ে বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়।
• ২০১৮ ও ২০১৯: ফুড ইন্ডাস্ট্রির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ধাপে ধাপে লবণের, চিনি, চর্বি ও ক্যালোরির মাত্রা (থ্রেসহোল্ড) আরও কমিয়ে আনা হয়।
অবশ্য এই পথ এত মসৃণ ছিল না। আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে বড় বড় বহুজাতিক খাদ্য প্রস্তুতকারক ও বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলো তীব্র বাধা সৃষ্টি করে। তারা লবিংয়ের মাধ্যমে আইন বিলম্বিত করার চেষ্টা করে, এই লেবেল ভোক্তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে বলে মিথ্যা জুজুর ভয় দেখায় এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) পর্যন্ত আপত্তি তোলে।
কিন্তু ফলাফল কী দাঁড়াল? বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এর গবেষণায় দেখা গেল, আইন চালুর পর পরিবারের উচ্চ চিনিযুক্ত পানীয় কেনা ২৩% এবং সোডিয়ামযুক্ত খাবার কেনা ১৪% কমে গেছে। সামগ্রিক ক্যালোরি গ্রহণ কমেছে ১০% এবং ৪ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের স্থূলতা ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। কালো সতর্কবার্তা এড়াতে বহুজাতিক খাদ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের রেসিপি পরিবর্তন করে চিনি, সোডিয়াম ও চর্বি কমাতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি শিশুদের আকৃষ্ট করার লোভনীয় কৌশল এবং স্কুলের ক্যানটিন থেকে জাঙ্ক ফুড চিরতরে বিদায় নেয়।
চিলির এই মডেল আজ প্রমাণ করেছে যে স্পষ্ট মানদণ্ড এবং নীতি থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আভ্যাস, প্রয়োজন ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বাধ্য হয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো জাতীয় সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
চিলির পর লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। মেক্সিকো, আর্জেন্টিনাসহ মোট ১০টি দেশ জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও স্থূলতা সংকট মোকাবিলায় এফওপিএল বা সতর্কতামূলক লেবেল আইন চালুর ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
এফওপিএল নিয়ে কাজ করতে গেলে সবচেয়ে কমন একটি কথা শুনতে হয়, ‘আমরা কেন সব সময় লাতিন আমেরিকার উদাহরণ দেব? আমাদের সঙ্গে তো লাতিন আমেরিকার কোনো মিলই তো নেই!’
আপাতদৃষ্টিতে কথাটি সত্য মনে হতে পারে, কিন্তু এটি একটি অত্যন্ত আংশিক ও বিভ্রান্তিকর ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ, রোগের ধরন, জাঙ্ক ফুডের আগ্রাসন এবং বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফাকেন্দ্রিক নীতি বিশ্বজুড়ে একই সূত্রে গাঁথা। জনস্বাস্থ্যের মৌলিক প্রশ্নে ভৌগোলিক দূরত্ব বা খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতা কখনো বাধা হতে পারে না; যেখানেই সংকট তীব্র হয়, সমাধানও সেখানে সর্বজনীন রূপ নেয়, কোভিড মহামারি যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
একটু চোখ কান খোলা রাখলেই দেখা যাবে, এশিয়ার দেশগুলোও বসে নেই। সিঙ্গাপুর ‘নিউট্রি -গ্রেড’ গ্রেডিং সিস্টেম এবং থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়া কঠোর পুষ্টি নীতিমালা চালুর মাধ্যমে অস্বাস্থ্যকর প্যাকেটজাত খাবার নিয়ন্ত্রণ করছে। আর আমাদের একেবারে পাশেই ভারত জনস্বাস্থ্য সংকট ও আদালতের আইনি ধাক্কায় নরম ‘স্টার রেটিং’ থেকে সরে এসে প্যাকেটে স্পষ্ট ‘লাল রঙের ষষ্ঠভুজাকার’ বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তা চালুর ঐতিহাসিক রূপান্তরের মুখে রয়েছে। অর্থাৎ এই উপমহাদেশেও এখন কঠোর সতর্কবার্তার অনিবার্যতা তৈরি হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, সবার জন্য মঙ্গলজনক এমন একটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে কি সরকারের ভেতর সদিচ্ছার অভাব রয়েছে? খুশির কথা হলো, সরকারের নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য খাতের বড় একটা অংশের ভেতর এই আইনটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নীতিগত সম্মতি রয়েছে। তারা স্পষ্টভাবেই অনুধাবন করেন যে অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি, লবণের এবং চর্বির কারণে আজ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগ মহামারির রূপ নিয়েছে। এ কারণে চিকিৎসার পেছনে যে বিশাল ব্যক্তিগত ও জাতীয় ব্যয় হয়, তা দেশের অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয় ঠিক তখনই, যখন এই ইতিবাচক চিন্তার ওপরে এসে ভর করে এক শক্তিশালী অদৃশ্য চাপ ও লবিংয়ের জাল। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বৃহৎ ফুড ইন্ডাস্ট্রির বাণিজ্যিক লবিং এবং মুনাফাকেন্দ্রিক শক্তির প্রভাব অনেক সময় এত প্রবল থাকে যে জনস্বাস্থ্যের জোরালো কণ্ঠস্বরটি মাঝপথেই ঢাকা পড়ে যায়। ফাইল এগোতে গিয়ে অদৃশ্য ইশারায় আটকে যায়, সঙ্গে সঙ্গে জনস্বার্থের প্রশ্নটি কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের অবস্থানকে একটু জোরালো করা জরুরি। মুনাফাকেন্দ্রিক শক্তিকে রাষ্ট্র খুব স্পষ্ট ভাষায় বলতেই পারে: আজকের সাময়িক বাণিজ্যিক মুনাফা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যে পঙ্গুত্ব ও অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও মানবিক মূল্য কত বিশাল! মুনাফার সেই হিসাবের খতিয়ানে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাতের ধ্বংসযজ্ঞ এবং মানবসম্পদের অপচয়ের হিসাবটিও কি কখনো যুক্ত করা হয়?
জনস্বার্থ যখন বিপন্ন, তখন রাষ্ট্রের কাজ অদৃশ্য লবিংয়ের কাছে নতি স্বীকার করা নয়; বরং সেই অদৃশ্য চাপকে পাশ কাটিয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন করে জনজীবন রক্ষা করা। সরকারের ভেতরের সদিচ্ছা যখন দৃশ্যমান সাহসে রূপ নেয়, কেবল তখনই চিলি বা ভারতের মতো দেশগুলোর মতো করে করপোরেট মুনাফার ঊর্ধ্বে সাধারণ মানুষের জীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হয়। কালো দাগের এই সতর্কবার্তা শুধু একটা লেবেল নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকারের লড়াই।