আমি লঞ্চ ভালোবাসি
সদরঘাটে যেতে কষ্ট, কুলিদের বাড়াবাড়ি, তোশক বাণিজ্য, খাবারের অতিরিক্ত দাম, টিকিট কালোবাজারি—সমস্যার শেষ নেই।
তারপরেও আমি লঞ্চ ভালোবাসি।
ফিনফিনে জোছনা রাতে লঞ্চের করিডোরে দমকা বাতাসে প্রিয়তমার চুলের ঝাপটা যখন চোখে-মুখে লাগে, কড়া পারফিউমের গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে—আহ্, কী মায়াময় সময়! এই জন্যই আমি লঞ্চ ভালোবাসি।
মাঝরাতে লঞ্চের প্রতিযোগিতা, লঞ্চে লঞ্চে ধাক্কাধাক্কি, চরে আটকে যাওয়ার উৎকণ্ঠা—তারপরও আমি লঞ্চ ভালোবাসি।
হকারদের হইহল্লা, নদীর পানি ‘খাবার পানি’ বলে বোতলে বিক্রি, মায়ের হাতে মার খেয়ে পিচ্ছি ছেলেটার আকাশ-ফাটানো কান্না, বৃষ্টিতে পা পিছলে তরুণীর পড়ে যাওয়া আর রাজ্যের মানুষের হাসাহাসি—এই সব কিছুর জন্যও আমি লঞ্চ ভালোবাসি।
সুর তুলে যাত্রী ডাকার মানুষের দল—এই কোলাহলও আমার ভালো লাগে। হিজলা, মুলাদি কিংবা চাঁদপুরের আগেই কেউ দিক না ব্যাগ নিয়ে ঝাঁপ—তারপরও আমি লঞ্চ ভালোবাসি। আমার সব আবেগ, সব ভালোবাসা ওই লঞ্চেই আটকে আছে।
তোমরা যতই বলো ‘খাতার গাট্টি’, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। প্রচণ্ড শীতে খাতা মুড়ি দিয়ে ডেকের কড়া লিকারের চায়ে টোস্ট বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে চাই, ভাতের সঙ্গে ডাল-চড়চড়ি খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে চাই।
ডেকে এক লাস্যময়ী মেয়ের সঙ্গে কত গল্প যে হয়েছিল একদিন! প্রেমে একেবারে হাবুডুবু। তারপর সে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। সেই হারিয়ে যাওয়ার জন্যও আমি লঞ্চ ভালোবাসি।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
যে মা ছেলের জন্য হাঁস, মুরগি, পিঠা লঞ্চে নেয়—তোমরা কি তার ভালোবাসা একটুও টের পাও না? একটুও কি তোমাদের ছুঁয়ে যায় না?
লঞ্চের ডেকে কেউ তাস পেটায়, কেউ ঘুমায়, কেউ খায়, কেউ গল্পে মাতে। কারও আচরণে মনে হয়—এটাই যেন তার নিজের বাড়ি। অনেক আগে কিনে রেখেছিল। আমি এসব দৃশ্য ভালোবাসি। আমি লঞ্চ ভালোবাসি।
ছিনতাইকারী, পকেটমার ধরা পড়ার পর মানুষের সে কী উত্তেজনা! সেই উত্তেজনা দেখার জন্য হলেও আমি লঞ্চ ভালোবাসি।
লঞ্চের মসজিদে বা ছাদে খোলা আকাশের নিচে প্রার্থনার পরম শান্তি পাওয়ার জন্য হলেও আমি লঞ্চ ভালোবাসি।
আমি হুমায়ুনের হিমুর আছে জলের হিমু কিংবা ‘তৃষ্ণার জন্য হলেও আমি লঞ্চ ভালোবাসি।’
ধান, নদী, খাল—এই তিনে বরিশাল। নদ-নদীর দেশের মানুষ হয়ে লঞ্চ ভালো না বেসে থাকি কী করে! পদ্মা সেতু হোক আরও, দ্রুতগামী ট্রেন চলুক, বিমানভাড়া কমুক—তারপরও আমি লঞ্চেই বরিশাল যাব। আমি লঞ্চ ভালোবাসি।
*লেখক: মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, ফিরোজা মঞ্জিল (পোস্ট অফিসের বিপরীতে), বি এম কলেজ রোড, বরিশাল