ওরহান গাজী: ওসমানীয় সাম্রাজ্যের মহাদিগন্ত সূচনায় ঐতিহাসিক এক নাম—পর্ব দ্বিতীয়
প্রথম পর্বের শেষে উল্লিখিত হয়েছিল যে ওসমান গাজীর মৃত্যুর পর ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে ওরহানের প্রতিদ্বন্দ্বী হন তাঁর ভাই আলাউদ্দিন বে। আলাউদ্দিনের মা ছিলেন ওসমান গাজীর দ্বিতীয় স্ত্রী বালা হাতুন। আলাউদ্দিন ছোটবেলা থেকে জ্ঞান আরোহণ করতে ছিলেন বেশ আগ্রহী।
কিছু সূত্র বলে, তিনি কোনিয়াতে লেখাপড়া করেছিলেন। দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার জ্ঞানও অর্জন করেছিলেন। তা ছাড়া তিনি তাঁর জীবনের বেশ কিছু সময় তাঁর নানা ১৩ শতাব্দীর বিখ্যাত দরবেশ শাইখ এদেবালির সঙ্গে কাটিয়েছিলেন। এ জন্য সুফি-দরবেশদের সঙ্গে আলাউদ্দিনের সুসম্পর্ক ছিল এবং তাঁদের সাহচর্যে তিনি বেশ ধার্মিক হয়ে ওঠেন। এভাবে তিনি ধীরে ধীরে একজন আলেম হয়ে ওঠেন। ওসমানীয় সাম্রাজ্যে শিশু-কিশোরদের শিক্ষার ব্যাপারে বেশ বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। এ ছাড়া আলাউদ্দিন অনেক সেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে ওসমানীয় সাম্রাজ্যে জনগণের মন জয় করে নিয়েছিলেন। তাই বলা যায়, তিনি ছিলেন ওরহানের মোটামুটি বিপরীত এক চরিত্র।
ওরহান যেমন যুদ্ধ-অভিযান পরিচালনায় ছিলেন বেশ দক্ষ, অপরদিকে আলাউদ্দিন ছিলেন জ্ঞানচর্চায় মশগুল ও জনহিতকর কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে প্রজাদের উন্নয়ন সাধনকারী। ওসমান বে-ও আলাউদ্দিনকে খুব ভালোবাসতেন। কয়েকটি সূত্র অনুযায়ী, বিভিন্ন যুদ্ধ ও অভিযানের সময় ওসমান তাঁর পুত্র আলাউদ্দিনের কাছে নিজের সিংহাসন, গোত্র ও রাজধানীর শাসন দায়িত্ব আমানত হিসেবে রেখে যেতেন। আলাউদ্দিন বে-ও বেশ সতর্কতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আমানত রক্ষার দায়িত্ব পালন করতেন। এ জন্য ওসমানীয় সাম্রাজ্যে জনগণের একটি বড় অংশ তাঁকে ভালোবাসতেন।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ইতিহাসবিদদের মতে, আলাউদ্দিন বে একজন আলেম হিসেবে তলোয়ারের স্থলে কলম বেশি ব্যবহার করতেন। তবে তিনিও কয়েকটি যুদ্ধে ও অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। ওসমান গাজীর মৃত্যুর পর ওরহান নাকি আলাউদ্দিন—কে বসবে সিংহাসনে, এমন জল্পনা শুরু হয়ে যায়। সাম্রাজ্যের অধিকাংশ বে ও নেতৃস্থানীয় অনেকেই ওরহানকে সিংহাসনে বসানোর পক্ষে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে শতবর্ষী বিখ্যাত যোদ্ধা তুরগুত বে ও আবদুর রহমান গাজী যেমন ছিলেন, তেমনি কোসে মিহাল, কনুর আল্প, তুরহান, সামসা চাভুসসহ অনেকেই ওরহানের পক্ষে ছিলেন। এমনকি ওসমানের ভাতিজা আকতেমুর বে ও সুলেইমান বে ওরহানের পক্ষে সমর্থন জানান। তা ছাড়া সাম্রাজ্যে জনগণের একটি বড় অংশও ওরহানকে নতুন আমির হিসেবে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে আলাউদ্দিনকেও সুফি-দরবেশ, আলেম ও সাধারণ জনগণের অনেকেই পছন্দ করতেন বিধায় তাঁরাও সিংহাসনে বসতে আলাউদ্দিনকে এগিয়ে রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ বের সমর্থন নিয়ে ওরহান ওসমানীয় সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শাসক হিসেবে সিংহাসনে বসেন। এ ছাড়া ওরহানকে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে ওসমান তাঁর মৃত্যুর আগে অসিয়ত করায়, আলাউদ্দিনও তা মেনে নিয়েছিলেন এবং বড় ভাই ওরহানকে বাবার নতুন শাসক হিসেবে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছিলেন। যদিও সিংহাসনে বসে ওরহান উপলব্ধি করতে পারেন আলাউদ্দিনের ব্যাপক জনসমর্থন। তাই তিনি আলাউদ্দিনকে সাম্রাজ্য দুই অংশে ভাগ করে দুই ভাইয়ের জন্য নিজেদের আলাদা আলাদা অংশ শাসন করার প্রস্তাব দেন। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাব অনুযায়ী, ওরহান ও আলাউদ্দিন দুজনেই হতে পারতেন ওসমানীয়দের শাসক। তবে এ প্রস্তাব আলাউদ্দিন নাকচ করে দেন, কারণ তিনি তাঁর বাবা ওসমানের এক সাম্রাজ্য ও এক শাসক নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। সে জন্য তিনি ওরহানকে নতুন শাসক হিসেবে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। ওরহান পরবর্তী সময়ে ওসমানীয় সাম্রাজ্যে উজির পদের সৃষ্টি করেন। তিনি এই পদের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর ভাই আলাউদ্দিনকে নিয়োগ দেন। তাই আলাউদ্দিন ছিলেন ওসমানী সাম্রাজ্যের প্রথম উজির।
সিংহাসনে বসে ওরহান অধিকাংশ বে ও সাম্রাজ্যের অধীন গোত্রগুলোর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের পরামর্শে ‘সুলতান’ উপাধি গ্রহণ করেন। ফলে ওসমানীয় সাম্রাজ্যে জনগণের কাছে প্রথম সুলতান হিসেবে ওরহান গাজী সম্মানিত হন। তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তিনি তাঁর বাবার মতোই জনগণের মুখে নিজেকে সুলতান হিসেবে ডাকা পছন্দ করতেন না। বরং সাম্রাজ্যের প্রধান বে হিসেবে মানুষের সেবা প্রদানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এ জন্য সাম্রাজ্যে তাঁকে ‘বে’ হিসেবেই বেশি ডাকা হতো।
ওরহান গাজী সিংহাসনে বসে সাম্রাজ্যকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে থাকেন। এ সময় উজির আলাউদ্দিন পাশা তাঁকে তিনটি প্রস্তাব প্রদান করেন। যেগুলো হলো—
১. সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের লক্ষ্যে নিজস্ব স্থায়ী মুদ্রার প্রচলন করা।
২. সাম্রাজ্যের বে থেকে শুরু করে আল্প (সিপাহি) পর্যন্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ওসমানীয় পোশাকের (ইউনিফর্ম) ব্যবস্থা করা।
৩. সাম্রাজ্যের একটি নিয়মিত সেনাবাহিনী গড়ে তোলা।
ওরহান তাঁর ভাইয়ের এ পরামর্শগুলো নিজে পর্যালোচনা করতে থাকেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৩২৮ ও ১৩২৯ সালে সাম্রাজ্যে রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন করা হয়। রৌপ্যমুদ্রায় ওরহানের নাম লেখা ছিল। তা ছাড়া তিনি সাম্রাজ্যের বে–দের থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সব কর্মকর্তার পোশাকে পরিবর্তন আনেন। এ ছাড়া তিনি একটি নিয়মিত সেনাবাহিনী গঠনে পদক্ষেপ নেন। এ জন্য তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত সৈন্যদের বেতনভাতার ব্যবস্থা করেন। বলা বাহুল্য, ওরহানের দাদা আরতুগ্রুলের কায়ী গোত্রের রীতি অনুযায়ী আল্প বা সৈন্যরা মূলত ছিল অনিয়মিত বাহিনী। তাদের কোনো বেতনভাতা ছিল না। অধিকাংশ আল্পই কৃষিকাজ করতেন আর বসতি পাহারা দিতেন। যুদ্ধ বা অভিযানের সময় হলে অংশ নিতেন, যা ওরহানের শাসনের প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত বলবৎ ছিল। এই রীতি অধিকাংশ তুর্কি গোত্রেরই ছিল। যেহেতু ওসমানীয়রা একটি বসতি থেকে উঠে আসা রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র থেকে ধীরে ধীরে সাম্রাজ্যের রূপ নিচ্ছিল, তাই একটি নিয়মিত সেনাবাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তাও ভালোভাবে ফুটে উঠেছিল। এ জন্য প্রাসাদের সুরক্ষা থেকে শুরু করে যুদ্ধ-অভিযানের যোগ্য ও দক্ষ সৈন্যদের বাছাই করে নিয়মিত বাহিনী গড়ে তোলা হয়। চলবে...
*লেখক: তাওহীদ জানান অভিক, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়