বিশ্ব আদিবাসী দিবস: সংকটে মাহাতোদের ভাষা ও সংস্কৃতি
আজ ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছরই এই দিনটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৯ আগস্টকে বিশ্ব আদিবাসী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। দিবসটি পালনের লক্ষ্য হলো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার রক্ষা, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করা এবং বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বাড়ানো।
বাংলাদেশ জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে নানা ভাষা ও সংস্কৃতি-সমৃদ্ধ একটি দেশ। এ দেশে সরকারিভাবে স্বীকৃত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ৫০টি। এদের মধ্যে সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী মাহাতো। এই জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা মাহাত, মাহাতী বা মাতো নামে পরিচিত। কোনো কোনো অঞ্চলে এরা কুড়মি নামেও পরিচিত। বাংলাদেশ ও ভারতে বসবাসরত কুড়মিরা সাধারণত মাহাতো পদবি ব্যবহার করে থাকেন। আবার সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে এরা প্রধানত কুড়মি নামে পরিচিত হলেও বাংলাদেশ গেজেটে (২৩ মার্চ ২০২৩) এদেরকে মাহাতো / কুড়মি মাহাতো / বেদিয়া মাহাতো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জানা যায়, মাহাতোদের সিংহভাগ ভারত, নেপাল, মরিশাস ও বাংলাদেশে বসবাস করে। বাংলাদেশে প্রধানত দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে এরা ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে। দেশে বসবাসরত মাহাতো পরিবারের সংখ্যা ৫৩৬৭টি এবং জনসংখ্যা ৩৬০১২ জন। দেশের ৫টি বিবভাগের ১৬টি জেলার ৩৩টি উপজেলার ৭৪টি ইউনিয়নের ১৮৩টি গ্রামে এদের বাস। দীর্ঘকাল ধরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সহাবস্থান করা সত্ত্বেও মাহাতোরা তাদের স্বতন্ত্র সামাজিক কাঠামো, নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও গোষ্ঠীগত স্বাতন্ত্র্য সফলভাবে বজায় রেখে চলেছে।
যেকোনো জাতি বা গোষ্ঠীর পরিচয় নির্ণয়ে ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। মাহাতোরা তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির কারণে পৃথক জাতিসত্তা হিসেবে পরিচিত। নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে জানা যায়, মাহাতোরা অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ। ডাল্টন মাহাতোদের আগের আর্য-উপনিবেশবাদীদের বংশধর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মাহাতোদের ভাষার নাম কুড়মালি। এটি মূলত আধা সংস্কৃত ও আধা হিন্দি মেশানো। এ ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। তবে এই ভাষার রয়েছে একটি আলাদা বাচনভঙ্গি। মাহাতোরা নিজেদের মধ্যে কুড়মালি ভাষায় কথা বলে এবং তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আইন্যাশ কুড়মালি ভাষায় রচিত।
মাহাতোদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অনেক প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। গবেষকদের ধারণা, প্রাচীন চর্যাপদের বেশ কয়েকটি শব্দ কুড়মালি ভাষায় রয়েছে। ভারতে কুড়মালি ভাষায় বেশ কিছু পুস্তক রয়েছে। কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপন্যাসে গনু মাহাতো ও সমরেশ বসুর আম মাহাতো উপন্যাসে আম মাহাতো চরিত্র দেখা যায়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় চা–বাগানের শ্রমিক সাগিনা মাহাতোর জীবনী নিয়ে ১৯৭০ সালে নির্মিত হয় বাংলা সিনেমা ‘সাগিনা মাহাতো’। তবে বাংলাদেশে কুড়মালি ভাষার সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা তুলনামূলকভাবে কম। এ দেশে কুড়মালি ভাষায় ২০১৩ সালে প্রথম উপন্যাস কারাম রচনা করেন তরুণ গবেষক উজ্জ্বল মাহাতো। এ ছাড়া তাঁর কথা ও সুরে দেবাশীষ মাহাতোর কণ্ঠে কুড়মালি ভাষায় গানের একক অ্যালবাম এ্যাগোবার প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি দেবাশীষ মাহাতো ও রবীন্দ্রনাথ মাহাতোর পরিচালনায় কুড়মালি ভাষায় প্রথম নাটক হঁটংটয়া রচিত হয়। অধ্যাপক ড. খ ম রেজাউল করিম ও অন্যদের রচিত গবেষণা গ্রন্থ মাহাতো জনগোষ্ঠী: সমাজ ও সংস্কৃতি ২০২১ সালে প্রকাশিত হয়। ২০২২ সালে বইমেলায় প্রকাশিত হয় উজ্জ্বল মাহাতোর আরও একটি শিশুতোষ গ্রন্থ ‘গিদরাগিলাক কুড়মালি। পাশাপাশি তিনি বাংলার জাতীয় সংগীত কুড়মালি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এসব প্রকাশনা মাহাতো জাতিগোষ্ঠীকে জনসমক্ষে পরিচয় করিয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এতৎসত্ত্বেও পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়নের অভূতপূর্ব বিকাশ ও স্যাটেলাইটের প্রভাবে এই ভাষা-সংস্কৃতি আজ অনেকটাই হুমকির সম্মুখীন। বর্তমানে তাদের ভাষায় অসংখ্য বাংলা শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। একসময় মাহাতোদের মধ্যে শিক্ষার হার অপেক্ষাকৃত কম ছিল। তবে সামাজিকভাবে সচেতন হওয়ার কারণে বর্তমানে তারা শিক্ষাদীক্ষায় বেশ অগ্রসর হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে কুড়মালি পঠনপাঠন চললেও বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কুড়মালি ভাষায় শিক্ষাদানের সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি। ফলে এরা স্বকীয়তা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় সাধারণত তিন ধরনের পরিবর্তন ঘটছে: উচ্চারণগত, শব্দভান্ডারগত এবং অনেকেরই নিজস্ব লিপি না থাকায় লোকসাহিত্য সীমিত হয়ে যাওয়া। এ ছাড়া একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং স্যাটেলাইট সংস্কৃতির প্রভাবে দেশের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর অবস্থা বেশ নাজুক। ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছে, আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষিত মানুষ তাদের মাতৃভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ব্যবহার করবে। বর্তমান বাস্তবতায় ও ভবিষ্যতে বাংলা ভাষাও বিপদাপন্ন। সৌরভ সিকদার বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষা থাকা সত্ত্বেও এদের প্রায় সবাইকেই দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা শিখতে হয়। বলা হয় বিংশ শতাব্দীতে ভাষা তিন ধরনের আক্রমণের শিকার। প্রথমত, স্থানীয় বাঙালিদের উপভাষা দ্বারা; দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক ইংরেজি দ্বারা এবং তৃতীয়ত, আঞ্চলিক হিন্দি দ্বারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব নৃতাত্ত্বিক ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষায় তাদের নিজ নিজ ভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা দরকার। এ ছাড়া বাস্তবভিত্তিক ভাষানীতি প্রণয়ন প্রয়োজন যাতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের সংস্কৃতি ও ভাষার বিলুপ্তি না ঘটে। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, কোন দেশ কতটা সভ্য, তা বোঝার একটা পথ হলো সে দেশের সংখ্যালঘুদের অবস্থা জানা। সন্দেহ নেই গান্ধীর এই মাপকাঠিতে আমরা পুরোপুরি সভ্য জাতি কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মাহাতো জীবনধারায় এসেছে নানামুখী পরিবর্তন। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ তাদের কাছে আর নতুন কিছু নয়। মূলত সুখ-শান্তি এবং আরাম-আয়েশের জন্য তারা এগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। ফলে একসময়ের ঐতিহ্যবাহী মাহাতো ভাষা, সাহিত্য, শিল্পকলা ও নৃত্যশিল্প আজ অনেকটা হুমকির সম্মুখীন। এ ছাড়া আধুনিক ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলা মাহাতোদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অনেকটাই কোণঠাসা করে ফেলেছে। তারপরও আধুনিক সমাজজীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে মাহাতো ভাষা ও সংস্কৃতি আজও টিকে আছে। মায়ের ভাষার জন্য বাঙালি জাতি জীবন দিয়েছে, পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বিশ্বের সব মাতৃভাষা রক্ষায় স্থাপিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট দেশের প্রায় বিলুপ্ত অনেক ভাষাকে বাঁচানার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি এনসিটিবি-এর সহায়তায় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, এবং ওঁরাও শিশুদের নিজ মাতৃভাষায় প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে নীতিগত ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা প্রদান করেছে। তারপরও কুড়মালি ভাষার অবস্থা নাজুক। নতুন প্রজন্মের অনেক মাহাতো ছেলেমেয়েই কুড়মালি ভাষা জানে না, শেখে না। মা-বাবাও শেখায় না, হয়তো অনেক ঝামেলাপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন হবে বলে। যারা এই ভাষায় কথা বলে, তাদের বেশির ভাগের বয়স ২৫-৩০ বছরের ঊর্ধ্বে। আর শিক্ষিত পরিবারগুলো তো এই ভাষাকে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অস্পৃশ্য বানিয়ে ফেলেছে। যতটুকু টিকে আছে, তা বয়স্ক মানুষ, গরিব ও অনগ্রসর পরিবারগুলোর মাঝে। ফলে কুড়মালি ভাষা আজ বিলুপ্তপ্রায়।
বাংলাদেশ ভাষাবৈচিত্র্যে ভরা একটি দেশ। ভাষার দাবিতে রক্ত দেওয়া এই জাতিকে সব ভাষার সমান মর্যাদা দিয়ে ভাষাভাষীদের চর্চার সুযোগ করে দেওয়া কর্তব্য। দেশের সার্বিক উন্নতির জন্য যেকোনো জাতিগোষ্ঠীর ভাষা রক্ষা অতীব জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ভাষার অসামান্য গঠনের কারণে একটি গোষ্ঠী তৈরি হয় সেসব ব্যক্তিকে দিয়ে, যারা এভাবে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম। তাই ভাষা রক্ষা করতে না পারলে জাতির অস্তিত্ব টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এদিকে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ তাই নতুন করে শপথ নেওয়া দরকার মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার। সংগত কারণেই অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মতো মাহাতো জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা এখন সময়ের দাবি।
*লেখক: অধ্যাপক (সমাজবিজ্ঞান) ও অতিরিক্ত পরিচালক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খুলনা।