সার্টিফিকেট পোড়ানো আর জাতির ভবিষ্যৎ পোড়ানো কি একই কথা নয়

মুক্তা সুলতানা আইসিটি বিভাগের একটি প্রকল্পে চাকরি পেয়েছেন
ফাইল ছবি

একটি সার্টিফিকেট দেখতে এক পাতার একটি কাগজ মনে হলেও সেটা একজন শিক্ষার্থীর ১৫-১৬ বছরের অনেক সংগ্রামের অর্জন। একটি সার্টিফিকেটের সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর, একটি পরিবার, একটি সমাজ ও একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। তাই সার্টিফিকেট পোড়ানো আর জাতির ভবিষ্যৎ পোড়ানো একই কথা। বর্তমানে অনেক তরুণ–তরুণী তাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমলব্ধ সার্টিফিকেট প্রকাশ্য দিবালোকে আগুনে পোড়াচ্ছেন। এর পেছনে অনেক কারণ থাকলেও প্রথম ও প্রধান কারণ একটি অর্থাৎ সোনার হরিণ!

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এ সময়ে অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতিসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের সব ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ক্যারিয়ারের ধারণাও অনেক বিস্তৃত। উন্নত দেশে তরুণ–তরুণীরা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ক্যারিয়ার এবং উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে এসব দেশের তরুণ প্রজন্ম দ্রুততম সময়ে জনসম্পদে পরিণত হয়ে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে। ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় বাংলাদেশে। এখানে তরুণ প্রজন্ম হাতে গোনা কয়েকটি চাকরির পেছনে ছোটার কারণে নিজেরা হতাশ হচ্ছে এবং দেশে জ্যামিতিক হারে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।

বিশেষত, সরকারি চাকরির প্রতি আমাদের অত্যধিক আগ্রহ এক প্রকার সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। আর এ ব্যাধির একটি বড় লক্ষণ হচ্ছে ফেসবুক লাইভে এসে সার্টিফিকেট পোড়ানো, যা জাতির জন্য অশনিসংকেত। কেউ কেউ সহানুভূতি নিয়ে চাকরি পাওয়ার আশায় সার্টিফিকেট পোড়াচ্ছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভয়ংকর ট্রেন্ডে রূপ নিয়েছে।

এক অজানা ও অদ্ভুত যুক্তিতে আমরা বিশ্বাস করি চাকরির পরীক্ষাই জীবনের চূড়ান্ত পরীক্ষা। তাই এ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়া মানে জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া! সে জন্যই তরুণ প্রজন্ম দীর্ঘ সাধনার স্বীকৃতি সার্টিফিকেট পোড়াতেও দ্বিধা করে না। আমাদের বুঝতে হবে, যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, সবার দ্বারা সরকারি চাকরি পাওয়া সম্ভব নয়। কারণটা খুবই সহজ। একটি সরকারি চাকরি পরীক্ষায় দু–তিন হাজার আসনের বিপরীতে লড়াই করে প্রায় কয়েক লাখ প্রার্থী। এটা স্বাভাবিক যে এখানে সবাই তুখোড়, মেধাবী ও পরিশ্রমী হলেও দু–তিন হাজার বাদে বাকি প্রার্থীরা ওই সরকারি চাকরিটা পাবেন না। এর মানে এই নয় যে ওই হাজার হাজার প্রার্থী অযোগ্য এবং তাঁদের মধ্যে কোনো সম্ভাবনা নেই। এই সহজ হিসাবটা চাকরিপ্রার্থীরা বুঝলেও আমাদের পরিবার ও সমাজ কখনো বোঝার চেষ্টা করে না। যখন কিছু উদ্যমী তরুণ স্রোতে গা না ভাসিয়ে চাকরির পরিবর্তে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন, আমাদের সমাজ তখন হতাশার জল ছিটিয়ে তাঁদের এগিয়ে চলার পথকে রুদ্ধ করে দেয়।

ধরুন, স্নাতক শেষ করা একটি ছেলের বিজনেস আইডিয়া চমৎকার এবং সে ছোট্ট একটি বিজনেস শুরু করেছে। কিন্তু আমরা তাকে বিজনেসে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে তাকে বাধ্য করি চাকরিতে যেতে। আমরা যদি তাকে উৎসাহ দিতাম, তাহলে সে একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্রুপ অব কোম্পানির একটির মালিক হতো। আর এ জন্যই হয়তো আমাদের দেশে বিল গেটস, জ্যাক মা কিংবা ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তির জন্ম হয় না। অথচ আমরা এখন স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হচ্ছি। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে এবং তরুণ প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আমাদের উচিত স্মার্ট ক্যারিয়ারের প্রতি জোর দেওয়া। কেননা স্মার্ট ক্যারিয়ারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন প্রজন্মের প্রতিভার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বেকারত্ব নির্মূল করা এবং দেশের অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব জোয়ার আনা। স্মার্ট ক্যারিয়ার কেমন হবে, সেটার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নিজের প্রতিভা কাজে লাগিয়ে ভিন্নতা, সৃজনশীলতা ও সততার মাধ্যমে সম্পন্ন যেকোনো উপার্জন মাধ্যমই স্মার্ট ক্যারিয়ার। যেমন অনেক তরুণ হাস-মুরগি কিংবা গরুর খামার করে কোটিপতি হয়েছে। আবার অনেক তরুণী ফ্রিল্যান্সিং করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। এ রকম ব্যতিক্রমী ক্যারিয়ারের জন্য চাই আত্মবিশ্বাস এবং পরিবার ও সমাজের উৎসাহ।

আরও পড়ুন

এখানে আরও দুটি কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। প্রথমত, বেশির ভাগ তরুণ অর্থসংকটের কারণে প্রতিভা ও ইচ্ছে থাকা  সৃজনশীল কিছু করার জন্য এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায় না। দ্বিতীয়ত, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার সঙ্গে ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় সদ্য স্নাতক শেষ করা শিক্ষার্থীরা  হতাশায় ভেঙে যায়। একটা বিষয় আমাদের নিঃসন্দেহে মানতে হবে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা এখনো আন্তর্জাতিক মানের হয়নি। সে জন্য বেশির ভাগ শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে গিয়ে হোঁচট খায়। কেননা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা আন্তর্জাতিক মানের না হলেও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এবং করপোরেট সেক্টরে জব করতে আমাদের ঠিকই আন্তর্জাতিক মানের হতে হয়। এ জন্যই বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা অনেক শিক্ষার্থীও বাধ্য হয়ে সরকারি চাকরির জন্য রাত জেগে বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করে। এখানে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী স্মার্ট ক্যারিয়ারের আশায় বিদেশে পাড়ি জমায়, যাকে সহজ কথায় মেধা পাচার বলে। মেধা পাচারকে আমি জাতির ভবিষ্যৎ পাচার বলি। কারণ, একটি দেশের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্ভর করে ওই দেশের তরুণ প্রজন্মের প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও মেধার ওপর। আর আমাদের সেই প্রতিভা চলে যাচ্ছে বিদেশে! এমতাবস্থায় সর্বপ্রথম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হবে যদি সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যৌথভাবে স্নাতক পর্যায়েই তাদেরকে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার উপযোগী করে তৈরি করে। সেটা হতে পারে একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে কম্পিউটার স্কিল, কমিউনিকেশন হ্যাকস, টিম ওয়ার্ক, লিডারশিপ, ইউনিক আইডিয়া জেনারেট, প্রবলেম সলভিং অ্যান্ড ইনস্ট্যান্ট ডিসিশন মেকিং এবং ফিল্ড ওয়ার্কসহ ক্যারিয়ারভিত্তিক বাস্তবিক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথকে সুগম করার জন্য।

*লেখক: মুহম্মদ সজীব প্রধান, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ