ডায়েরির ২৭ নম্বর পাতা
সেদিন ভোরবেলায় বারান্দায় বসে গরম চায়ের কাপে ফুঁ দিতে দিতে বারান্দার পাশে রাখা আমার ছোট্ট বইয়ের আলমারিটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
হঠাৎ ও এসে বলল,
—আচ্ছা, তোমার কি সেদিনের কথা মনে আছে? আমরা পার্কে একসঙ্গে বসে বাদাম খেতে খেতে ওই যে ওই বেগুনি রঙের মলাটের বইটা তুমি আমাকে পড়ে শুনিয়েছিলে। কী দারুণ ছিল, বলো! তুমি আসলেই বড্ড বোকা ছিলে, তা না হলে বাড়িতেই কিন্তু পড়ে শোনাতে পারতে। কী দরকার ছিল পার্কে জোর করে টেনে নিয়ে গিয়ে বই পড়ে শোনানোর?
তবে যাই হোক, বইটা কিন্তু দারুণ ছিল!
আচ্ছা, তোমার কি মনে আছে, ওই যে পার্কের পাশের একটা কাঠগোলাপগাছ থেকে তুমি একটা কাঠগোলাপ পেড়ে আমার খোঁপায় গুঁজে দিয়েছিলে?
জানো, আজও সেই কাঠগোলাপটা আমার ডায়েরির ২৭ নম্বর পাতায় যত্ন করে রাখা আছে।
জানো, সেদিন তোমার সঙ্গে যে নীল শাড়িটা পরে পার্কে গিয়েছিলাম, সেই শাড়ির আঁচলের একটা অংশ কেটে আমি আমার ডায়েরির ২৭ নম্বর পাতায় রেখে দিয়েছিলাম।
আমি জানি, প্রতিদিন ডায়েরিতে লেখার অভ্যাস তোমার। তাই একবার হলেও ডায়েরিটা তুমি প্রতিদিন খুলবেই। আর খুললে যেন এই আঁচলের অংশটা দেখে আমার প্রেমে আবার নতুন করে পড়ো তুমি।
হা হা হা! কী পাগলি ছিলাম, বলো! এগুলো কী পাগলামিই না করতাম আমি!
এ বাবা! দেখেছো, তোমার সঙ্গে গল্প করতে করতে ভুলেই গেছি রান্নাঘরের উনুনে দুধ জ্বাল দিয়ে রেখে এসেছি। আমার পাতিলের দুধটা বোধ হয় গেল পুড়ে! আমি যাই, তুমি বসে তোমার বইয়ের আলমারি দেখো।
হঠাৎ কিসের যেন একটা আওয়াজ হলো!
একটু হন্তদন্ত হয়ে বসা থেকে উঠে চশমাটা চোখে দিয়ে দেখি, পাশে টেবিলের ওপর রাখা একটা ফুলদানি আমাদের বাড়ির পোষা বেড়ালটা ফেলে দিয়েছে।
তারপর আমি আমার স্ত্রীকে ডাকতে ডাকতে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যাই—
—কই গো, এই যে শুনছো? তোমার টমি তোমার ফুলদানিটা ভেঙে দিয়েছে!
রান্নাঘরে ঢুকতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল—আমার ‘ও’ তো রান্নাঘরে নেই!
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
তারপর চুপচাপ চশমার কাচটা নিজের পরনের ফতুয়ার এক কোনা দিয়ে মুছে, হাতের লাঠিটা শক্ত করে ধরে পা টিপে টিপে আবার বারান্দায় আমার বইয়ের আলমারিটার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
আলমারিটাতে ধুলো পড়ে গিয়েছিল। একটু ফুঁ দিয়ে ময়লা সরিয়ে আলমারির ভেতর থেকে সেই ডায়েরিটা বের করলাম।
তারপর সেই ২৭ নম্বর পাতাটা খুলে শুকনো কাঠগোলাপ আর সেই নীল রঙের শাড়ির আঁচলটুকু দেখে হঠাৎ চোখের কোণে একফোঁটা জল চলে এল।
ডায়েরির ২৭ নম্বর পাতার শেষ লাইনটি ছিল—
❝এই যে, শুনছো? আমাকে মনে পড়ল?❞
আজ আমার বয়স ৭৭ বছর।
হ্যাঁ, সত্যি। আজ এই বুড়োটার আবার তার সেই ২৬ বছর বয়সী পাগলি বউটার কথা মনে পড়েছে অনেক বেশি করে।
আমার স্ত্রীর আজ ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী।
লেখক: বাঁধন মৈত্র, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি, (ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস)