সঞ্চয়ের অর্থনীতি

টাকা শুধু ব্যাংকে পড়ে থাকলে সেটা বাড়ে না, বরং সময়ের সঙ্গে তার ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকেছবি: পেক্সেলস, গ্রাফিকস: প্রথম আলো

১.

অর্থনীতিতে সঞ্চয় হলো বিনিয়োগের প্রধান উৎস। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঞ্চিত অর্থই বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিনিয়োগে রূপান্তরিত হয়। উচ্চ সঞ্চয় উচ্চতর স্তরের বিনিয়োগের অর্থায়ন করতে এবং দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

মানুষ যখন বেশি সঞ্চয় করেন, তখন ব্যাংকগুলো বিনিয়োগের জন্য ফার্মগুলোকে আরও ঋণ দিতে সক্ষম হয়। অর্থনীতিতে সঞ্চয় যখন খুব কম হয়, তখন বুঝতে হবে সেই অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের তুলনায় স্বল্পমেয়াদি খরচ বেছে নিচ্ছে।

অর্থনীতির একটি মডেল হচ্ছে ‘হ্যারল্ড ডোমার মডেল’। এই মডেলের মতে, সঞ্চয়ের স্তরটি হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণের মূলমন্ত্র। হ্যারল্ড ডোমার মডেলের মূল অনুমান হচ্ছে অনেকটা এমন— সঞ্চয় বাড়ছে মানে বিনিয়োগ বাড়ছে, ফলে মূলধনও বাড়ছে। এতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, মানুষের হাতে অর্থ আসছে এবং এতে আবার সঞ্চয়ও বাড়ছে। মডেলটি এটিও বলে যে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য সঞ্চয় বেশ ভালো হলেও স্বল্প সময়ের মধ্যে খুব বেশি সঞ্চয় প্রবণতায় মন্দার আশঙ্কা থাকে।

২.

অর্থনীতিতে সঞ্চয়ের হারকে বহুলাংশে প্রভাবিত করে সুদ এবং একটি সুদৃঢ় ব্যাংকিং ব্যবস্থা। সেটা বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে অর্থনীতিতে সুদ আসলে কী?

ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনীতিতে সুদ আসলে ভোগবঞ্চনার পুরস্কার। অর্থনীতিতে যে অর্থ সাধারণত ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়, তার মূল্যই হচ্ছে সুদ। কেউ যখন তাঁর মূলধন অন্যকে ধার দেন, তিনি তাঁর সেই মূলধনের বর্তমান ভোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেন। এ ভোগবঞ্চনার মূল্য হচ্ছে সুদ। আবার কেউ যদি তাঁর মূলধন অন্য কাউকে ধার না দিয়ে নগদ ঘরে ফেলে রাখেন, তবে তিনি তাঁর মূল্য বা সুদ থেকে বঞ্চিত হন।

ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদেরা সুদকে ভোগবঞ্চনার পুরস্কার হিসেবে ধরলেও অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেছেন। কেইনসের মতে, মানুষের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য নগদ টাকা ঘরে রেখে দেওয়ার সহজাত প্রবণতাকে পরিবর্তন করার জন্যই সুদ দেওয়া প্রয়োজন।

কারণ, নগদ অর্থ ব্যবহারহীনভাবে ফেলে রাখলে সেটা দিয়ে কোনো প্রকৃত সম্পদ সৃষ্টি হয় না। সেটি তখন অর্থনীতিতে রাখতে পারে না কোনো অবদান। আর তাই সুদ দিয়ে বিকল্প বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা থেকে নিশ্চিত আয় সম্পর্কে পূর্বনিশ্চয়তা পরিমাপ করে দেওয়া যায়, যার ফলে অলস অর্থকে বিনিয়োগের ধারায় প্রবাহিত করা যায়। তিনি মনে করেন, নগদ অর্থ ধার তথা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার পুরস্কার তথা সুদের হার নির্ভর করে দুই ধরনের অবস্থার ওপর। এর একটি হচ্ছে বাজারে আবর্তিত অর্থের পরিমাণ, যা নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ বাজার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ।

আরেকটি হচ্ছে সাধারণ মানুষ কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থ ধরে রাখার প্রবণতা। নগদ অর্থ ধরে রাখার বিষয়টি অবাস্তব মনে হলেও কেইনস তা মনে করেছিলেন, কারণ, নগদ টাকা ধরে রাখার বিকল্প যে দুটি পন্থা আছে, সেগুলো থেকে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা ও হাতছানি থাকলেও তার মধ্যে আছে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও লোকসানের ঝুঁকি।

কেইনস এই রকম ধারণার পেছনে সম্ভবত এই কারণ ছিল যে তখনকার যুগে ব্যাংক ব্যবস্থা এখনকার মতো ততটা সুলভ ছিল না। সুদৃঢ় ছিল না ব্যাংকগুলোর ভিত্তি, ছিল না বিস্তৃত ব্যাংক পরিষেবা আর বিচিত্র ও বিভিন্নমুখী ব্যাংকিং সুবিধা।

কিন্তু এখনকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিস্তৃত হওয়ায় এবং নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকাংশে নিশ্চিত করার কারণে মানুষের উদ্বৃত্ত অর্থ একদিকে যেমন সঞ্চয় খাতে এসে যোগ হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিনিয়োগের ধারায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা, স্থিতিশীল সুদের হার এবং জনগণের আর্থিক আস্থা সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে। ফলে সঞ্চয় কেবল ব্যক্তির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে না, বরং জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভিত্তিও গড়ে তোলে।

কেইনসের ‘প্যারাডক্স অব থ্রিফট’–এর মতে, সবাই একসঙ্গে সঞ্চয় বাড়ালে চাহিদা কমে মন্দা আসতে পারে। বাংলাদেশের জাতীয় সঞ্চয় হার ২০২৪-এ জিডিপির ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ আন্তর্জাতিক গড়ের চেয়ে বেশি, তবে মূল্যস্ফীতি প্রকৃত সঞ্চয় ক্ষমতা কমাচ্ছে। তাই সঞ্চয়-ভোগের ভারসাম্য ও দক্ষ বিনিয়োগ জরুরি।

৩.

যদিও কেইনস আপাতদৃষ্টে সঞ্চয়কে উৎসাহিত করেছেন, তবে অর্থনৈতিক মন্দার সময় অতিরিক্ত সঞ্চয়ের প্রবণতাকে তিনি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করতেন। তিনি মনে করেন, সঞ্চয় মানেই হচ্ছে ব্যয়সংকোচ, ব্যয়সংকোচ মানে পণ্য বিক্রি না হওয়া। পণ্য বিক্রি না হওয়া মানে কারখানা বন্ধ হওয়া এবং বেকারত্ব ও মন্দা। আর তাই অর্থনীতিতে তিনি ‘প্যারাডক্স অব থ্রিফট’ নামক থিওরিটির প্রবক্তা।

এই ‘প্যারাডক্স অব থ্রিফট’ থিওরিটা ১৭১৮ সালে বার্নাড ম্যান্ডেভিল (Barnard Mandeville) তাঁর বই ‘The Fables of Bees’–এ প্রথম উল্লেখ করেন। তবে থিওরিটি জনপ্রিয় করে তোলেন কেইনস। তিনি ১৯৩০ সালে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন সঞ্চয়ের জন্য মিতব্যয়ী হওয়ার জটিলতা। তার এই থিওরি খুব সংক্ষেপে একটা উদাহরণ দিয়ে কিছুটা বোঝার চেষ্টা করি।

ধরেন, দেশে বেশ অর্থনৈতিক সংকট চলছে। হাসান মিয়া ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্যয় কমিয়ে দিলেন। হাসানের কয়েকজন বন্ধুও একই রকম ভাবলেন। তেমনি করে ওই কয়েকজন বন্ধুর প্রত্যেকের আরও কয়েকজন করে বন্ধু একই রকম ভাবলেন। এভাবে একটি পুরো অর্থনীতির সবাই যদি ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয় করতে থাকেন, তাহলে এ ধাক্কায় বাজারে মোট চাহিদা কমে যায়, ফলে বাজারে টাকা ঘোরে না এবং শেষমেশ সবারই আয় কমে যায় এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মন্দায় পড়ে অর্থনীতি।

আবারও আরেকটি উদাহরণ দিই। একদম সহজভাবে বোঝানোর জন্য ধরে নিলাম একটা দেশের সব মানুষেরই ইনকাম ১৫,০০০ টাকা। এর মধ্যে ১০,০০০ টাকা থাকে ভোগের জন্য, বাকি টাকা সবাই সঞ্চয় করেন। আর যেই ১০,০০০ টাকা দিয়ে মানুষ নিজের প্রয়োজন মেটান, সেগুলোই বিভিন্নভাবে হাত বদলের মাধ্যমে কাজে লাগানো হয়। ওই টাকা দিয়েই সরকারের ট্যাক্সের টাকা আসে, বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়, বিনিয়োগ হয়, নানা রকম পণ্যের চাহিদা মিটে ইত্যাদি।

কিন্তু এমন হলো যে সবাই নিজ নিজ ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ভাবলেন যে এখন থেকে আরও বেশি সঞ্চয় করবেন। তাই সবাই ৭০০০ টাকা সঞ্চয় করতে শুরু করলেন এবং ৮০০০ টাকা ভোগের জন্য রাখলেন। এ ক্ষেত্রে সামগ্রিক সঞ্চয় বেড়ে যাবে, কিন্তু যেহেতু ভোগ কমে গেছে, তাই চাহিদাও কমে যাবে। এভাবে সবার চাহিদা কমে গেলে সামগ্রিক চাহিদা কমবে।

আর চাহিদা কমানোর ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যাবে। আবার ব্যবসায় যদি লস হয়, তাহলে কর্মচারীদের ন্যায্য মজুরি দেওয়া যাবে না, ফলে ছাঁটাই করতে হবে। এর ফলে বেকারত্ব দেখা দিবে। বিনিয়োগ তো কমবেই। বলতে গেলে পুরো দেশের মোট উৎপাদন কমে যাবে। আয়ও কমে যাবে। আর আয় কমে গেলে পরবর্তী সময় আমরা যে অধিক সঞ্চয় করতে চাই, সেটাও আর সম্ভব হবে না।

এভাবে একটি পুরো অর্থনীতির সবাই যদি ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয় করতে থাকেন, তাহলে এ ধাক্কায় বাজারে মোট চাহিদা কমে যায়, ফলে বাজারে টাকা ঘোরে না এবং শেষমেশ সবারই আয় কমে যায় এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মন্দায় পড়ে অর্থনীতি।

৪.

মানুষ কেন সঞ্চয় করেন? আবার কেন কখনো সঞ্চয়ের বদলে বর্তমান ভোগের দিকে ঝুঁকে পড়েন? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত অভ্যাস কিংবা মানুষের চরিত্রের মধ্যে খুঁজলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে মুদ্রার প্রতি আস্থা, মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত সুদের হার এবং মানুষের ভোগবাসনা।

মানুষ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেন মূলত ভবিষ্যৎ ভোগের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য। তাই সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু আজ কত টাকা জমালাম তা নয়, বরং কয়েক বছর পর সেই টাকা দিয়ে কতটা পণ্য ও সেবা কেনা যাবে।

অর্থাৎ মানুষ শুধু টাকার অঙ্ক দেখে সঞ্চয় করেন না। তিনি দেখেন সেই টাকার ভবিষ্যৎ ক্রয়ক্ষমতা। আর এখানেই মুদ্রার প্রতি আস্থার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

যে মুদ্রা ভবিষ্যতেও তার ক্রয়ক্ষমতা মোটামুটি ধরে রাখবে, মানুষ সেই মুদ্রায় সঞ্চয় করতে তুলনামূলক বেশি আগ্রহী হতে পারেন। বিপরীতে যখন মানুষ মনে করেন আজকের সঞ্চিত টাকা দিয়ে কয়েক বছর পর উল্লেখযোগ্যভাবে কম পণ্য ও সেবা কিনতে পারবেন, তখন টাকায় সঞ্চয়ের আকর্ষণ কমে যেতে পারে।

ধরা যাক, ব্যাংকে আজ ১০০ টাকা রেখে ১ বছর পর ১১০ টাকা পাওয়া গেল। কিন্তু একই সময়ে পণ্যের দাম ১২ শতাংশ বেড়ে গেলে ১১০ টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আজকের প্রায় ৯৮ দশমিক ২১ টাকার সমান। অর্থাৎ নমিনাল সম্পদ বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

এখানে স্বর্ণমান (gold standard)–এর ঐতিহাসিক ধারণাটিও প্রাসঙ্গিক। স্বর্ণের মতো সীমিত সরবরাহের একটি সম্পদের সঙ্গে মুদ্রার মূল্যকে যুক্ত করার পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুদ্রার সরবরাহ ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা তৈরি করা।

যদিও গোল্ড-ব্যাকড (gold-backed money) নিজেই সব সমস্যার সমাধান নয়। কারণ, স্বর্ণের সঙ্গে মুদ্রার সম্পর্ক থাকলেই মুদ্রার মূল্য সব সময় স্থিতিশীল থাকবে, ইতিহাস এমন নিশ্চয়তা দেয় না। এদিকে আবার গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের সীমাবদ্ধতা আছে।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সুইজারল্যান্ডে সঞ্চয়ের স্পৃহা সবচেয়ে বেশি এবং ভোগবাসনা বা টাইম প্রেফারেন্স সবচেয়ে কম, কারণ, এই দেশে দীর্ঘদিন ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত, স্বর্ণ রিজার্ভ রেখে মুদ্রা ছাপানো হতো। খাঁটি স্বর্ণে তৈরি মুদ্রা বা রিজার্ভের বিপরীতে ছাপানো টাকা উত্তম মুদ্রা এবং এর ক্রয়ক্ষমতা বেশি। টাকার ক্রয়ক্ষমতা যখন কমে যায় কিংবা মানুষ যখন ভাবেন যে তাঁর দেশ ও সমাজের টাকা ‘উত্তম মুদ্রা’ নয়, তখন মানুষের সঞ্চয়ের ইচ্ছা কমে যায়।

সুইজারল্যান্ড দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং মুদ্রার প্রতি তুলনামূলক উচ্চ আস্থার জন্য পরিচিত। দেশটির ঐতিহাসিক আর্থিক ব্যবস্থায় স্বর্ণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এবং ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত সুইস ফ্রাঙ্কের gold convertibility বজায় ছিল।

কিন্তু সুইসদের সঞ্চয়প্রবণতাকে শুধু gold reserve বা অতীতের gold-backed monetary system দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। সঞ্চয়ের স্পৃহাকে আরও অনেক বিষয় ও প্রভাবিত করতে পারে।

আয়, সামাজিক নিরাপত্তা, সুদের হার, করব্যবস্থা, জনমিতি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গৃহস্থালির সম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা এসব কিছু মিলেই একটি দেশের সঞ্চয়ের আচরণ তৈরি হয়। অর্থাৎ sound money একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হতে পারে, কিন্তু একমাত্র নিয়ামক নয়।

একইভাবে, পশ্চিমা অর্থনীতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভোগের ব্যাপক বিস্তারকেও শুধু ‘মানুষ সঞ্চয় করতে চায় না’ বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আয় বৃদ্ধি, গণ-উৎপাদন, ভোক্তা ঋণ, বিজ্ঞাপন, নগরায়ণ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পরিবর্তিত জীবনযাপন, সবকিছু মিলে ভোগের সুযোগ ও আকর্ষণ বাড়িয়েছে।

তবে monetary incentive-এর জায়গাটি অস্বীকার করার উপায় নেই। ধরা যাক, ব্যাংক আমানতে আপনি ১০ শতাংশ নমিনাল ইন্টারেস্ট পেলেন। শুনতে ভালো লাগছে, কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি যদি ১২ শতাংশ হয়, তাহলে আপনার আমানতের টাকার অঙ্ক বাড়লেও তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

আজ ১০০ টাকা রেখে ১ বছর পর ১১০ টাকা পাওয়া গেল। কিন্তু একই সময়ে পণ্যের দাম ১২ শতাংশ বেড়ে গেলে ১১০ টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আজকের প্রায় ৯৮ দশমিক ২১ টাকার সমান। অর্থাৎ নমিনাল সম্পদ বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

এখানেই মানুষের আচরণ বদলাতে শুরু করতে পারে। একজন আমানতকারী যদি ধারাবাহিকভাবে অনুভব করেন, ‘আমি সঞ্চয় করছি, কিন্তু সঞ্চয় করেই প্রকৃতপক্ষে ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছি, তাহলে তিনি বর্তমান ভোগ বাড়াতে পারেন অথবা টাকার পরিবর্তে এমন সম্পদ খুঁজতে পারেন, যা মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে ভালো সুরক্ষা দিতে পারে, যেমন জমি, স্বর্ণ, শেয়ার, ব্যবসা বা অন্যান্য প্রকৃত সম্পদ।

পাশ্চাত্যের সঙ্গে আমাদের আরেকটা পার্থক্য রয়েছে। অনেক এশীয় সমাজে ঐতিহাসিকভাবে precautionary saving (সতর্কতামূলক সঞ্চয়)-এর প্রবণতা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। পরিবারকেন্দ্রিক অর্থনীতি, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এবং সীমিত সামাজিক নিরাপত্তা এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে, উন্নত পশ্চিমা অর্থনীতিতে শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বলয় এবং সহজলভ্য কনজ্যুমার ক্রেডিট, গৃহস্থালি সঞ্চয় ও ভোগের ভারসাম্যকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে।

আসলে সঞ্চয়ের আচরণ হলো সংস্কৃতি, আয়, প্রতিষ্ঠান, প্রত্যাশিত মূল্যস্ফীতি, সুদহার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং monetary credibility—সবকিছুর সম্মিলিত ফল।

৫.

বাংলাদেশে সঞ্চয়ের অবস্থা কেমন? দেশের মানুষ কতটা সঞ্চয় করছেন এবং সেই সঞ্চয় কতটা বিনিয়োগে রূপান্তরিত হচ্ছে? আসুন এই বিষয়ে এখন একটু আলোকপাত করি।

অর্থনীতিবিদেরা সাধারণত একটি দেশের সঞ্চয় প্রবণতা পরিমাপ করেন জাতীয় সঞ্চয় হার (Gross National Savings as a Percentage of GDP) দিয়ে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মোট জাতীয় সঞ্চয় ছিল জিডিপির প্রায় ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এক দশক আগে, ২০১২ সালে বাংলাদেশের সঞ্চয়ের হার প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা ছিল সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ স্তর। তবে এর পর থেকে সঞ্চয় হারে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

তবে আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো তুলনামূলকভাবে ভালো। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের সঞ্চয় হার ছিল প্রায় ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় ছিল প্রায় ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ আয় থেকে বেশি অংশ সঞ্চয় করে থাকে।

অর্থনীতিতে জাতীয় সঞ্চয় হার (Gross Savings Rate) একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এটি দেখায়, একটি দেশ তার মোট জাতীয় আয়ের কত অংশ বর্তমান ভোগে ব্যয় না করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করছে। একইভাবে বিনিয়োগ হার (Gross Capital Formation) নির্দেশ করে অর্থনীতিতে কতটুকু নতুন মূলধন সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশের গত ১৫ বছরের সঞ্চয় হার, বিনিয়োগ হার এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়:

প্রথমত, বাংলাদেশে সঞ্চয়ের হার দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে উচ্চ। ২০১২ সালে জাতীয় সঞ্চয় হার জিডিপির ৪০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে পরবর্তী সময়ে এই হার কিছুটা কমে ২০২৪ সালে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ হার ও সময় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সালে যেখানে বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২৬ দশমিক ২ শতাংশ, সেখানে ২০১৯ সালে তা ৩২ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়। এটি বাংলাদেশের শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

তৃতীয়ত, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির একটি ইতিবাচক সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ৭ থেকে ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সময়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধির পেছনে দেশি সঞ্চয়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং জনমিতিক সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি নতুন বাস্তবতা সামনে এসেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত সঞ্চয় ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যখন খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন ও চিকিৎসার ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তখন পরিবারের আয়ের বড় অংশ প্রয়োজনীয় ব্যয়ে চলে যায়। ফলে সঞ্চয়ের জন্য উদ্বৃত্ত অর্থ কমে যায়।

বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পরিবারের সঞ্চয়নির্ভর অর্থনীতি। জাতীয় সঞ্চয়ের সবচেয়ে বড় অংশ আসে পরিবার খাত থেকে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রবাসী আয়ের পরিবার এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে দেশের সঞ্চয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

এবার আসুন আমরা দেখি, এই সঞ্চয় কোথায় যাচ্ছে? এর একটি অংশ ব্যাংক আমানতে জমা হচ্ছে, একটি অংশ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হচ্ছে, আবার উল্লেখযোগ্য অংশ জমি, ফ্ল্যাট, স্বর্ণ বা অন্যান্য সম্পদে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এটি একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবণতা।

তবে অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে কার্যকর সঞ্চয় হলো সেই সঞ্চয়, যা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়। কারণ, সেই অর্থ নতুন কারখানা, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস বলছে, দেশি সঞ্চয়ই দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঞ্চয়ের হারকে স্থিতিশীল রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সঞ্চিত অর্থকে আরও দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে প্রবাহিত করা। কারণ, অর্থনীতির ভাষায়, সঞ্চিত অর্থ তখনই প্রকৃত সম্পদে পরিণত হয়, যখন তা নতুন উৎপাদন, নতুন কর্মসংস্থান এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার জন্ম দেয়।

আরও পড়ুন

৬.

সঞ্চয় অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য, কারণ, সঞ্চয় থেকেই বিনিয়োগের মূলধনের সৃষ্টি এবং সেই বিনিয়োগ উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সঞ্চয় যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একটি কার্যকর ও আস্থাশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যা সঞ্চিত অর্থকে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করতে পারে।

একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা, আর্থিক খাতে সুশাসন, জনগণের আস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দেশের মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয় আরও কার্যকরভাবে শিল্প, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হবে। এর ফলেই বাড়বে উৎপাদনশীলতা, সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতি হবে আরও শক্তিশালী ও টেকসই।

তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে সঞ্চয় কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির মূলধন। এই মূলধনকে দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করতে পারাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, আবার একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাও। কারণ, অর্থনীতির মৌলিক শিক্ষা একটাই—সঞ্চয় সমৃদ্ধির সম্ভাবনা সৃষ্টি করে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয় উৎপাদনশীল বিনিয়োগ।

তবে সঞ্চয়ের একটি সীমা ও ভারসাম্য রয়েছে। ব্যক্তিপর্যায়ে অধিক সঞ্চয় বিচক্ষণতার পরিচায়ক হলেও সামষ্টিক অর্থনীতিতে যদি সবাই একই সময়ে ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয় বাড়ানোর চেষ্টা করে, তাহলে মোট চাহিদা হ্রাস পায়। এর ফলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে এবং অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হতে পারে। কেইনসের ‘প্যারাডক্স অব থ্রিফট’ তত্ত্ব আমাদের সেই বাস্তবতাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

অতএব, একটি সুস্থ অর্থনীতির জন্য সঞ্চয় ও ভোগ—উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সঠিক মাত্রার সঞ্চয় যেমন ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তেমনি প্রয়োজনীয় ভোগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখে। এই দুইয়ের সমন্বয়ই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলে।

*লেখক: ব্যাংকার