ইরানের ‘ইকোনমিক ডি-ডে’, নাকি ডলারের ‘স্ট্রেস টেস্ট’
যুক্তরাষ্ট্র ডলারকে যত বেশি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে, অন্যান্য দেশ তত বেশি ডলার–নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প মুদ্রা ও আর্থিক লেনদেনব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহিত হবে। ফলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার লড়াইয়ের প্রভাব নির্দিষ্ট একটি দেশের অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ছে। ২৪ আগস্ট ‘ইকোনমিক ডি–ডে’ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এখন শুধু একটি দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের নীতি নয়, বরং এটি ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রভাব এবং স্থায়িত্বেরও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। মার্কিন ট্রেজারির সাম্প্রতিক পদক্ষেপে ইরানের তেল, শিপিং, অর্থ স্থানান্তর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্য দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সতর্ক করা হয়েছে যে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করলে তারাও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন শুধু ইরানের আয় কমাতে নয়; বরং নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বাড়িয়ে অন্যান্য দেশের প্রতিষ্ঠানকে ইরান থেকে দূরে রাখতে চাইছে।
সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন ঝুঁকিতে ফেলতে চাইছে, যেখানে ইরানের সঙ্গে ব্যবসায় লাভের চেয়ে মার্কিন বাজার হারানোর ক্ষতি বেশি। এখানেই ইরানের জন্য ইকোনমিক ডি–ডের গুরুত্ব। ইকোনমিক ডি-ডে বলতে এমন একটি পর্যায়কে বোঝায়, যখন নিষেধাজ্ঞার চাপ ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা, তেল-রাজস্ব, মুদ্রার বিনিময় হার ও আমদানি সক্ষমতাকে একই সঙ্গে আঘাত করতে শুরু করে। কারণ, ইরানের অর্থনীতি ইতিমধ্যে বড় ধরনের সংকটে রয়েছে। আইএমএফ ২০২৬ সালে দেশটির মূল্যস্ফীতি ৬৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং প্রকৃত জিডিপি ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। এই অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমে গেলে সংকটের প্রভাব কেবল সরকারের রাজস্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমদানির খরচ বাড়বে, মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে, উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও কমবে।
তবে নিষেধাজ্ঞা মানেই ইরানের তেল বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; বরং মূল লড়াই হলো, ইরান তার তেল বিক্রি করে কতটা অর্থ নিজের হাতে রাখতে পারছে। নিষেধাজ্ঞার চাপে কম দামে তেল বিক্রি, পরিবহন ও বিমায় বাড়তি খরচ কিংবা অর্থ দেশে আনতে বিকল্প পথ ব্যবহারের কারণে একই পরিমাণ তেল বিক্রি করেও ইরানের আয় কমে যেতে পারে। এতে রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে যাবে এবং আমদানি ও সরকারি ব্যয় পরিচালনার সক্ষমতাও সংকুচিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য চ্যালেঞ্জ, ডলারের জোর ও বিকল্প মুদ্রার গুরুত্ব আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে এখানে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো দেশের অর্থনীতিকে যত বেশি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, সেই দেশ তত বেশি বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয়। ইরান বহু বছর ধরে সেই পথ খুঁজছে। চীন তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইরানের তেলের বড় ক্রেতা চীন। মার্কিন চাপ সত্ত্বেও চীনে ইরানি তেলের প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। রয়টার্সের মতে, আগস্ট মাসে চীনে ইরানি তেলের প্রবাহ জুলাইয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে। এখানে আসল প্রশ্ন শুধু চীন ইরানের তেল কিনছে কি না নয়; বরং চীনের মতো বড় অর্থনীতি কতটা মার্কিন বি সেকেন্ডারি স্যাঙ্কশনসের ঝুঁকি মেনে নিতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একটি কঠিন অর্থনৈতিক হিসাবও আছে। ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো তুলনামূলক সহজ কিন্তু কিন্তু চীনের বড় ব্যাংক-প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনলে এর প্রভাব ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তখন সেটি বিশ্বের দুই বড় অর্থনীতির সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ওয়াশিংটনকে প্রতিটি নতুন নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে একটি প্রশ্ন বিবেচনা করতে হয় ইরানের ওপর বাড়তি চাপ থেকে যে লাভ হবে, তার তুলনায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আর্থিক বাজারে সম্ভাব্য ক্ষতি কতটা? এ কারণেই ইরানের সংকটকে ডলারের সংকট বলা যেমন ভুল, তেমনি এটিকে শুধু ইরানের সমস্যা বলাও অসম্পূর্ণ। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৫৭ দশমিক ১৩ শতাংশ ডলারে ছিল; অর্থাৎ ডলারের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক শক্তি তাই বাস্তব এবং অত্যন্ত গভীর। কিন্তু ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আসল প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। বিশ্ববাণিজ্য ডলার ছাড়বে কি না, এটি এখনো বড় প্রশ্ন নয়; বরং বিশ্ব ডলারের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে শুরু করবে কি না, সেটি প্রশ্ন।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
কোনো দেশ তার বৈদেশিক বাণিজ্যের ১০০ শতাংশ ডলারে না করে ৮০ শতাংশ করলে ডলারের পতন হয় না। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি অনেক দেশ একসঙ্গে করতে শুরু করে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের ভূমিকার চরিত্র বদলাতে পারে। বিকল্প মুদ্রা, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য কিংবা বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা তখন ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী না হলেও ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর উপায় হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সাফল্যকে শুধু ইরানের অর্থনৈতিক ক্ষতি দিয়ে মাপা উচিত নয়। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা যত বেশি কার্যকর হবে, অন্য দেশগুলোর কাছে ডলারের বিকল্প তৈরি করার প্রবণতাও তত বাড়তে পারে। কিন্তু বিকল্পের প্রবণতা তৈরি হওয়া আর ডলারের আধিপত্য ভেঙে পড়া এক জিনিস নয়। এ কারণেই ইরানের ওপর বর্তমান অর্থনৈতিক চাপকে আমি শুধু ইকোনমিক ডি–ডে বলব না, এটি একই সঙ্গে ডলারব্যবস্থারও একটি স্ট্রেস টেস্ট।
ইরানের জন্য প্রশ্ন, তার অর্থনীতি আর কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে। অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত শক্তি, নাকি সে নির্ভরতাই ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। এই পরীক্ষার ফল আজ পাওয়া যাবে না। ইরানের তেল বিক্রি বন্ধ হলো কি না, রিয়ালের দাম কতটা পড়ল কিংবা নতুন কতটি প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞায় গেল-—এসব তাৎক্ষণিক ফলাফল। প্রকৃত ফলাফল বোঝা যাবে কয়েক বছর পর। বিশ্বের দেশগুলো তখনো আগের মতো ডলারের ওপর নির্ভর করবে, নাকি নিজেদের জন্য দ্বিতীয় একটি আর্থিক পথ তৈরি করে রাখবে। সেখানেই এই ইকোনমিক ডি-ডের প্রকৃত তাৎপর্য। ইরানকে কতটা দুর্বল করা গেল, সেটি নিষেধাজ্ঞার স্বল্পমেয়াদি সাফল্য। কিন্তু বিশ্বের দেশগুলো ডলারের বিকল্প নিয়ে কতটা চিন্তা করতে শুরু করল, সেটিই হবে এর দীর্ঘমেয়াদি ভূ-অর্থনৈতিক ফলাফল।
ইরান হয়তো আজ নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য। কিন্তু প্রশ্নটি ইরানকে ছাড়িয়ে যায়, যুক্তরাষ্ট্র কি তার ডলার শক্তি দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি সেই শক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারই অন্য দেশগুলোকে ধীরে ধীরে বিকল্প পথ তৈরিতে বাধ্য করবে? এই উত্তরই ঠিক করবে, এটি শুধু ইরানের একটি অর্থনৈতিক সংকট ছিল, নাকি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের শুরু। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার আসল পরীক্ষা তাই ইরানের অর্থনীতি কতটা ভাঙল, তা নয়; বরং বিশ্ব অর্থনীতি ডলারের শক্তিকে আগের মতো অপরিহার্য মনে করল নাকি সেই শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের জন্য বিকল্প দরজা খুলতে শুরু করল।
লেখক: অনজন কুমার রায়, ব্যাংক কর্মকর্তা