কাজ আর কর্মের সমঝোতা স্মারক

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

কাজ আর কর্ম দুজন আপন ভাই। আমাদের ভাইয়ে ভাইয়ে কত মিল। অথচ ওদের দুই ভাইয়ের মধ্যে কোনো মিল নেই। কাজ সারা জীবন সংসার, যৌবন, সন্তান, আত্মীয়, পরিজন বিসর্জন দিয়ে একা পরিশ্রম করে চলেছে। কর্ম কিন্তু একা না, তার সঙ্গে ফলাফল চলাফেরা করে, আড্ডা দেয়, গল্প করে, কেনাকাটা করে, হাতে হাত রেখে হাওয়া, রোদ, বৃষ্টি খেয়ে বেড়ায়।

এ জন্য কর্মের ক্ষমতা বেশি। কর্ম ভালো ভালো ফল ভোগ করে আর কাজকে নিয়ে পরিহাস করে। কাজ এতে বেশ দুঃখ পায়।

পথে হাঁটতে হাঁটতে এক ভিক্ষুক কাজকে দুঃখ পাওয়া দেখে বলল, দুঃখ কোরো না কাজ। কেউ কাজ করে আর কেউ কর্মফল ভোগ করে—এটাই পৃথিবীর নিয়ম। তুমি যদি মুক্তিসেনা হতে, তাহলে আর নেতা হতে পারতে না। বটগাছ মানুষের জন্য কত আত্মত্যাগ করে, বিনিময়ে মানুষ বটগাছের জন্য কী করতে পারে? নিজেকে বটবৃক্ষ ভেবে নাও, তাহলে দুঃখ পাবে না। কত মানুষ তোমার এই গোয়ার্তুমি নেশাকে পরিবর্তন করতে বলেছে, তুমি সবকিছু ভুলে নেশাগ্রস্তের মতো কাজ করো। নিজের নেশাকেই যদি পরিবর্তন করতে পারো না, পৃথিবীর নিয়ম পরিবর্তন করবে কী করে? অতএব মেনে নাও, মেনে নিতে শেখো, তাহলে পৃথিবীর সব প্রাণীর মতো সুখ বোধ করবে। পরিবর্তনের আবেগ তোমাকে শুধু দুঃখই দেবে, কোনো দিন পূর্ণতা ও স্বস্তি দেবে না।

কাজ আর কর্মকে বিদায় জানিয়ে খাবারের টেবিলে ভাতের মধ্যে হাত ডুবিয়ে মেয়েটার চোখের দৃষ্টিতে মিলল সবুজ–শ্যামল মাঠের গায়ে হেলান দেওয়া ঝিরিঝিরি বাতাসের সাহস করে সোনালি ধানখেতেও মৃদু ধাক্কা দিয়ে বয়ে যাওয়ার দৃশ্য।

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

কানে শব্দ এল, শাক দিয়ে ভাত খাচ্ছেন?

মেয়েটি চোখ তুলে তাকিয়ে হেসে বলল, এখন তো সবাই শাক দিয়েই ভাত খায়, মাছ মাংস থাকলেও ঢেকে রেখে শাক দিয়ে খায়।

দিন শেষে পথে হাঁটতে হাঁটতে জেটলি বলে ডাকল মেয়েটা, যা অপর পক্ষের বোধগম্য হলো না, টেসলা বলায় না বুঝলেও অনুমান করল। হাতের ইশারায় ডেকে একটা টেসলায় উঠল। খুব আপনমনে ভেবে চলেছে বাংলাদেশের হারকিউলেসের কথা।

হঠাৎ ড্রাইভার বলছে, আপা, আপনার গায়ে লাগেনি তো?

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

ভাবনা থেকে সংবিতে ফিরল। কিরে ভাই, আমরা এত টাকা আয় করেও একটা ডিম খেতে তিনবার চিন্তা করি, আর তোমরা ভারত থেকে আনা ডিম প্যান্টে মাখাও। কিটো ডায়েটধারীদের কী হবে ভেবে দেখেছ? এখন তো শস্যখেতে ধানের পরিবর্তে ডিম চাষ করা লাগবে আর ধান চাষ করবে আমেরিকা। কিন্তু ডিমটাকে তুমি পেলে কোথায়?

হাত দিয়ে ছুঁড়ে মারছে।

আহা! আগে বলবে না? একটু–আধটু কুংফু তো পারি। ডিমসহ হাত দুটিকেও খুলে আনতাম। সামান্যতম ব্যায়ামট্যামও করেনি জীবনে সেই মূর্খ হাত দিয়ে ডিমটা কাকে মারতে চাইল? আমি যেভাবে চাদর–সোয়েটার দিয়ে জবুথবু হয়ে আছি, তাতে পুরুষ না নারী, তাই বোঝা যাচ্ছে না, অবশ্য খোলা মাথা চুল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ডিমটাকে পাথর মনে করে কি আমার মাথা ফাটাতে চাইছিল?

চালকের চোখে মুখে দুঃখের অন্ধকার থাকলেও হাসার চেষ্টা করল, না আপা, পেছনের রিকশায় একটা মেয়ে শার্ট–প্যান্ট পরা, তাকে মারতে চাইছিল।

এই কপাল! আমার কুংফু স্কুলে ওদের ভর্তি হতে বলেন, হালকা–পাতলা টার্গেট করা শেখাব, যাতে ওরা সফল হতে পারে।

কিন্তু আপামণিদের বলি, মাথা থেকে পা পর্যন্ত একটা পোশাক পরা শুরু করো, তাইলে তোমাদের এই ফ্যাশনের পোশাক বানানোর সময় ও শ্রম দিয়ে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিগুলো এক্সপোর্ট বৃদ্ধি করে দেশের উন্নতি করতে পারবে। এমনিতেই কিটোদের জন্য দেশের ডিম চেখে দেখা যায় না, ইলিশের বিনিময়ে ভারতের ডিম কেনা লাগে। উপরন্তু এভাবে পোশাকে ডিম মাখতে থাকলে কেউ আর ডিম চোখেও দেখতে পাবে না। তখন আমেরিকার এক ডিম পাঁচ শ টাকায় কিনে ঘরের চালে গুঁজে রেখে গন্ধ শুঁকে পেট ভরাতে হবে, অবশ্য যদি চালটা থাকে। এমনিতেই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবসায় ডিমের কুসুম সূর্যের রং হারাতে হারাতে চাঁদের রঙে এসে ঠেকলেও মুরগির পেটের ডিমের সাদা অংশ তো পাওয়া যায়, তা নাহলে চায়নার আটা–ময়দা দিয়ে বানানো ডিম সমুদ্র অবগাহন করে এসে ফ্রিজে জায়গা করে নেবে। সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করবে, তখন বাংলাদেশের জন্য মানচিত্র দুঃখ পাবে। তাই ডিম বাঁচাও কর্মসূচিতে কাজ আর কর্ম দুই ভাইয়ের সমঝোতাস্মারক স্বাক্ষর করা প্রয়োজন।

লেখক: ব্যাংকার