আড়াইহাজার ও সোনারগাঁয়ের ঘেঁটু ফলের লাল মায়া
মানুষের প্রাত্যহিক অভ্যাসে মাঝেমধ্যে ছেদ পড়ে, আর সেই ছেদই কখনো কখনো উপহার দেয় নতুন কোনো বিস্ময়। প্রতিদিনের নিয়মমাফিক হাঁটাটা আমার শরীর ও মনের খোরাক। কিন্তু সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ায় সেই রুটিনে কিছুটা পরিবর্তন এল। তবে ফেরার পথে যা দেখলাম, তাতে সেই না-হাঁটার আক্ষেপটুকু একনিমেষেই মুছে গেল।
সন্ধ্যা নামা পথে
আড়াইহাজারের পরাবরদি এলাকা পার হয়ে যখন সোনারগাঁয়ের সীমানায় কালভার্টের ঠিক আগে পৌঁছলাম, তখন গোধূলির আলো মিলিয়ে গিয়ে শেষ সন্ধ্যার ঘনঘটা শুরু হয়েছে। কালভার্ট পেরিয়েই আমার চেনা সোনারগাঁ, মাহমুদপুর কৃষ্ণচূড়া গ্রামের সেই ছায়াঘেরা পথ। ডানের পথ ধরে আমি তখন তালতলার দিকে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ রাস্তার পাশে চোখ আটকে গেল। প্রকৃতির এক অদ্ভুত কারুকাজ! ঝোপঝাড়ে দোল খাচ্ছে উজ্জ্বল লাল আর কালচে বেগুনি আভার একঝাঁক ফল। এই তো আমাদের চিরচেনা ‘ভাঁট’ বা ‘ঘেঁটু’ ফলের রূপ।
অস্তগামী সূর্যের শেষ আবছা আলোয় এই বুনো রূপ যেন আরও মায়াবী হয়ে উঠেছিল। দেরি না করে মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করলাম। এই পরিত্যক্ত ফলটি আমাদের শৈশব আর বাংলার মেঠো পথের চিরকালীন সঙ্গী।
উদ্ভিদতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক পরিচিতি
আমরা যেটিকে ভাঁট বা ঘেঁটু বলে চিনি, উদ্ভিদবিজ্ঞানে তার পরিচয় নিম্নরূপ:
বৈজ্ঞানিক নাম: Clerodendrum\infortunatum
পরিবার: Lamiaceae (ল্যামিয়াসি)।
বংশগত প্রকৃতি: এটি একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর লালচে বৃতির মাঝখানে থাকা কালো ফলগুলো মূলত বীজ ধারণ করে, যা থেকে পরবর্তী প্রজন্মের বংশবিস্তার ঘটে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
অবহেলিত এই বুনো গাছ আসলে মহৌষধি গুণসমৃদ্ধ, যা দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, অবহেলিত এই বুনো গাছটি আসলে এক মহৌষধি। ইউনানি ও কবিরাজি শাস্ত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে এর পাতার রস কৃমিনাশক হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর। চর্মরোগ ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বর নিরাময়ে প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামবাংলায় এর ব্যবহার হয়ে আসছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণ এবং যকৃতের সুরক্ষায় মূলের নির্যাসের কার্যকারিতাও আজ প্রমাণিত।
এরপর ছবি তোলা শেষে আবার হাঁটতে শুরু করলাম—মাহমুদপুর ছাড়িয়ে তালতলা, সেখান থেকে বারদী। বারদী হয়ে যখন সোনারগাঁ উপজেলা গেটে এসে বসলাম, তখন মনে হলো প্রকৃতির এই অবহেলিত সৌন্দর্যগুলো দেখার জন্য কেবল একটু নিবিড় দৃষ্টি আর ভিন্ন সময়ের প্রয়োজন হয়। আধুনিকতার ভিড়ে আমরা মাহমুদপুর গ্রামের সেই বুনো ঝোপগুলোর কথা হয়তো ভুলে যাই।
অথচ এই ভাঁটগাছের ভেষজ গুণ যেমন মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত, তেমনি এর সৌন্দর্যও গ্রামবাংলার এক অনন্য অলংকার। আড়াইহাজার ও সোনারগাঁয়ের সীমানায় সেই শান্ত সন্ধ্যা আর পথের ধারের এই রক্তিম আভা আমার দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি একনিমেষেই ভুলিয়ে দিল। প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র দানই তো আমাদের বেঁচে থাকার পরম প্রেরণা জোগায়।
লেখক: মোহাম্মদ মহসীন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক