বুক রিভিউ: না পাওয়ার মাঝে শূন্য এক অনুভূতি
বইটা খুলতেই প্রথম পাতায় যেন একটা নরম, চুপচাপ বৃষ্টির ছোঁয়া লাগে। অলকানন্দা, যাকে সবাই অলকা বলে ডাকে। একজন অভিনেত্রী, কলেজজীবন থেকে শুরু করে সিনেমার জগতে তার যাত্রা।
যদিও অলকানন্দার সিনেমাপাড়ার এই ছদ্মনাম তার বাবা শফিউর রহমানের দেওয়া। তার এই নাম পছন্দ না, সে নিজেকে কালো ভ্রমর ভাবতে চায় না।
অলকার ভালো নাম রুতপা আলম। অভিনয়ে তার ক্যারিয়ার গত কয়েক বছর ধরে কেউ টপকাতে পারেনি। দাপটের সঙ্গে বড় পর্দায় একচেটিয়া রাজত্ব চলছে। হাই হিলের সঙ্গে অলকার হাই অ্যাক্টিং ক্যাপাবিলিটি যেন শোবিজ পাড়ায় এক আশ্চর্য রূপকথার নাম।
কিন্তু অলকার একান্ত গল্পটা তার ক্লান্তি, স্বপ্ন আর না-বলা অনুভূতির মাঝে। এ রকম একজন নায়িকার জীবন সাধারণত শুটিংয়ের মাঝেই কেটে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার জীবনে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন ঢুকে পড়ে, আর সেই স্বপ্নটা তার বাস্তবকে ছুঁয়ে যায়।
প্রশ্নবাণে জর্জরিত নায়িকা অলকানন্দার জীবনে অবিশ্বাস্যভাবে চলে আসে ভালোবাসা, ক্ষমা, প্রাপ্তি আর সম্পর্কের জটিলতা, শূন্যতা, অপেক্ষা।
বই: চুপচাপ টুপটাপ
লেখক: তৃধা আনিকা
বইয়ের ধরন: সমকালীন রোমান্টিক উপন্যাস।
অলকা শুটিং শেষে ক্লান্ত মনে ঘুমাতে যায়; কিন্তু সে ঘুমালেও যেন স্বপ্নে তার আরেক সিনেমার জগৎ শুরু হয়। সে দেখে, ফুটফুটে দুটো ছেলে তাকে ডাকছে। ছেলে দুটো এসে বলে তারা অলকার সঙ্গে থাকতে এসেছে। সঙ্গে উপহার হিসেবে তাদের বাবাকেও এনেছে। কারণ হিসেবে ছেলে দুটো বলে, তারা তো খুব দুষ্টু। অলকা যদি একা সামলাতে না পারে? সেই দুশ্চিন্তা থেকে তাদের বাবাকেও সঙ্গে করে এনেছে। এই সমস্ত স্বপ্ন দেখার পর, অলকার ঘুম ভেঙে যায় আর সারা রাত দুচোখের পাতা এক হয় না।
এই স্বপ্ন বরং অলকার মনের প্রজেকশন। সন্তান হারানোর অপূর্ণতা। এদের মাধ্যমে লেখিকা দেখিয়েছেন কীভাবে না-বলা আকাঙ্ক্ষা জীবনকে প্রভাবিত করে। সেই সঙ্গে জীবনের একাকিত্বকে আরও হাইলাইট করে। এরা গল্পকে বাস্তব জীবনের মতো করে তোলে।
অলকা এমন একজন চরিত্র, যার সঙ্গে পাঠক নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারবেন, খুব সহজেই। বইয়ের একটা পর্যায়ে দেখা যায়, যেই ছেলে দুটিকে অলকা প্রায় সময় স্বপ্ন দেখে, সেই ছেলে দুটো বাস্তব জীবনেও আছে। পলাশ, বিলাস তাদের নাম। এবং ছেলে দুটোর মা নেই। সিনেমায় নায়িকা অলকাকে দেখতে দেখতে, মমতাময়ী মা হিসেবে এরাও অলকাকে স্বপ্ন দেখে এবং তাকে মা হিসেবে দাবি করে বসে।
একদিকে অলকানন্দা ছেলে দুটোর অর্থাৎ পলাশ–বিলাসের মা হতে চায়, আরেক দিকে ছেলে দুটি অলকাকে তাদের মা হিসেবে চায়। কিন্তু চাইলেই কি কেউ কাউকে সন্তান হিসেবে পেয়ে যায়? বা চাইলেও কি অসহায় মা–হারা দুটি বাচ্চা ছেলে, যাকে মা হিসেবে চাচ্ছে তাকেই পেয়ে যায়? সমাজ কি তাদের এক হতে দেবে?
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
এই সবকিছু জানতে হলে পড়তে হবে ‘চুপচাপ টুপটাপ’ বইটি! যে বইতে লেখিকা দেখিয়েছেন, ভালোবাসা আসলে পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। শুধু অন্য রূপে ফিরে আসে।
বইটির থিম মূলত নীরবতা, না পাওয়ার মাঝে শূন্য এক অনুভূতি, সম্পর্কের শূন্যতা, ভালোবাসা, স্মৃতি, জীবনের না বলা কথা আর নিষ্পাপ আবেগ। জীবন কথা বলে, আর কথাগুলো মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায় পূর্ণতার দিকে। তবে পূর্ণতাপ্রাপ্তির আগে আশ্রয়, নিজের ও চারপাশের সবকিছুর সঙ্গে একাগ্রতার সঙ্গে যুদ্ধ যেন চলতেই থাকে।
লেখিকা জীবনের অব্যক্ত অংশগুলোকে তুলে ধরেছেন। ‘চুপচাপ টুপটাপ’ বইটি পড়তে পড়তে মনে হয় জীবনের নিজস্ব ভাষা আছে, যা কথা না বলেও বলে যায়। তৃধা আনিকার লেখা এই বইটি খুব মিষ্টি, ধীরগতির এবং কবিতাময়।