জিরাতি
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করছে। পূর্বদিক থেকে বইছে মৃদু হওয়া। বাতাসে হেলেদুলে ধানের শীর্ষগুলো একে অপরের ওপর লেপটে যাচ্ছে। যেন অজানা খুশিতে তারা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলিতে মেতে উঠেছে। মাঠভরা সোনালি ধানের আভা। আর মাত্র দুটি সপ্তাহ। তারপরই পুরো হাওর মেতে উঠবে বোরো ধান কাটার উৎসবে। হাওর অঞ্চলে বোরো ধান একমাত্র ফসল। এ ফসল থেকেই সারা বছরের খাবারের জোগান হয়। সকালবেলা ঢেউখেলানো স্নিগ্ধ ধানের শীষগুলো দেখে রহমত আলীর চোখ আনন্দে নেচে উঠছে। খেতে আসার সময় রহমত আলী ছেলে খোকনকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে এনেছে। খোকনের বয়স ১৫ বা ১৬ হবে। ধানের শীষগুলোর ওপর হাত বোলাতে বোলাতে খেতের আল দিয়ে বাবার পেছনে হাঁটছে সে। পেছন থেকে বলছে, ‘আব্বা, দেখো কত্ত সুন্দর ধান হইছে এইবার। খোদা আমাদের দিকে চৌখ তুইললা চাইছে।’ রহমত আলী বলে, ‘চৈত্র মাসে বৃষ্টিতে ধানগুলো পুষ্ট হইছে। এইবার ধানে চেডা কম হবে। ধানে চেডা হইলে ওজনে কম হয়।’ সকালে উদীয়মান সূর্যের আলোর মতো খোকনের চোখে উঁকি দিচ্ছে আশার ঝিলিক। সে বাবাকে বলে, ‘গত তিনডা বছর বোরো ধান বাড়িতে নিতে পারি নাই। পাকার আগেই সব ধান বন্যার পানিতে ডুইববা গেছে।’ মুহূর্তেই অজানা এক শঙ্কায় আঁতকে ওঠে রহমত আলী; মনের অজান্তেই অজানা অনুগ্রহের আশায় তাকান আকাশের দিকে।
গত কার্তিক মাসে রহমত আলী স্ত্রী কমলা, দুই সন্তান খোকন ও নাসিমাকে নিয়ে হাওরে এসেছে। বাপ-ব্যাটা মিলে তৈরি করেছে গোলাঘর। বাঁশের খুঁটি, শণের বেড়া আর ধানের নাড়া দিয়ে তৈরি করেছে চালা। ঘরের একপাশে সুপারিগাছের পাটা দিয়ে বানানো হয়েছে দুটি চৌকি। একটিতে কমলা ও নাসিমা থাকে। অপরটিতে তারা বাপ–ব্যাটা ঘুমায়। রাতে চৌকির নিচে খাঁচায় বন্দী থাকে হাঁস-মুরগি। হাসঁ-মুরগি আলাদা খাঁচায় বন্দী করে রাখা হয়। একসঙ্গে রাখলে মুরগিগুলো হাঁসের বাচ্চাগুলোকে ঠোকরায়। হাওরে কৃষিকাজ করতে আসা সব কৃষকই এমন গোলাঘর তৈরি করে। লোকালয় হতে দূরে সবুজ হাওরের বুকে গোলাঘরগুলোকে শিল্পীর আঁকা নিখুঁত ছবি মনে হলেও ঘরের ভেতরে অসহনীয় জীবনযাপনকে নিয়তি হিসেবেই নিতে হয় বাসিন্দাদের। কার্তিক মাসে তারা হাওরে আসে; বৈশাখ মাসে ধান মাড়াইয়ের পর চলে যায় যার যার স্থায়ী বাড়িতে। ছয় মাসের অস্থায়ী জীবন। অস্থায়ীভাবে বসবাস করে বিধায় তাদের নাম জিরাতি। দূরদূরান্ত থেকে জিরাতিরা আসে হাওরে। কেউ নিজের জমি চাষ করে, কেউ করে বর্গা চাষ। রহমত আলী বর্গাচাষি। হাওরে তার নিজের জমি নেই। বর্গা জমিতে যে ধান হবে, তার অর্ধেক যাবে জমির মালিকের ঘরে, বাকি অর্ধেক পাবে রহমত আলী।
এ বছর হাওরে ধান চাষের বিষয়ে সায় ছিল না স্ত্রী কমলার। পরপর তিন বছর ফসলহানির পর অতিকষ্টে জীবন যাপন করছে রহমত আলীর চার সদস্যের পরিবার। কার্তিক মাসে হাওরে আসার সময় কমলা বলেছিল, ‘গত তিন বছরে গেরস্থির লাইগগা নেওয়া ঋণের টাকা ফেরত দিতে দিতেই তো ঘরে ভাত রান্নার জো থাকে না। এইবার বানের জলে ধান ভাইসসা গেলে তো মরণ ছাড়া গতি নাই।’ রহমত আলীও বুঝতে পারছে; এইবার ধান ঘরে ওঠাতে না পারলে বেঁচে থাকার আর কোনো অবলম্বন তার থাকবে না। কলাতলায় বাঁধা বাছুরকে খড় দিতে দিতে সে বলে, ‘আমি তো আর সরকারি চাকরি করি না যে বেতন থেইকা ঋণের ট্যাকা ফেরত দিব; ঋণের ট্যাকা ফেরত দিতে হইলে আমারে গেরস্থি করন লাগবেই।’ কিছুটা থামল রহমত আলী; তারপর আবার বলে, ‘খোদা তো বারবার মাইর দিব না; এইবার ধান ঘরে তুইললা সব ট্যাকা পরিশোধ করবার পারব, পারব না?’ কমলা কথা বলল না, ঘরের ভেতরে চলে গেল।
রহমত আলী হাঁটতে শুরু করল মহাজনের বাড়ির দিকে। মহাজন তখনো বাড়িতে। তাকে দেখে মৃদু হেসে বলল, ‘এইবারও জিরাতি যাইবা নাকি রহমত আলী; গেল দুইবার ধানে মাইর খাইয়া তো আসল ট্যাকাও দিতে পারনি। লাভের কথা না হয় বাদই দিলাম।’ সুদ খাইলে পাপ হয়। তাই সুদকে সে লাভ বলে। রহমত আলী কিছুটা অপ্রস্তুত গলায় বলে, ‘এইবার ধান হলে লাভসহ পুরো ট্যাকা আপনারে ফিরত দিব সাহেব; এইবার আমার ওপর একটু দয়া করেন।’
‘দয়া করি বলেই তো প্রতিবছর ট্যাকা দিই, কী দিই না? জবাবের আশা না করেই গম্ভীর গলায় আবার বলে, ‘অনেক ট্যাকা তোমার কাছে পাওনা আছে। এইবারও দিতে পারি; তয় আমার কিছু শর্ত আছে। শর্তগুলো মাইন্যা যত ট্যাকা লাগে নিতে পার।’
রহমত আলী মহাজনের শর্ত মেনে আবার ঋণ নেয়। ছয় মাস জনমানবহীন হাওরে থাকার রসদ নিয়ে রওনা করে হাওরের পথে। পানির নিচে পচে থাকা কাঁদামাটিতে গুঁজে দেয় স্বপ্নের বীজ।
দেখতে দেখতে বৈশাখ মাস চলে এসেছে। হাওরে শুরু হয়েছে ধান কাটার উৎসব। আসলেই উৎসব; যেন ঘরে ঘরে ঈদ। একে তো ধানের ভালো ফলন হয়েছে; তার ওপর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় দ্বিগুণ খুশিতে ধান মাড়াইয়ের কাজ করছে সবাই। মাথার ওপরে সূর্য থেকে নেমে আসা আগুনে শরীর ঘেমে গোসল হয়ে যাচ্ছে কৃষক-কামলাদের, তবু কাজে বিরতি নেই। এমন কষ্টের জন্য জিরাতিরা ছয় মাস অপেক্ষা করে। মাড়াই করা ধান শুকানো হয় রোদে। পুরুষ মানুষ ধান কেটে খেত থেকে নিয়ে আসে, মাড়াই করে। মহিলারা মাড়াই করা ধান শুকায়, সেদ্ধ করে, গোলায় ভরে। দম ফেলানোর ফুরসত নেই তাদের। রহমত আলী কমলাকে বলে, ‘এখন আরাম করা যাইব না; বৈশাখ মাস, দিনের কোনো গ্যারান্টি নাই। এখন আকাশ ভালো, হুট করে যে বৃষ্টি নামবে না, নিশ্চয়তা কী? হাত চালিয়ে কাজ করতে হবে।’ কমলা আর নাসিমা কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়। তারা রোদে ধান শুকাচ্ছে, শুকনা ধান গোলায় ভরছে। বর্গাদারকে দেওয়ার পর যে ধান থাকবে, তা বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করা হবে। সঞ্চয় করা হবে সারা বছর চলে, সে পরিমাণ ধান।
বর্গাদার অর্ধেক ধান নিয়ে গেছে। বাকি অর্ধেক ধান বস্তায় ভরছে রহমত আলী। আকাশের অবস্থা ভালো নয়। তা ছাড়া উজানের পানি আসছে হাওরে। থর থর করে বাড়ছে পানি। যেকোনো সময় পানিতে তলিয়ে যাবে পুরো হাওর। বর্গাদারের ধান উঠিয়ে দিয়ে তার ধান ভরতে অনেকটা দেরি হয়েছে। খোকন গেছে ধান ওঠানোর ভ্যান খুঁজতে। হাওর থেকে ধান ওপরে ওঠানো যাবে, এমন কোনো বাহন পাওয়া যাচ্ছে না, ফিরে আসছে খোকন। শুরু হয়েছে কালবৈশাখী; উন্মত্ত বাতাসে জিরাতিদের গোলাঘরের চালাগুলো উড়ছে হাওরের অনন্ত আকাশে। খবর আসছে, বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে; মুহূর্তেই বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকবে গোলাঘর এলাকায়।
অন্ধকার চারদিক; দিশাহারা কৃষকেরা ছুটছে দিগ্বিদিক। রহমত আলী কমলাকে বলে, ‘তোমরা ধান বস্তায় ভরতে থাকো, আমি আর খোকন ধানের বস্তা ওই উঁচু রাস্তায় নিয়ে রাখি, যে কয় বস্তা বাঁচানো যায়।’ প্রাণপণ চেষ্টা করে অর্ধেক ধান বস্তায় ভরতে পেরেছে কমল আর নাসিমা। বেশির ভাগ ধান এখনো বস্তায় ভরা হয়নি। বস্তায় যেগুলো ভরা হয়েছে, সেগুলো সব উঠাতে পারলেও সারা বছরের খাবার জোগান দেওয়া যাবে। ঝড়বৃষ্টির মধ্যে মাথায় ধানের বস্তা নিয়ে হাঁটা গেলেও হাঁটুপানির মধ্যে হাঁটা যাচ্ছে না। ভরা বস্তা নিয়ে যাওয়ার সময় যেখানে পানিশূন্য; ফেরার সময় সেখানে হাঁটুপানি হয়ে যাচ্ছে। মাত্র কয়েক বস্তা ধান খোকন আর রহমত আলী মাথায় করে রাস্তায় ওঠাতে পেরেছে। ঝাপটা বাতাসের মতো পানি চলে আসছে গোলায়। শুকনা ধান পানিতে ভিজে যাচ্ছে মুহূর্তেই। ভরা বস্তাগুলোও সড়কে ওঠানো যাচ্ছে না। কয়েক বস্তা ধান রক্ষা করতে পারলেও বেশির ভাগ ধান ডুবে যাচ্ছে পানিতে।
বস্তা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেছে খোকন, বিড়বিড় করে বলছে, ‘হে খোদা, দয়া করো; আমার সারা বছরের আহার রক্ষা করো।’ পাশে কাঁদছে নাসিমা। ভেজা ধান ওঠাতে পারবে না জেনেও বস্তায় ভরছে কমলা; কাঁদছে সে–ও। ছয় মাসের পরিশ্রম কীভাবে পানির নিচে আস্তে আস্তে তলিয়ে যাচ্ছে; কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে দেখছে রহমত আলী। চারদিকে পানি আর পানি; এত পানির মধ্যেও কলিজাটা শুকিয়ে যাচ্ছে তার। বৃষ্টিতে মাথার চুল ভিজে টপ টপ করে পানি পড়ছে কপাল, গাল বেয়ে; বৃষ্টির পানিতে অদৃশ্য হচ্ছে দুই চোখের উষ্ণ পানি। বাক্রুদ্ধ রহমত আলীর চোখে ভেসে আসছে মহাজনের কাছে বাড়ির জমি বন্ধক রেখে তৃতীয়বারের মতো ঋণ নিয়েছিল সে। এবার ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে বসতভিটা চলে যাবে মহাজনের দখলে। ভিটেবাড়ি হারিয়ে চিরদিনের জন্য জিরাতি হয়ে যাবে সে। খোকনের থাকবে না বাপের ভিটাও।
লেখক: এম এম উজ্জ্ব, পাকুন্দিয়া, কিশোরগঞ্জ, সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]