শান্তিতে বিনিয়োগ করুন: সবার জন্য, সর্বত্র, প্রতিদিন

শান্তি হলো ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তা, মর্যাদা, সুযোগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক জীবন্ত অনুভূতি। এটি মানব সভ্যতার চিরন্তন প্রত্যাশা। সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে আসছে, যেখানে থাকবে না কোনো যুদ্ধ, হানাহানি, বৈষম্য কিংবা অশ্রুপাত। তবে একুশ শতকের অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসেও বিশ্ব শান্তি আজ হুমকির মুখে। বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, ধর্মীয় বিভেদ, বৈষম্য-বর্ণবাদ এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা মানবজাতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই বিশ্বজুড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনা শুধু আবেগপ্রবণ বিষয় নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য তাগিদ।

প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসটি উদ্‌যাপিত হয়। বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঘোষিত দিবসটির উদ্দেশ্য হলো পৃথিবী থেকে যুদ্ধ-সংঘাতের নিরসন এবং সেই লক্ষ্যে যুদ্ধরত অঞ্চলগুলোয় যুদ্ধবিরতি কার্যকরের মাধ্যমে সেসব অঞ্চলে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। প্রতিবছর জাতিসংঘ সদরদপ্তরে শান্তির ঘণ্টা বাজানোর মধ্যদিয়ে দিবসটি উদ্‌যাপনের সূচনা হয়। এই ঘণ্টা স্মরণ করিয়ে দেয়, যুদ্ধের পরিণাম মানুষের মৃত্যু। এ ছাড়া ঘণ্টাটির পার্শ্ববর্তী সড়কে ইংরেজিতে ‘স্থিতিশীল বৈশ্বিক শান্তি দীর্ঘজীবী হোক’ বাণী খোদাই করে লেখা রয়েছে। ১৯৮১ সালে সর্বপ্রথম উদ্‌যাপিত হলেও বর্তমানে জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদ্‌যাপন করা হয়ে থাকে। তবে ২০০২ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় মঙ্গলবার এই দিন পালন করা হতো, এর পর থেকে ২১ সেপ্টেম্বর দিনটিকে বিশ্ব শান্তি দিবস হিসেবে ধার্য করা হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো- ‘শান্তিতে বিনিয়োগ করুন, সবার জন্য, সর্বত্র, প্রতিদিন’। প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং বর্তমান সংকটময় বিশ্ব বাস্তবতায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার এক কৌশলগত দলিল।

সাধারণভাবে বিনিয়োগ বলতে আর্থিক বা ব্যবসায়িক মুনাফাকে বোঝায়। তবে এই প্রতিপাদ্যে বিনিয়োগ শব্দটিকে ব্যাপক ও মানবিক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন:

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

শান্তিতে বিনিয়োগ: অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ কিংবা সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ না করে সেই সম্পদ পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, পরিবেশ রক্ষা এবং বৈষম্য দূরীকরণে ব্যবহার করাই হলো শান্তিতে বিনিয়োগ। সহিংসতা বা সংঘাত তৈরি হওয়ার পর তা দমন করার চেয়ে সংঘাতের মূল কারণগুলো দূর করতে আগে ভাগে সম্পদ ও মনোযোগ দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর। সবার জন্য শান্তি কোনো নির্দিষ্ট সমাজ, জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী বা বিত্তবানদের একচ্ছত্র অধিকার নয়। লিঙ্গ, বর্ণ বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের শান্তিতে বসবাসের সুযোগ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য।

সর্বত্র: বিশ্বায়ন ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিশ্বের কোনো এক প্রান্তের অশান্তি বা অস্থিরতা পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করে। ফলে শান্তিকে নির্দিষ্ট কোনো দেশ-জাতির সীমারেখায় আটকে রাখা নয়; বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে (উন্নয়নশীল থেকে উন্নত সব দেশ-অঞ্চলে) শান্তি বজায় রাখা দরকার।

প্রতিদিন: শান্তি কোনো একদিনের অনুষ্ঠান বা সাময়িক চুক্তি নয়। এটি একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। প্রতিদিনের সামাজিক আদর্শ-মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, মানবাধিকার রক্ষা এবং নিত্যদিনের আচরণ ও সিদ্ধান্তের মধ্যদিয়েই শান্তিকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।

মূলত প্রতিপাদ্যটি এই শিক্ষা দেয় যে, সহিংসতা-হানাহানি বন্ধের পর নিষ্ক্রিয় বসে থাকার নাম শান্তি নয়। বরং শিক্ষা, সহনশীলতা, সাম্য এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রতিনিয়ত মানুষের মেধা, শ্রম, সময় ও সম্পদ প্রয়োগ করাই হলো সত্যিকারের শান্তিতে বিনিয়োগ। এ দিবস উপলক্ষে এক বাণীতে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন ‘এই আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসে, আসুন আমরা সবাই আমাদের পাড়া-মহল্লা, শ্রেণিকক্ষ এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাওয়া মানুষদের সাহস থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করি। এবং আসুন, বিশ্বের সব মানুষের এক শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে শান্তিতে বিনিয়োগের জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই।’

বিভিন্ন ধর্মের মূল দর্শনেও শান্তির প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। যেমন পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছেÑএকজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল (সুরা আল-মায়েদা: ৩২)। অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম মতানুসারে ব্যক্তিজীবন, ধনসম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা প্রদান শান্তির মূল ভিত্তি। হিন্দুধর্মের দর্শনে বিশ্বকে একটি একক পরিবার হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি থেকে শুরু করে প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে শান্তি অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়। অন্যদিকে শত্রুকে ক্ষমা করা, হিংসার বদলে অহিংসা বেছে নেওয়া, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানবজাতিকে ভালোবাসাই হলো খ্রিষ্টধর্ম মতে বিশ্বশান্তির মূল পথ। এছাড়া বৌদ্ধ দর্শনের মূল ভিত্তিই হলো অহিংসা, করুণা এবং অন্তরের শান্তি। বৌদ্ধ ধর্মমতে, বাহ্যিক বিশ্বশান্তি কখনোই যুদ্ধ বা অস্ত্রের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে না; বরং মানব মনের পরিবর্তন ও বৈশ্বিক করুণার মাধ্যমেই তা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসটির মূল তাৎপর্য হলো এই পৃথিবীটাই মানুষের বাসভূমি, এখানে থাকতে হলে শান্তিতে, বন্ধুত্বপূর্ণভাবে, সবার সঙ্গে সবার সদ্ভাব বজায় রেখে চলা। আর যে বিশ্বে শান্তি নেই, সেখানে থাকা প্রায় অসম্ভব। ফলে ভালোভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চাইলে শান্তি বজায় রাখা জরুরি। কারণ, সহিংসতা, যুদ্ধ এসবের মাধ্যমে কোনো সমস্যারই সমাধান হয় না। এসবে কেবল প্রাণহানি, সম্পত্তি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে।

বর্তমান বিশ্বে যেখানে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য জটিল উপায়ে আচ্ছাদিত করে আছে, সেখানে শান্তির অন্বেষণ কেবল একটি নৈতিক বাধ্যতামূলক নয় বরং টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। শান্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু পারস্পরিক সম্পর্কিতই নয়, এ দুটি একে-অপরকে শক্তিশালী করে। শান্তি স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ে তোলে, যেখানে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা সামাজিক অস্থিরতাকে বৃদ্ধি করে। আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস উদ্‌যাপন আমাদের শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য সম্মিলিত দায়িত্বের এক মর্মস্পর্শী স্মারক হিসেবে কাজ করে। তবে শুধু বছরের একটি দিনে নয়, প্রতিটি দিনই কাটুক সেই শান্তির ধারণাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে।

আজ চরম অস্থিরতার মাঝে শান্তির সন্ধান হয়তো দুঃসাধ্য বলে মনে হতে পারে—কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা এর আগে কখনো এতটা জরুরি ছিল না। শান্তি কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতিই নয়; এটি মানবজাতির বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো সমবেতভাবে মোকাবিলার জন্য এক অপরিহার্য ভিত্তি। ‘শান্তিতে বিনিয়োগ করুন: সবার জন্য, সর্বত্র, প্রতিদিন’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবারের আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসে শান্তির প্রতিদিনের কারিগরদের সম্মান জানানো হচ্ছে; যাঁদের স্থানীয় পর্যায়ের পদক্ষেপ স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে তুলছে এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে স্থায়ী শান্তির পথ সুগম করছে। শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবাই, সব জায়গায় নিজের ভূমিকা পালন করতে পারেন। শান্তির জন্য প্রতিদিন অন্তত একটি ছোট পদক্ষেপ নিন। যেমন-

# অন্যকে সাহায্য করতে আপনার সময় দিন।

# ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য আপনার কণ্ঠে আওয়াজ তুলুন।

# সমাধানকেন্দ্রিক আন্তপ্রজন্মের তরুণদের নেতৃত্বাধীন আলোচনা সভার আয়োজন করুন।

# শান্তি ও আশার গল্প প্রচার করতে আপনার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করুন।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায় ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি’। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। যুদ্ধ কখনো কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না; যুদ্ধের শেষ পরিণতি কেবল ধ্বংস ও নিস্তব্ধতা। ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই বিশ্বে কাঙ্ক্ষিত শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আসুন, জাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা সবাই একস্বরে বলি-যুদ্ধ নয়, ধ্বংস নয়; বিশ্বে শান্তি ফিরে আসুক।

  • লেখক: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান ও অতিরিক্ত পরিচালক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খুলনা-৯২০৩, বাংলাদেশ)