ভালোবাসার এক অদ্ভুত রসায়ন মান্নান স্যার

ছবি: লেখকের পাঠানো

আমার শিক্ষক। আমার বাবার শিক্ষক। বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক, সোশ্যালিজম, ধর্ম, তাবলিগ কোথায় তিনি ছিলেন না! অতীতের দিকে তাকালে আজ বিস্ময় আর আনন্দ সমতালে আমাকে আন্দোলিত করে। বিহ্বল করে। ধর্মকে আমলে রেখে একটা মানুষ এত আধুনিক হতে পারে! ভাবতেই আমি নাজুক হয়ে যাই। লীন হয়ে যাই।

আমার অহংকার, মান্নান স্যার আমাকে স্নেহ করতেন। ভালোবাসতেন। তিনি তাবলিগের আমির আবার উপজেলার বড় স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সেলাইবিহীন লুঙ্গি পরতেন। জামাতে নামাজ পড়েন আবার বিশাল জমায়েতে বক্তব্য রাখতেন। গ্রুপিং সামলে একটি বড় বিদ্যালয় মেনটেইন করেছেন। অনেক নেতার শিক্ষক তিনি। শিক্ষকেরও শিক্ষক। আদতে আমার মান্নান স্যার নিজেই ছিলেন একটা মিথ বয়ান। আশ্রয়।

ভোলার এ কিংবদন্তিতুল্য শিক্ষক ৯৫ বছর দুনিয়ার সফর শেষ করে অনন্তলোকে পাড়ি জমান গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর। তাঁর প্রিয় স্কুল মাঠে জানাজার নামাজ হলো। আশ্রয় আর এক অভিভাবকের পার্থিব বিদায় হলেও তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর ছড়ানো আলোর মশালে। সৃষ্টিতে। কর্মে।

আমাদের বাতিঘর শিক্ষাগুরু মান্নান স্যার শতবর্ষী বোরহানউদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের (বর্তমান বোরহানউদ্দিন সরকারি উচ্চবিদ্যালয়) সর্বকালের সেরা প্রধান শিক্ষক। কোনো স্বীকৃতির পেছনে দৌড়াননি বরং স্বীকৃতি তাঁকে খুঁজে নিয়েছে। জেলা ছাড়িয়ে অসংখ্যবার যশোর বোর্ডের (তখন বরিশাল বোর্ড ছিল না) সেরা প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। সর্বশেষ ১৯৯২ সালে জাতীয় পর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার হাত থেকে খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বর্ণপদক ও ১০ হাজার টাকার চেক গ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধেও ছিল তাঁর অসামান্য ভূমিকা। ১৯৭০ সালের বন্যার পর পাকিস্তানি সেনা সদস্যরা ত্রাণ দেওয়ার জন্য স্কুলে ক্যাম্প করে। ওই সময় সেনারা স্কুলের হাইবেঞ্চ পুড়িয়ে রান্নার কাজ করে। স্কুলের শিক্ষার্থীরা দেখে প্রতিবাদ করে। স্যারের কাছে পাকিস্তানি সেনারা ওই ছাত্রদের টিসি দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দিতে বলেন। স্যার অপারগতা প্রকাশ করলে সেনারা স্যারসহ ইংরেজি শিক্ষক প্রয়াত মোফাজ্জল হোসেন ও ছাত্রদের নামে থানায় মামলা করেন। এর মধ্যে চলে আসে মুক্তিযুদ্ধ। স্যার স্কুলের ছাত্রদের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। স্কুলের বোডিংয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সহযোগিতার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে সব সময় কাছে পেয়েছেন।

মান্নান স্যার ১৯৫৪ সালে বোরহানউদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দুই বছর পর ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৯৩ সালের জুন পর্যন্ত টানা ৩৭ বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন। তাঁর সময়কালে উর্দু স্যার (প্রয়াত মজিবুল হক স্যার) ব্যাতীত সব শিক্ষকই তাঁর ছাত্র ছিলেন। আবার কেউ কেউ ছিলেন তাঁর ছাত্রেরও ছাত্র। স্যার যখন স্কুলের বারান্দায় দাঁড়াতেন স্কুল বন্ধ কী খোলা বলা মুশকিল ছিল। মাঠ দূরে থাক স্কুলের বরান্দায়ও সুনসান নীরবতা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে। ব্যাখ্যাতীত বিনম্রতায় যে যাঁর স্থানে। ভয়ে! স্যার কি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গালিগালাজ করতেন? কিংবা শিক্ষার্থীদের মারতেন? পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবন প্লাস আমার বাবা ওই স্কুলের শিক্ষক থাকার কারণে আগে–পরে মিলিয়ে একটু বেশিই সান্নিধ্য পেয়েছি স্যারের।

শিক্ষকেরা সবাই তাঁর ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও কাউকে তুইতোকারি করে সম্বোধন করতে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি তুমি করেও বলতেন না। এমন শুনতাম মোফাজ্জল মিয়া, ইউসুফ মিয়া, মিছির মিয়া, শাহাজল মিয়া একটু শোনেন বা আসেন ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রথম প্রথম স্যারেরা ওই সম্বোধনে বিব্রত হতেন। স্যারদের ভাষায়, ‘হেড স্যারকে যখন একা একা বলা হলো, স্যার আপনি আপনি করে কেমন যেন লাগে। স্যারের উত্তর, আমাকে চেয়ারের সম্মান তো দিতে হবে। আমি যদি তুইতোকারি করি কিংবা এমন কিছু। শিক্ষার্থীরা ওটাই শিখবে। মানুষকে সম্মান দেওয়া আর শিখবে না।’ এ কথাগুলো আমার আমার বাবার কাছ থেকে শোনা।

স্যারকে বলা হতো ইংরেজির ‘জাহাজ’। কিন্তু এমন কোনো বিষয় নেই, যাতে তাঁর পাণ্ডিত্য নেই। কী গণিত, কী বিজ্ঞান, কী ভূগোল—সব তাঁর কাছে সহজ সমাধান। অনেক সময় দেখেছি অন্যান্য বিষয়ের স্যারেরাও দ্বিধায় পড়লে স্যারের দ্বারস্থ হতেন।

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম দেয়ালপত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পড়ল আমার কাঁদে। চার-সাড়ে চার ফুটের দেয়ালপত্রিকার জন্য আর্ট পেপার, রং পেনসিল, কলমসহ যাবতীয় খরচের ভাউচার দিতে বললেন মান্নান স্যার। আমিসহ আমার সহসম্পাদক বন্ধু আকবর সর্বসাকুল্যে ৮২ টাকা খরচের ভাউচার দিলাম। স্যার ভাউচারে চোখ বুলিয়ে হুংকার দিয়ে বললেন, তিন দিনে শেষ করতে পারবি। কাঁপুনিসহ বললাম, জি স্যার। স্যার ভাউচারের কপিটা ছুড়ে দিয়ে বললেন, ‘গাধা, এটা ঠিক করে আন।’

গর্দভ কণ্ঠে বললাম, স্যার কী ভুল! আরে গাদা তিন দিন ধরে স্কুলে বসে কিছু না খেয়েই কাজ করবি, স্যারের জিজ্ঞাসা। শেষমেষ এক শত আট টাকার ভাউচার দিলেও স্যার বললেন,এত কমে হয়ে গেলে তো ভালোই! সেই দেয়ালপত্রিকা উপজেলা, জেলা পর্যায়ে প্রথম হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে খুলনায় যেতে হবে। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থার কারণে আর যাওয়া হয়নি।

তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। একদিন নড়বড়ে সাইকেলে চড়ে মানিকার হাঁটের দিকে যাচ্ছি। সাইকেল চালাচ্ছে বন্ধু আকবর। পড়নে লুঙ্গি। হেলিপ্যাডের কাছে দূর থেকে দেখি রিকশায় চড়ে স্যার বিপরীত দিকে আসছেন। আমি বললাম, ‘আকবর টাইগার আসছে!’ কই বলে আকবর সামনে তাঁকিয়েই ঝপাৎ করে নামতে গিয়ে সাইকেলে লুঙ্গি আটকিয়ে রাস্তায়। স্যার রিকশা থামিয়ে নামলেন। আমাদের তো মাথা আর উঁচু হয় না। স্যার হুংকার দিয়ে বললেন, সম্মান দেখাতে গিয়ে হাড়গোর ভাঙলে কে দিত! ‘আমাকে দেখলে আর এভাবে নামাবি না।’

প্রকৃত অর্থে শিক্ষক বলতে যা বোঝায়, এ মানুষটি তা-ই। ব্যক্তি পরিচয় ছাপিয়ে নিজেই একটা প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। কিন্তু কখনো তাঁর ভেতর এ অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়নি। স্যারের অবসরের পর রিকশায় চড়ে পাশ দিয়ে গেলে অথবা পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হতো কে যেন বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটায়। সবই শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসার অদ্ভুত রসায়ন। এটাকে ভাষা দিয়ে বর্ণনা করা খুব কঠিন। কিন্তু এর অস্তিত্ব আকাশ ছাড়িয়ে।

লেখক: শিক্ষক

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]