অদৃশ্য শ্রমের মহাকাব্য নারী কৃষক: কাঠামোগত শোষণ ও মজুরি বৈষম্যের এক অদৃশ্য আখ্যান
আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো এমন এক জঘন্য ও শোষক কায়দায় সাজানো হয়েছে, যেখানে নারীর শ্রমকে ‘গৃহস্থালি কাজ’ বা ‘সহযোগিতা’ বলে চালিয়ে দিয়ে তার অর্থনৈতিক মূল্যকে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়। হাওরপারে যে নারীটি কাকভোরে উঠে কাদা-পানিতে নেমে ধান কাটার বা মাড়াই করার কাজে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে, দিনের শেষে মজুরি দেওয়ার সময় আমাদের সমাজ তার সঙ্গে চরম প্রতারণা করে। একই কাদামাখা জমিতে, একই প্রখর রোদে, একই পরিমাণ অমানুষিক পরিশ্রম করেও একজন নারী কৃষককে পুরুষের তুলনায় অর্ধেক বা তারও কম মজুরি দেওয়া হয়। এই যে আকাশচুম্বী মজুরিবৈষম্য, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রের এক সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক জুলুম। আমরা মুখে ‘নারী উন্নয়ন’ বা ‘নারীর ক্ষমতায়নের’ বুলি আওড়াই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে যখন একজন নারী শ্রমিকের ঘামের মূল্য দেওয়ার সময় আসে, তখন আমাদের আমলাতান্ত্রিক হাতগুলো ছোট হয়ে যায়। এই বৈষম্যই প্রমাণ করে যে আমাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড আসলে কতটা ভঙ্গুর, নীতিহীন ও অনৈতিক।
ঢলের পানিতে যখন আধা পাকা ধানের শিষ পচে নষ্ট হয়, তখন সেই ক্ষতি নারী কৃষকের জন্য এক দ্বিমুখী নরকযন্ত্রণা নিয়ে আসে। পুরুষটি হয়তো বাজারে গিয়ে হাহাকার করে বা কিস্তির ভয়ে পালিয়ে বেড়ায়, কিন্তু ঘরের ভেতরে সেই নারীকে লড়াই করতে হয় চরম খাদ্যহীনতা, সন্তানের ক্ষুধা আর সামাজিক অপমানের সঙ্গে। ঋণের কিস্তির জন্য যখন লোকজন দরজায় এসে শকুনের মতো হানা দেয়, তখন সেই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের প্রথম শিকার হয় নারী। অথচ এই নারী কৃষকের নামে কোনো ব্যাংকঋণ বরাদ্দ হয় না, এমনকি সরকারি ত্রাণের তালিকায় তাঁর নাম থাকে সবার শেষে। এই যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চরম অন্ধত্ব, তা আসলে নারী কৃষককে উৎপাদনব্যবস্থা থেকে মুছে ফেলার এক গভীর চক্রান্ত। এসি রুমে বসে যাঁরা কৃত্রিম উপগ্রহের ম্যাপ দেখে কৃষির পরিকল্পনা করেন, কখনোই বুঝবেন না তিলে তিলে গড়া স্বপ্নের ফসল চোখের সামনে পচতে দেখার যন্ত্রণা নারী কৃষকের হৃদয়ে কতটা রক্তক্ষরণ ঘটায়।
ভাওয়াল গড়ের বন্য প্রাণী ও প্রাচীন বাস্তুতন্ত্রকে যেভাবে উন্নয়নের জবরদস্তিতে খুন করা হয়েছে, ঠিক একইভাবে এ দেশের নারী। কৃষকদের শ্রমের অধিকারকে ‘সংস্কৃতি’ বা ‘পারিবারিক ঐতিহ্যের’ দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর ধরে জবাই করা হচ্ছে। আমাদের সমাজ মনে করে, নারীর কাজ মানেই ‘ফ্রি সার্ভিস’। ধান সেদ্ধ করা থেকে শুরু করে শুকানো এবং গোলায় তোলা পর্যন্ত যে শ্রম নারীরা দেন, তার কোনো আর্থিক মূল্যায়ন আমাদের তথাকথিত মডার্ন বাজারব্যবস্থায় নেই। এই যে অদৃশ্য শ্রম, এটিই আমাদের জাতীয় অর্থনীতির এক বিশাল অংশ দখল করে আছে, অথচ তার বিনিময়ে নারী পায় কেবল অবজ্ঞা, পারিবারিক সহিংসতা আর মজুরিবৈষম্য। এর সঙ্গে যমদূতের মতো যুক্ত হয়েছে সিন্ডিকেট-নির্ভর বাজারব্যবস্থা, যারা কৃষকের সর্বনাশ ঘটিয়ে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লোটে, কিন্তু সেই মুনাফার এক পয়সাও নারী শ্রমিকের ভাগ্যে জোটে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে যখন উন্নত বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের পাপের খেসারত আমাদের প্রান্তিক মানুষগুলো দেয়, তখন সেই বিপর্যয়ের ভার নারীর ওপর পড়ে কয়েক গুণ বেশি। বন্যার পানি যখন ঘরে ঢোকে, তখন স্যানিটেশন থেকে শুরু করে বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট—সবকিছুর সঙ্গেই প্রথম লড়াই করতে হয় নারীকে। রাষ্ট্র যখন সুরক্ষার কোনো টেকসই ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল বাঁধ নির্মাণের নামে লুটপাটের মহোৎসব চালায়, তখন সেই লুটপাটের প্রধান শিকার হয় এই শ্রমজীবী নারীরা। এই অবহেলা কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত ব্যবস্থা যা নারীকে কেবল সস্তা শ্রমের উৎস হিসেবে গণ্য করে, কিন্তু মানুষ হিসেবে তার অধিকারকে পদদলিত করে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই শোষণের কাঠামো ভেঙে নারী কৃষককে তাঁর শ্রমের পূর্ণ স্বীকৃতি আর সমান মজুরি নিশ্চিত করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো উন্নয়নের গালভরা বুলিই এ দেশের মাটিতে অর্থবহ হবে।
হাওর থেকে সমতল—সর্বত্র নারী কৃষকদের এই আর্তনাদ আসলে পাংশুটে হয়ে যাওয়া এক মৃতপ্রায় জনপদের হাহাকার। নদী, জঙ্গল আর শ্রমিকের জীবন যদি আজ এই ভূখণ্ডে নিরাপদ না থাকে, তবে এই রাষ্ট্র কোনোভাবেই টেকসই হতে পারে না। এই কাঠামোগত অবিচারের অবসান না হলে একদিন আমাদের ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। মজুরিবৈষম্য দূর করে নারী-পুরুষনির্বিশেষে প্রতিটি শ্রমিকের ঘামের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের জাতীয় নৈতিকতা আর মূল্যবোধও সেই বানের পানির নিচেই সমাধি লাভ করবে। এই সমাধি থেকে জেগে ওঠার একটাই পথ—শোষণের এই সামগ্রিক কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে এক নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চুক্তি গড়ে তোলা, যেখানে নারীর শ্রম হবে স্বীকৃত এবং তার মর্যাদা হবে অলঙ্ঘনীয়। অধিকারের প্রশ্নে আপস করার সময় বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে, এখন প্রয়োজন সরাসরি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং এই কাঠামোগত দাসত্বের বিরুদ্ধে এক বজ্রকণ্ঠ প্রতিরোধ। আমাদের প্রকৃত মুক্তি তখনই আসবে, যখন দেশের প্রতিটি প্রান্তের সেই নারী কৃষকটি তার প্রাপ্য মজুরি বুঝে পাওয়ার সময় আর মাথা নিচু করে থাকবে না, বরং বুক চিতিয়ে তার অধিকার ছিনিয়ে নেবে। সেই দিনের অপেক্ষায় লড়াইটা জারি রাখা এখন আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার দায়।
*লেখক: সৈয়দ নাভিদ আনজুম হাসান, উন্নয়নকর্মী, গবেষক
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]