ফার্মা মাইক্রোবায়োলজিস্ট ফোরামের যাত্রা, চাকরি ও জীবন

একজন ফার্মাসিস্ট ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করে ওষুধ বিক্রি করেন অথবা সেবাগ্রহীতাকে দেনছবি: সংগৃহীত

বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মাসি, কেমিস্ট্রি, বায়োকেমিস্ট্রি, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োটেক ইত্যাদি কোর সাবজেক্টে পড়ে সরকারি চাকরি আর উচ্চশিক্ষায় বিদেশে যাওয়ার পরেই বড় একটি সুযোগ্য খাত রয়েছে, আর সেটা হলো ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে চাকরি। ৯৮ ভাগ ওষুধের জোগানদাতা এই খাত অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। কিন্তু সদ্য পাস করা একজন শিক্ষার্থীর কাছে কেন প্রথম সারির ক্যারিয়ার গড়ার সিঁড়ি হয়ে উঠছে না, সেটা অবশ্যই ভাবনার বিষয়।

বলাবাহুল্য, ভবিষ্যতের ফার্মা লিডার তৈরি না করলে অপার এই সম্ভাবনার দ্বার দক্ষ আর দায়িত্ববান লিডার ছাড়া অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে যাবে। সরকারি চাকরি না পেয়ে একান্তই বাধ্য হয়ে অনেকেই ঢুকছেন, কাজ করতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছেন, কাজে মনোনিবেশের তুলনায় কোম্পানির সুযোগসুবিধা আর নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে ভাবতে দিন চলে যাচ্ছে।

ফার্মা মাইক্রোবায়োলজিস্ট নিয়ে এবার যাত্রা শুরু করছে ‘ফার্মা মাইক্রোবায়োলজিস্ট ফোরাম ইন বাংলাদেশ’। দেশের সব ফার্মায় কর্মরত ফার্মা মাইক্রোবায়োলজিস্টদের ভালো-মন্দ, চাকরির সন্ধান, নবীনদের ক্যারিয়ার গঠনে সহায়তা, চাকরিহীনদের চাকরির ব্যবস্থা করা, গাইডলাইনভিত্তিক আলোচনা ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করার অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এই ফোরাম। ফার্মা মাইক্রোবায়োলজিস্ট নিয়ে কোনো স্বতন্ত্র সংগঠন এখনো আলোর মুখ দেখেনি, তাই অনেকটাই আশার আলো নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এই ফোরাম।

এবার আসা যাক মূল বিষয়বস্তুতে। ঈদের ৭-৮ দিনের বন্ধে সব ওষুধ উৎপাদন, ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম তো বন্ধ হওয়ার কথা, সেটাই স্বাভাবিক। যেমন একটা ইনজেকশন বা চোখের ড্রপ/মলম জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া/ছত্রাক) আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করতে কমপক্ষে ১৪ দিন লাগে, আর এই ১৪ দিনের প্রতিদিন দক্ষ ওষুধশিল্পের কর্মীরা প্রতিদিন ভালোভাবে মনিটরিং করে দেখেন। একবার ভাবুন তো, ছুটির এই ৭-৮ দিন যদি চেক না হয়, তাহলে ঈদের পরপরই ওই ওষুধ কীভাবে বাজারজাত হবে! তাই প্রতিদিন একইভাবে ডিউটি করে গেছেন ওষুধশিল্পের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা। এই ডিউটিগুলো হয় একদম স্বতঃস্ফূর্তভাবে। একইভাবে একটা ওষুধ কারখানার পানি, বাতাস, গ্যাস প্রতিনিয়ত মনিটরিং করে গেছেন সেই নিবেদিতপ্রাণ। সঙ্গে তো নিরাপত্তাকর্মীরা রয়েছেন সব সেক্টরের মতো। সীমিত আকারে ওষুধ উৎপাদন তো সঙ্গে আছেই। ঈদের পর অফিস খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সব ওষুধের ব্যাচ নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাজারে সরবরাহ করা হয়। এই কাজগুলো করবেন ডিস্ট্রিবিউশন-মার্কেটিং-সেলসের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা। দেশের মানুষের স্বাস্থ্য খাতে পরোক্ষভাবে বিশাল অবদান রেখে যাচ্ছেন তারা।

আগের লেখায় বলেছি, ওষুধশিল্পের কর্মীদের অবদান নিয়ে মিডিয়া কভারেজ কম হয়, লেখালেখি কম হয়। সেটা নিয়ে তাদের কোনো আক্ষেপ বা অভিযোগ নেই। তবে একদম না জানলেও সমস্যা, কারণ আমরা অনেকেই ওষুধশিল্পের কর্মীদের পরিবহনকৃত সুন্দর এসি গাড়ি, জীবনযাপন আর দোকানে ওষুধের দাম দেখে তাদের বিলাসী হিসেবেই মূল্যায়ন করি। অনেকেই জানেন না, ওষুধের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এই জব কখনোই সার্থক হয় না।

ভবিষ্যৎ ফার্মা লিডার তৈরি করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। দেশের মেধা সঠিকভাবে কাজে না লাগালে খুব বেশিদিন নেই যখন দেশের বাইরে থেকে মানুষ আনতে হবে ওষুধের ফর্মুলেশন, উৎপাদন, গুণগতমান নির্ণয় আর নিশ্চিত করতে।

কাজ করতে গিয়ে যদি সারা দিন এই ভেবে দিন যায় যে, কোথায় এলাম, কী হবে আমার ভবিষ্যৎ, আর কেনই–বা এলাম, পরবর্তী সময়ে কোন সেক্টরে যাব ইত্যাদি ইত্যাদি, তাহলে কিন্তু কোথাও না কোথাও ভুল হতেই থাকবে। রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরিরত প্রতিষ্ঠান, কর্মী আর সিনিয়র সবাইকেই এই দায়িত্ব নিয়ে ভবিষ্যৎ লিডার আর দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতেই হবে। কারণ, হতাশাগ্রস্ত কর্মী দিয়ে সুদূরপ্রসারী আশাবাঞ্জক কিছু সম্ভব নয়।

বর্তমান নতুন প্রজন্মের কাছে ফার্মা সেক্টর চাকরির জন্য অবশ্যই গর্বের আর মানবসেবার অন্যতম পরোক্ষ মাধ্যম। আর এই গর্বিত সেক্টরে সিনিয়রদের মতোই নিজের পুরোটা ঢেলে না দিতে পারলে অনেকটাই অপূর্ণ, অনিরাপদ আর ভারসাম্যহীন হয়ে যেতে পারে।

*লেখক: মনোজিৎ কুমার রায়, ফার্মা প্রফেশনাল

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]