ইরান সংকটে, না পুনর্গঠনের পথে?
আহত সিংহের মতো লড়ছে ইরান। মুসলিম বিশ্বের কাছে অনেকটা গৌরবের বিষয় ছিল যে ইরান এমন একটি রাষ্ট্র, যারা প্রকাশ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে এবং ফিলিস্তিনের প্রশ্নে স্পষ্ট ভাষায় কথা বলে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের সাম্প্রতিক যৌথ হামলায় ইরানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দীর্ঘ শাসনকালের অবসান ঘটেছে। এই যৌথ সামরিক অভিযানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যের জন্য বড় ধাক্কা। হামলার আগের দিন জেনেভায় পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মধ্যস্থতাকারী ওমান ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিতও দিয়েছিল। তেহরান নীতিগতভাবে বড় বড় শর্তে সম্মতি দিয়েছিল। কিন্তু পরদিনই যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী রাজধানী তেহরানসহ কোম, কারাজ, কেরমানশাহ এবং খোররামাবাদ শহরের সামরিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত করে। মুহূর্তেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনি, নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সামরিক ব্যুরোর প্রধান, উপদেষ্টাসহ শীর্ষ নেতৃত্ব টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কূটনৈতিক আলোচনাকে কৌশলগত সময়ক্ষেপণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বমোড়লের স্বার্থের বেলায় আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ কিংবা মানবাধিকার কাঠামো কতটা অকার্যকর, অথর্ব হতে পারে, তা নতুনভাবে আবার দেখল বিশ্ববাসী।
সৈয়দ আলী হোসেইনি খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং আপোসহীন ইরানের উত্থান বিশ্বরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৯ সালে রুহুলুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরান প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ক্রমে অবনতি হয়। খামেনি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। শাসক গোষ্ঠীর দমন-পীড়নে একাধিকবার কারাবরণ করেন। ১৯৮১ সালে বোমা হামলায় গুরুতর আহত হয়ে তাঁর ডান হাত আংশিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাঁকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত করে। সেই থেকে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক ছিলেন। তাঁর শাসনামলে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত শক্তিতে রূপ নেয়। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ড্রোন প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক প্রতিরোধ বলয় গঠনে এই বাহিনী কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির মৃত্যু ইরানের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে। তবে খামেনি তাঁর নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসেননি। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ ও অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভের মধ্যেও তিনি প্রতিরোধকেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামোকে জোরদার করেন। এই আপোসহীন নীতি ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী পরাশক্তিতে পরিণত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে কঠোর নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন স্তরে গোয়েন্দা অনুপ্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
খামেনির আমলেই ইরান ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, মানববিহীন উড়োজাহাজ এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় অগ্রগতি অর্জন করে। রাশিয়া নির্মিত এস-৩০০ মিসাইল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং দেশীয় ‘বাভার-৩৭৩’–সহ বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা হয়। তবে সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য কিছু হামলা থেকে ইরানের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দাব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতিরক্ষা কাঠামো থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর সুরক্ষিত অঞ্চলে নিখুঁত আঘাত হানা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করে টার্গেট হত্যা পরিচালনা তাদের ভঙ্গুর গোয়েন্দাব্যবস্থার প্রমাণ। বিগত এক দশকে পরমাণুবিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক টার্গেট কিলিংয়ে এই দুর্বলতা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এ ছাড়া স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে ইরান বিগত সময়ে আক্রমণের সক্ষমতা বাড়ালেও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সমানভাবে শক্তিশালী করতে পারেনি।
ইরানের পররাষ্ট্রনীতি কৌশলগত প্রতিরোধ ও অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে প্রক্সি নেটওয়ার্ক, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও ভূকৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে। ইরানের অন্যতম কৌশলগত সম্পদ হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী প্রণালি নিয়ন্ত্রণে কড়া অবস্থান নিয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে; ইউরোপ ও এশিয়ায় জ্বালানিসংকট দেখা দিতে পারে। এদিকে খামেনির মৃত্যুর পর তেহরান ঘোষণা দিয়েছে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের। মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, আরব আমিরাত ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলা হয়েছে। ইসরায়েলের তেল আবিব, হাইফা ও জেরুজালেমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। একই সময়ে তেহরান, কোম, কারাজ ও কেরমানশাহে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও আঘাতের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন আঞ্চলিক সর্বাত্মক সংঘাতের দিকে অগ্রসর হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, খামেনি আগে থেকেই জানতেন, তিনি মূল লক্ষ্য। তাই লুকিয়ে থাকার কোনো বিশেষ পথ বেছে নেননি। হয়তো বিগত সংঘর্ষগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি উপযুক্ত উত্তরাধিকার নির্ধারণের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। এই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই ইরানের জন্য কল্যাণকর। বলা বাহুল্য, ইরানের রাষ্ট্রকাঠামো ব্যক্তিনির্ভর হলেও পুরোপুরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়; সেখানে সাকসেশন প্ল্যানিং ও শক্তিশালী ইনস্টিটিউশনাল নেটওয়ার্ক বিদ্যমান। তাঁর মৃত্যুতে ইরানে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে জানাজা, মাসব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক ও গণসমাবেশ শুরু হয়েছে। ইসফাহান, মাশহাদ, কোমসহ বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ রাজপথে নেমেছেন। ইউরোপ, এশিয়া এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল খোমেনি লিগ্যাসি ধ্বংস করার চেষ্টা করছে; অন্যদিকে ইরানে ক্ষমতা হস্তান্তর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনে ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ ভোট দেয়। জরুরি পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী কাঠামো গঠনের বিধান রয়েছে। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও দ্রুত রাজনৈতিক ঐকমত্য গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরাধিকার প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয়, তবে জেষ্ঠ্য পুত্র মোজতবা খামেনির নাম আলোচনায় এসেছে। বিপ্লবী গার্ড ও নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শক্তিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বড় বিতর্ক তৈরি করেছে। আর যদি আমেরিকা মনে করে, ব্যক্তি খামেনির মৃত্যু বা পরিস্থিতি বদলালেও ইতিহাস তাৎক্ষণিকভাবে বদলে যাবে, এমন নয়। ইতিহাস স্বীকৃত যে নেতার মৃত্যু হয়, আদর্শ নয়। তবে কৌশলগত সাময়িক সাফল্য মিলতে পারে। এই ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলার মতো করে ভাবলে ভুল হবে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি জটিল; এখানে প্রক্সি কনফ্লিক্ট, আইডিওলজিক্যাল ব্লক পলিটিকস, আঞ্চলিক মিত্রতা—সব একসঙ্গে কাজ করে। ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, সামরিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘ মেয়াদে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আনেনি; বরং মানুষের প্রাণ, সম্পদ ও অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে। সর্বশেষ মোটাদাগে খামেনির উত্তরাধিকার ছিল দ্বিমাত্রিক। একদিকে তিনি ইরানকে সামরিক ও কৌশলগত শক্তিতে পরিণত করেছেন; অন্যদিকে অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতায় চ্যালেঞ্জ রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যু ইরানের জন্য সংকট, তবে একই সঙ্গে পুনর্বিন্যাসের সুযোগও। নতুন নেতৃত্ব প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কাঠামো পুনর্গঠন করে বাস্তববাদী কৌশল নিলে ইরান আরও সংগঠিত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে। একটি বিষয় স্পষ্ট, খামেনির নেতৃত্বে ইরান এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যা আঘাত পেলেও আত্মসমর্পণকে কৌশলগত বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করে না। বিশ্বরাজনীতির দাবার বোর্ডে ইরান এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি; এখন কেবল নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]