default-image

ভ্রমণ ব্যাপারটা অনেক বেশি আনন্দদায়ক, আর সেটা যদি হয় দেশের বাইরে, তাহলে তো কথায় নেই। দেশের মধ্যে ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতা থাকলেও দেশের বাইরে কখনো ঘুরতে যাওয়া হয়নি। হিমালয়ের দেশ নেপাল ভ্রমণ ছিল আমার প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। অক্টোবরে আমাদের বিবাহবার্ষিকী, প্রতিবছর এই দিনটাকে কেন্দ্র করে আমরা দূরে কোথাও ঘুরতে যাই। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে ছিল আমাদের পঞ্চম বিবাহবার্ষিকী, ঠিক করলাম এবার দেশের বাইরে কোথাও যাব। এটা আমার প্রথমবার বিদেশ ভ্রমণ ছিল, আর আমাদের বাচ্চাটাও অনেক ছোট ছিল। তাই কাছাকাছি দেশ হিসেবে আমরা এভারেস্টের দেশ নেপালকেই বেছে নিয়েছিলাম। যেখানে যেতে উড়োজাহাজে সময় কম লাগবে, ভিসাসংক্রান্ত জটিলতাও কম হবে।

নেপাল ট্যুরে আমরা চারজন ছিলাম। আমরা দুজন, এক বছরের মেয়ে আর আমার দেবর। নেপাল যেতে আগে থেকে ভিসা লাগে না। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য অন এরাইভাল ভিসা। আগে থেকে প্লেনের টিকিট কেটে রাখতে হয়। বাংলাদেশ থেকে নেপাল যাওয়ার জন্য ইউএস–বাংলা, রিজেন্ট, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট রয়েছে। টিকিট আগেই কেটে রাখা ভালো, তাহলে দামটা একটু কম পড়বে। আমরা এক মাস আগে টিকিট কেটে রেখেছিলাম।

১৮ অক্টোবর সকাল ১০টায় বাংলাদেশ বিমানে আমাদের ফ্লাইট ছিল। প্লেনে আমরা ডান পাশের সারিতে সিট নিয়েছিলাম। কারণ, ডান দিকে বসলে প্লেন থেকে এভারেস্ট এবং মেঘের অসাধারণ একটা ভিউ দেখা যায়। ঢাকা থেকে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের ফ্লাইট শেষে দুপুর পৌনে ১২টায় আমরা কাঠমান্ডু ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম। এয়ারপোর্ট খুব বেশি বড় নয়, তবে বেশ সাজানো–গোছানো।  

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশিদের জন্য নেপালে অন এরাইভাল ভিসা। সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য নেপালে কোনো ভিসা ফি নেই। নেপালের ভিসা দুভাবে নেওয়া যায়, বাংলাদেশে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে অথবা নেপাল এয়ারপোর্ট নেমে সেখান থেকেও নেওয়া যায়। আমরা কাঠমান্ডু এয়ারপোর্ট থেকে ভিসা নিয়েছিলাম। ভিসার জন্য আমাদের একটু সময় লেগেছিল। যেহেতু নেপাল এয়ারপোর্ট খুব বেশি বড় নয়। অন এরাইভাল ভিসা হওয়ায় সেখানে অনেক মানুষের ভিড় ছিল। ভিসার জন্য পাসপোর্ট এবং ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে একটি ভিসা আবেদন ফরম পূরণ করতে হয়। তবে পাসপোর্ট যদি মেশিন রিডেবল হয়, তাহলে ভিসা প্রসেস করা আরও সহজ হয়। এটিএম বুথের মতো একটা মেশিন থাকবে, সেটার সামনে পাসপোর্ট ধরলে স্ক্যানিং হয়ে সব তথ্যসহ একটি কাগজ বের হয়। সেটাই ভিসা ফরম এবং অবতরণ কার্ড হিসেবে কাজ করে। ইমিগ্রেশনে ২–১টি প্রশ্ন করতে পারে, তবে তেমন কোনো ঝামেলা করে না। রিটার্ন টিকিট, হোটেল বুকিং পেপারস এগুলো সঙ্গে রাখা ভালো। মানি এক্সচেঞ্জ, সিম চেঞ্জ এগুলো এয়ারপোর্ট থেকেই করা যায়। ইমিগ্রেশন শেষে এয়ারপোর্ট থেকেই আমরা নেপালের সিম কিনে নিয়েছিলাম।

এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে বাইরে অনেক ট্যাক্সি ভাড়া পাওয়া যায়। ভাড়ার ব্যাপারে একটু দরদাম করে নিতে হয়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে একটা ট্যাক্সি ভাড়া নিয়ে আমরা হোটেলের উদ্দেশে রওনা দিলাম। হোটেল আগে থেকেই বুকিং দেওয়া ছিল। আমাদের হোটেল ছিল থামেলে, ‘হোটেল নেপালিয়া’। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের দূরত্ব ছিল ৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার, পৌঁছাতে আমাদের ২০ মিনিটের মতো সময় লেগেছিল। হোটেলে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ সেরে নিলাম। হোটেলে পৌঁছাতে আমাদের বিকেল ৪টা বেজে গিয়েছিল, তাই সেদিন কোথাও ঘুরতে পারিনি। লাঞ্চের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা সন্ধ্যার পর একটু বাইরে বের হয়েছিলাম। হোটেলের আশপাশে রাতের থামেল শহরটা একটু ঘুরে দেখলাম। আমাদের দেশের মতো এত হইহুল্লোড়, কোলাহল সেখানে ছিল না। তবে চারদিকে দুর্গাপূজার আয়োজন চলছিল। আমরা গিয়েছিলাম দুর্গাপূজার মৌসুমে, নেপাল যেহেতু হিন্দুপ্রধান দেশ। সেখানে মোট জনসংখ্যার ৮১ দশমিক ৩৫ শতাংশ হিন্দু, মাত্র ৫ শতাংশ মুসলিম। তাই দুর্গাপূজা তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। রাতের জন্য অল্প কিছু খাবার নিয়ে আমরা হোটেলে ফিরলাম। ফ্রেশ হয়ে ডিনার শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন ছিল আমাদের নেপাল ভ্রমণের প্রথম দিন।

default-image

ভ্রমণের প্রথম দিন

১৯ অক্টোবর সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা সেরে নিলাম। সকালের নাশতার ব্যবস্থা হোটেল থেকেই ছিল। নাশতা শেষে কিছু প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সেরে রেডি হয়ে আমরা বের হলাম। নেপালে যেহেতু মোট জনসংখ্যার বেশির ভাগই হিন্দু, তাই সেখানে মুসলমানদের জন্য হালাল রেস্তোরাঁর সংখ্যা খুব কম। আমরা দুর্গাপূজার মৌসুমে গিয়েছিলাম, পূজার কারণে বেশির ভাগ হালাল রেস্তোরাঁ বন্ধ ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমরা একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে লাঞ্চ সেরে নিলাম। তারপর আমরা থামেল শহরের আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে বের হলাম। প্রথমে গেলাম কাঠমান্ডু দুর্বার স্কয়ারে, মন্দিরগুলো ঘুরে দেখলাম। নেপালের প্রাচীন রাজা–বাদশাদের স্মৃতি, কিছু মূর্তি, ভাস্কর্য সেখানে সংরক্ষিত। পুরোনো অনেক মন্দির, মিউজিয়াম, গার্ডেন অব ড্রিমস, এ ছাড়া আরও অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে কাঠমান্ডুতে। ঘোরাঘুরি শেষে আমাদের হোটেলে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেল। রাতের খাবার আমরা বাইরে থেকে এনে খেয়েছিলাম। হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে ডিনার সেরে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম।

ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন

পরদিন সকাল ৭টায় আমাদের পোখারার বাস ছিল। টিকিট এক দিন আগেই কেটে রাখা হয়েছিল। পোখারা হচ্ছে নেপালের সবচেয়ে সুন্দর শহর। থামেল শহর থেকে পোখারার দূরত্ব ২০৪ কিলোমিটার। বাসে থামেল থেকে পোখারা যেতে সময় লাগে ৭–৮ ঘণ্টা। প্লেনেও যাওয়া যায়। আমরা বাসেই গিয়েছিলাম। কারণ, বাসে গেলে রাস্তার দুই পাশের সুন্দর মনোরম দৃশ্যটা দেখা যায়।

২০ তারিখ সকাল ৭টায় আমদের বাস ছিল। খুব ভোরে হোটেল থেকে চেক আউট করে বেরিয়ে পড়লাম। বাস কাউন্টারে যাওয়ার জন্য আগের দিন রাতেই রিকশা বুকিং দেওয়া ছিল। ট্যাক্সি দিয়েও যাওয়া যেত। কিন্তু আমরা শখের বশে নেপালি রিকশায় উঠেছিলাম। থামেল শহরে রিকশা অনেক কম। স্থানীয় লোকজন কাছাকাছি দূরত্ব হলে পায়ে হেঁটেই চলে। সোয়া ৭টায় পোখারার উদ্দেশে বাস ছাড়ল। বাসের জানালা দিয়ে রাস্তার দুই পাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছিল নজরকাড়া। কোথাও উঁচু পাহাড়, পাহাড়ের ওপর দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা। মাঝেমধ্যে পাহাড় থেকে ঝরনার সৃষ্টি হয়েছে, কোথাও আবার সেই পাহাড়ি ঝরনার পানি নেমে ছোট ছোট নালার সৃষ্টি হয়েছে। বেলা ৩টার দিকে আমরা পোখারা পৌঁছালাম। বাসে পথিমধ্যে দুবার যাত্রাবিরতি দিয়েছিল, এ জন্য ৭–৮ ঘণ্টার বাস জার্নিতে তেমন কষ্ট অনুভব হয়নি। বাস থেকে নেমে ট্যাক্সি নিয়ে আমরা হোটেলে গেলাম। হোটেল আগে থেকেই বুকিং দেওয়া ছিল। আমাদের হোটেল ‘The Mount View’ বাস স্টপেজ থেকে বেশি দূরে ছিল না। বিকেল ৪টায় হোটেল রুমে পৌঁছালাম। কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বাইরে বের হলাম। যেহেতু, সারা দিন তেমন কিছুই খাওয়া হয়নি। তাই আমরা একটা হালাল রেস্তোরাঁ খুঁজে সেখানে খেয়ে নিলাম। পোখারাতে অনেক হালাল রেস্তোরাঁ আছে, একটু খুঁজলেই পাওয়া যাবে। খাওয়া শেষ করে গেলাম পরের দিনের ভ্রমণ প্যাকেজ নিতে। পোখারাতে অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা রয়েছে ঘুরে দেখার। উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলো ঘুরে দেখার জন্য প্যাকেজ আছে। আমরা ভালোমতো দেখেশুনে একটা প্যাকেজ নিয়ে নিলাম। তারপর রাতের জন্য কিছু হালকা খেয়ে হোটেলে ফিরলাম।

default-image
বিজ্ঞাপন

পোখারা ও সারাংকোটে এক দিন

পরের দিন ভোর ৫টায় আমরা ট্যাক্সিতে সারাংকোট রওনা দিলাম। ট্যাক্সি ভাড়া প্যাকেজের মধ্যেই ছিল। সারাংকোট পোখারার একটা জায়গার নাম। মূল পোখারা থেকে ৪৫ মিনিটের দূরত্বে জায়গাটা পাহাড়ের অনেক উঁচুতে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০০ মিটার উঁচুতে। ট্রেকিং ব্যতীত পোখারা শহর থেকে এভারেস্ট দেখার জন্য সব থেকে সুন্দর স্থান সারাংকোট। বলা যায়, প্রকৃতি তার রূপ, রং সব মেলে ধরেছে এই ছোট এলাকাটাতে। এখানে বিভিন্ন উচ্চতায় কিছু স্টেশন বা পয়েন্ট রয়েছে, সেগুলোর ওপর দাঁড়ালে সূর্যোদয় দেখা যায়। ওখান থেকে এভারেস্টকে খুব কাছে মনে হচ্ছিল। এভারেস্টের চূড়ায় যখন সূর্যের প্রথম আলো পড়ে চিকচিক করছিল, অসম্ভব সুন্দর ছিল সে দৃশ্য। এমন মায়াময় সূর্যোদয় দৃশ্য এর আগে কখনো দেখিনি। সূর্যোদয় দেখা শেষে আমরা আরও কয়েকটি জায়গা যেমন: বিন্দুবাসিনী টেম্পল, মাহেন্দ্র কেভ, ব্যাট কেভ ঘুরে দেখলাম। তারপর হোটেলে ফিরে সকালের নাশতা সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার বের হলাম। আরও কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে তারপর গেলাম স্তুপা মন্দির দেখতে।

পিস স্তুপা হচ্ছে পোখারার একটা পুরোনো বৌদ্ধ মন্দির। পাহাড়ের অনেক উঁচুতে মন্দিরটি। এখান থেকে পুরো পোখারার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুব সুন্দর উপভোগ করা যায়। ট্যাক্সিতে করে স্তুপার নিচে পৌঁছালাম। হেঁটে ওপরে উঠতে হয়। পাহাড়ের ওপর সিঁড়ি দিয়ে রাস্তার মতো তৈরি করা আছে, এই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা বেশ কষ্টসাধ্য। মন্দিরটি পাহাড়ের অনেক উঁচুতে। আমাদের সঙ্গে ১ বছরের বাচ্চা ছিল, তাই আমাদের উঠতে অনেক কষ্ট হয়েছিল। পিস স্তুপায় দাঁড়িয়ে পুরো পোখারা শহরকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল। স্তুপা মন্দিরটি ফেওয়া লেকের পাশেই অবস্থিত, এখান থেকে ফেওয়া লেকের সুন্দর কারুকাজ করা কাঠের নৌকাগুলো দেখা যায়। দেখতে ছোটবেলায় কাগজের যে খেলনা নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসাতাম, অনেকটা সে রকম লাগছে। পিস স্তুপা থেকে হিমালয়ও খুব সুন্দর দেখা যায়। হিমালয়ের চূড়ায় সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছিল, দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল সে দৃশ্য। মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতি তার সব সৌন্দর্য এই পোখারাতেই ঢেলে দিয়েছে।

পিস স্তুপা থেকে ফিরে গেলাম পোখারা ন্যাশনাল মিউজিয়াম দেখতে। পোখারার কেন্দ্রস্থলে মিউজিয়ামটি। এই মিউজিয়ামের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এতে পর্বতারোহণের কলাকৌশল, বিশ্বব্যাপী প্রধান পর্বতমালার তথ্যগুলো, পর্বতমালার ভৌগোলিক অবস্থান, বিশ্বব্যাপী পর্বতারোহীদের ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি, পোশাক-আশাক এবং আরোহণের ইতিহাস প্রদর্শন করা আছে। মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে আমরা ফেওয়া লেকের পাশেই ‘লাযিয’ নামে একটি হালাল রেস্তোরাঁ আছে, সেখানে লাঞ্চ সেরে নিলাম, যদিও ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল হয়ে গেছে। এখানকার খাবারটা বেশ সুস্বাদু ছিল, কিছুটা বাঙালি স্বাদের। লাঞ্চ শেষ করে আমরা গেলাম ফেওয়া লেকে।

ফেওয়া নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম লেক। চারদিকে উঁচু পাহাড়, মাঝখানে লেকটির অবস্থান। লেকের এক পাশে কুইন ফরেস্ট নামে পরিচিত একটি ঘন জঙ্গল আছে। ফেওয়া লেকের পানি সম্ভবত হিমালয়ের বরফগলা পানি, খুবই স্বচ্ছ পানি। পোখারা শহরের অনেক মানুষ এই লেকের পানিই দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে থাকে। লেকের মধ্যে সুন্দর ডিজাইন করা নানা রঙের কাঠের নৌকা পাওয়া যায়। লেক ঘুরে দেখার জন্য এ নৌকাগুলো ভাড়ায় চালিত হয়। আমরাও লেকে নৌকায় ঘুরলাম।

ফেওয়া লেকের মাঝে একটা দ্বীপের মতো আছে, যার নাম বারাহী টেম্পল। নৌকায় কিছুদূর যেতেই শুরু হলো বৃষ্টি, বিকেলবেলা তার ওপর বৃষ্টির পানি খুবই ঠান্ডা ছিল। আমাদের নৌকায় ছাউনিও ছিল না। তবে বৃষ্টি হলেও চারপাশের আবহাওয়াটা খুব সুন্দর উপভোগ্য ছিল। তেমন মেঘাচ্ছন্ন না, পড়ন্ত বিকেলে আধো আধো সূর্যের আলো খেলা করছিল, সঙ্গে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগলেও বৃষ্টিতে ভিজে লেকে ঘুরতে বেশ মজাই লাগছিল, এমনকি আমাদের ১ বছরের বাচ্চা মেয়েটাও খুব উপভোগ করছিল। ফেওয়া লেকে ঘোরাঘুরি শেষে আমরা হোটেলে ফিরলাম। ফ্রেশ হয়ে ডিনার সেরে ঘুমিয়ে গেলাম। পোখারায় আমরা যে হোটেলে ছিলাম, সেখানে হালাল খাবার না থাকায় আমরা বাইরে থেকে এনে খেয়েছিলাম। পোখারাতে ঘোরাঘুরি আমাদের এখানেই শেষ ছিল। পরদিন সকাল সাড়ে ৭টায় ছিল আমাদের কাঠমান্ডুর বাস।

এবার গন্তব্য নাগোরকোট

পরের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে সবকিছু গোছগাছ করে ট্যাক্সিতে বাস কাউন্টারে পৌঁছালাম। বাস কাউন্টার হোটেল থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না। সকাল ৭টায় কাউন্টারে পৌঁছালাম, ৩০ মিনিট পরেই বাস ছাড়ল। বিকেল ৪টার দিকে কাঠমান্ডু পৌঁছালাম। পথে দুবার যাত্রাবিরতি ছিল। আমাদের গন্তব্য নাগোরকোট। কাঠমান্ডু পৌঁছে সেখান থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে নাগোরকোটের উদ্দেশে রওনা হলাম। কাঠমান্ডু থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট একটি গ্রাম নাগোরকোট। এটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ১৭৫ মিটার উঁচুতে এ গ্রামটি। কাঠমান্ডু থেকে নাগোরকোট যেতে পাহাড়ের ওপর দিয়ে যে উঁচু-নিচু রাস্তা, তাতে দিনেরবেলা কোনো দুর্বলচিত্তের মানুষ যাতায়াত করলে নিশ্চিত ভয় পেয়ে যাবেন। তবে সেখানকার মনোরম প্রকৃতি এবং পাহাড়ি সৌন্দর্য যে কাউকে আকর্ষণ করবে। আমরা গিয়েছিলাম পড়ন্ত বিকেলে, তাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যটা আরও বেশি উপভোগ্য ছিল। নাগোরকোটে থাকার জন্য অনেক হোটেল আছে, আমরা ছিলাম ‘হোটেল মাইস্টিক মাউন্টেনে’, এটি নাগোরকোটের সব থেকে ভালো হোটেলগুলোর মধ্যে একটি। আগেই বুকিং দেওয়া ছিল। হোটেলের ডেকোরেশন এতটাই সুন্দর ছিল যে সেখানে পৌঁছে সারা দিনের ক্লান্তি ভুলে গিয়েছিলাম।

মাটি থেকে ৭ হাজার ২০০ ফিট উচ্চতায় সুউচ্চ পাহাড়ের ওপরের এ হোটেলের চারপাশে সবুজ গাছপালা, মেঘ আর পাহাড়ের সমন্বয়ে প্রকৃতির সবটুকু সৌন্দর্য সেখানে বিরাজমান। হোটেল রুমের সঙ্গে বড় একটা খোলা ব্যালকনি ছিল। সেখান থেকে রাতেরবেলা জ্যোৎস্নাভরা চাঁদের আলো সঙ্গে হালকা কুয়াশা, ভোরের সূর্যোদয়ের দৃশ্য অসাধারণ ছিল। খুব ভোরে সূর্যোদয়ের সময় পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যের আলো পড়ায় আশপাশের সবকিছু সোনালি বর্ণ ধারণ করেছিল। নাগোরকোটে তেমন কিছুই দেখার নেই, পাহাড় ছাড়া। হোটেলটা অনেক বেশি খোলামেলা ছিল, হোটেল এরিয়াটাও অনেক বড় ছিল। হোটেলের ডেকোরেশনটাও ছিল নজরকাড়া। হোটেলের বারান্দা থেকে এভারেস্টের ভিউটাও ছিল অসাধারণ। পরের দিন পুরো হোটেলটা ঘুরে দেখলাম। বাকিটা সময় বিশ্রাম নিয়েই কাটিয়ে দিলাম।

বিজ্ঞাপন
default-image

পরের দিন (২৪ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টায় ছিল কাঠমান্ডু থেকে ঢাকার ফ্লাইট। নাগোরকোটে হোটেলের বাইরেই ট্যাক্সি ভাড়া পাওয়া যায়। সকালবেলা হোটেল থেকে নাশতা সেরে ১০টায় এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হলাম। সাড়ে ১১টায় পৌঁছালাম। ইমিগ্রেশনের কাজ শেষে প্লেনে উঠলাম। সাড়ে ১২টায় ছাড়ল, বেলা ২টার দিকে আমরা ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছালাম।
সবশেষে বলতে হয়, নেপাল ভ্রমণের দিনগুলো বেশ ভালোই কেটেছিল। পর্যটন স্থানগুলো একটা থেকে আরেকটার দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় ঘোরাঘুরির থেকে জার্নিটা একটু বেশিই হয়ে যায়। তবে নেপালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসম্ভব সুন্দর, যা খুব সহজেই পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। পোখারা, সারাংকোট, নাগোরকোটের সৌন্দর্য নজরকাড়া, যা বর্ণনা করে প্রকাশ করার মতো নয়। সাত দিনের এই নেপাল ট্যুরই ছিল আমার প্রথমবার বিদেশ ভ্রমণ। প্রথম বিদেশযাত্রা হিসেবে অভিজ্ঞতাটা অসাধারণ ছিল।

মন্তব্য করুন