default-image

২০২০ সাল বরাবরের মতো শুরু হলেও শেষ অবধি ভয়াবহ রূপে নিজেকে চিনিয়েছে। পৃথিবীর সব মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে বিষফোড়া। লকডাউনের আওতায় তাই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ রাখতে হয়েছে বাধ্য হয়েই। স্বাভাবিকভাবেই বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে করোনা সংক্রমিত হওয়ার যথেষ্ট ঝুঁকি ছিল। ঝুঁকির পেছনে যথেষ্ট কারণও ছিল। ক্লাসরুমে যথাসম্ভব সামাজিক দূরত্ব, স্যানিটাইজিংয়ের মতো ব্যাপারগুলো অনুশীলন সম্ভব হলেও শিক্ষার্থীদের থাকার হল বা মেসে তা কোনো দিন সম্ভব ছিল না। গণরুমে ঠাসাঠাসি করে ১৫ জন, মেসে ২ রুমে ১১ জন কোনোভাবেই করোনা নিয়ন্ত্রক বা সংক্রমণ প্রতিরোধের মতো অবস্থা নয়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের তখনকার সিদ্ধান্ত অবশ্যই যৌক্তিক ছিল। দুভার্গ্যবশত সেই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত আজও রূপ বদলায়নি, বরং অপরিবর্তনীয় অবস্থায় প্রতিনিয়ত ধ্বংসের মুখে ফেলছে হাজারো শিক্ষার্থীর লালিত স্বপ্নকে। ফলে এক সময়কার পূর্বপরিচিত শব্দ ‘সেশনজট’ শিক্ষার্থীদের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।

প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক পড়াশোনার স্বাভাবিক গতিধারা ব্যাহত হওয়াই সেশনজট৷ বৈশ্বিক মহামারি করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ, তাই সেশনজটের প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসছে। সম্ভাব্য সেশনজটের কথা মাথায় রেখে এখনই উচিত সেশনজট সমস্যা সমাধানে পরিকল্পনা প্রণয়ন। বিশেষ করে একাধিক ভাবনার বিকল্প নেই, যাতে কোনো প্ল্যান বিফলে গেলে অন্যটি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজে লাগানো যায়। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের জন্য অন্তরায় বিষফোড়ার মতো সৃষ্টি হওয়া এ সমস্যা। বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যতেও সেশনজটের প্রভাব নেতিবাচক। তাই এ সমস্যা সমাধানে সৃজনশীল সমাধান প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই।

পাঁচ-সাত মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পর বাধ্য হয়েই চালু করতে হয় অনলাইন ক্লাস। এর আগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর কার্যক্রমে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের নানা দুরবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। জাতির ক্রান্তিলগ্নে অনেক নামধারী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এক পয়সা ছাড় দেওয়ার মতো মানবিক মানসিকতা দেখাতে পারেনি। নিশ্চয়ই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের দুরবস্থা সৃষ্টি হয়নি বা হওয়াটাও অস্বাভাবিক ছিল। প্রশাসন নানা ধরনের বিষয়ে দেরিতে হলেও যথেষ্ট ছাত্রবান্ধব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটে জীবন গুছিয়ে নেওয়া অগ্রজেরা তরুণদের দেখিয়েছেন আলোর পথ। পাশে দাঁড়িয়েছে আপন ভাইয়ের বেশে, যেন যুগ থেকে যুগান্তরের মেলবন্ধন। পরের দিকে সমস্যাগুলো গুছিয়ে নেওয়া গেলেও শুরুর দিকে নানা দুরবস্থায় পড়তে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। টিউশনি বন্ধ, তাই অর্থনৈতিক সংকট বাসা বাঁধে। এমতাবস্থায় ইন্টারনেট কেনাও অনেকের জন্য কঠিনতর কাজ ছিল। কেনা অবধি সমস্যা সীমাবদ্ধ হলেও মানা যেত। প্রায় ২০ শতাংশের বেশি গ্রামাঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের শুধু সংযুক্ত হওয়ার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ির বাইরে থেকে অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হতে হয়েছে।

default-image

ধরা–ছোঁয়া কিংবা স্পর্শ ছাড়া এ কার্যক্রম পরিস্থিতির স্বার্থে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই মানা উচিত। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলার বাস্তবমুখী শিক্ষা অনলাইন ক্লাস শিখিয়েছে, এটা বিশ্বাস করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। দুর্ভাগ্যবশত নানা জটিলতায় যে সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের এ মহামারির সময়েও ভোগান্তি বাড়িয়েছে কয়েক গুণ। কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট প্যাকের কথা মাথায় রেখে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে স্বল্পমূল্যে সিমের ব্যবস্থা করেছে, যা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। ফোন কেনার জন্য ইউজিসির ‘সফটলোন কার্যক্রম’ যথেষ্ট সময়োপযোগী ছিল। সব ছাপিয়ে ইন্টারনেটের ধীরগতি, নিজ পায়ে পথচলা শিক্ষার্থীদের আয়ের উৎস বন্ধ হওয়া (বিশেষত টিউশনি) এবং পরীক্ষা দিনের পর দিন পিছিয়ে যাওয়া বড় রকমের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান সময়ে। সব মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিকূল হয়ে যাচ্ছে চলমান এ অবস্থা।
খুব সহজেই অনেকে বলবেন, পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে অনলাইনে পরীক্ষার আয়োজন হোক। আমি তো ‘না’ বলবই, পাশাপাশি হাজারো শিক্ষার্থী সুর মেলাবে আমার কণ্ঠে, এটাই বাস্তবতা। ইন্টারনেট–কেন্দ্রিক নানা জটিলতা থাকায় কখনোই এটা কার্যকর সমাধান হতে পারে না। এমনকি বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইউজিসি শুরু থেকেই অনলাইনে পরীক্ষার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যেটা খুবই ইতিবাচক। পাশাপাশি অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রমের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর কারণ আমরা অনলাইন ব্যবস্থাপনায় নতুন। দূর থেকে কাছে আসার গল্পগুলো তাই জমে উঠছে না। শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিক বোঝাপড়ায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে। যেটা অবশ্যই অত্যন্ত হতাশাজনক বিষয়।

বিজ্ঞাপন

পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবারও লকডাউন দেওয়া হয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বাংলাদেশ আবার হুমকির মুখোমুখি। স্বভাবতই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়েও নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে, যদিও পূর্বনির্ধারিত ঘোষণা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আর এক মাসের মতো বাকি। লকডাউন কতটা যৌক্তিক ও সময়োপযোগী, সেটাও বলেছি। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখাও যৌক্তিক পরিস্থিতির স্বার্থে। কিন্তু জীবন তো এভাবে চলতে পারে না। তাই নতুন করে ভাবনার বিষয়টি দাঁড়িয়েছে নতুন মাত্রায়। ‘অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ সঠিক’—এ দুইয়ের মেলবন্ধনে প্রশাসনের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন নিঃসন্দেহে। শত বাধার মুখেও যে কিছু একটা করতেই হবে। জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন এখানে সরাসরি জড়িত, তাই হেলাফেলার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। সমাধান হিসেবে সময় কমিয়ে প্রতিটি বর্ষের জন্য এক মাস অন্তর অন্তর পরীক্ষাগুলো নেওয়ার বিষয়ে ভাবা উচিত৷ যেমনটা মাস্টার্সে আটকে থাকা শিক্ষার্থীদের চাকরি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য করা হয়েছিল।

আলাদা আলাদা বর্ষ বিবেচনায় নিলে চাপ অনেকাংশে কমানো সম্ভব, স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে খুব একটা বড় সমস্যায় পড়তে হবে না। শিক্ষার্থীরা জাতির অন্যতম সচেতন সন্তান, তাই নিজেরাই সতর্ক থাকবে। সর্বোপরি যত দ্রুত সম্ভব হয়, তত দ্রুত শিক্ষার্থীদের টিকার আওতায় আনা হোক। এতে টিকার সচেতনতা কার্যক্রম যেমন ফ্রিতে হবে, তেমনি আগামীর কর্ণধারেরা থাকবে ঝুঁকিমুক্ত। শিক্ষামন্ত্রী বেশ কয়েকবার ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় আমাদের দেরি হচ্ছে, এটাও বুঝতে হবে। বর্তমান সময়ে রাশিয়ার সঙ্গেও টিকা উৎপাদন নিয়ে চুক্তি হয়েছে। ইতিবাচক এই জনকল্যাণমুখী কূটনীতিক সফলতার বাস্তব ফলাফল যেন ছাত্রসমাজ ভোগ করতে পারে, সে বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সেশনজট মোকাবিলা ও প্রতিষ্ঠান খোলার লক্ষ্যে এটা অত্যন্ত সময়োপযোগীভাবে একধাপ অগ্রগামী হওয়ার শামিল।

এতে রক্ষা পাবে হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন। তাঁদের আর পড়াশোনা ছেড়ে পেশা স্থানান্তর করতে হবে না, বরং টিউশনির মাধ্যম তৈরি হবে আয়ের সুদৃঢ় এক পথ।
নানা দুরবস্থায় সবাই বন্দী। এর ফলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আটকে থাকলেও কিছু হয়তো করার নেই। মানুষ সচেতন যদি হয়, তাহলে অবশ্যই ভয়ার্ত এই পরিস্থিতির চাপ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। মিডিয়ায় চোখ রাখলেই বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই। ফলাফল পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রয়োজনীয় অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগুলোর ছুটি তাই বার বার দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সচেতনতার বিকল্প নেই। এ বিষয়ে জাতিগত ঐক্যবদ্ধতার বিকল্প কোথায়?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা কতটা সমস্যার জন্ম দিচ্ছে, তা সম্পর্কে সবাই অবগত। গণসচেতনতা, শিক্ষার্থীদের টিকা কার্যক্রম বা পর্যায়ক্রমিকভাবে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে এখনই ইউজিসি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া উচিত। হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্তে যেন বিভ্রান্ত না হন শিক্ষার্থীরা, সেটাই কাম্য। পরিস্থিতি হোক ভালো, সূর্যের মতো এগিয়ে যাক জাতিকে আলোকিত করা প্রতিষ্ঠানগুলো। খুলুক রুদ্ধদ্বার, ধ্বংস হোক করোনার ভয়াবহ জাল।

*লেখক: অনন্য প্রতীক রাউত, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আয়োজন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন