default-image

বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে তেমন চা খেতাম না। এখন বাসায় নিয়মিত চা খাই। বিকেল কাটতে চায় না। সময় কাটাতে কয়েকবার চা খাই। ভালো লাগে। চা খেলে কেমন জানি আনমনা একটা ভাব চলে আসে।
দরজা খোলা রেখে সোফায় বসে চা খাচ্ছি। পাশের বাসার ভাবি বলল, বাসায় আর কত। ফ্লোরের সবাই মিলে ছাদে আড্ডা দেই চল। উত্তম প্রস্তাব। করোনায় নিরাপদ দূরত্বের বিষয়টা ভুললাম না। আমরা ঠিক করলাম বিকেলে যার যার চা বানিয়ে নিয়ে যাব। চেয়ারে গোল হয়ে বসব। তারপর চা খেতে খেতে খেতে চলবে বৈকালিক আড্ডা।
আমরা চারজন বসেছি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। গোল হয়ে বসেছি। মাঝখানে চা রাখার টেবিল। পাশের ছাদেও মানুষ দেখা যাচ্ছে। কিছু বিল্ডিংয়ের ব্যালকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট শিশুরা। স্কুল বন্ধ। ঘরবন্দী সময়ে ব্যালকনি দিয়ে পৃথিবী দেখে।
আড্ডায় ঘুরেফিরে নানান বিষয় আসে। একদিন ঠিক করলাম করোনাকালে আমাদের উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে কথা বলব।
প্রথমে শুরু করলেন এক আন্টি। তিনি বড় চাকরি করেন। তিনি বলেন, আমি তখন অন্য এলাকায় থাকতাম। বড় চাকরি করি। পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি গৃহিণী। চাকরি করত না। আমি মাঝেমধ্যে তাঁকে টিটকারি মারতাম। থাকেন তো সারা দিন বাসায়। স্বামী রোজগার করে। চাকরির প্যারা নাই। আপনাদের তো সুখ ভাবি। ভাবি তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাত না।
ঈদের আগের দিন ভাবি তাঁর ঈদের শাড়ি দেখাতে এল। আমি দেখে আবারও টিটকারি মারলাম। আপনাদের কপাল ভাবি। সারা দিন বাসায় থাকেন। আমরা চাকরি করেও আপনার মতো দামি শাড়ি কিনতে পারি না। আমি কখনো সেভাবে বাসার কাজ করিনি। বিয়ের আগে মা করত। বিয়ের পর বুয়া আছে। সমস্যা হয় না। এবার করোনায় সব হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। বুয়া রাখার উপায় নাই। নিজেকে সব করতে হতো। আমার ভাবনাতেও ছিল না একটা বাসায় এত কাজ-কর্ম থাকতে পারে!
চাকরি পরিশ্রমের। কিন্তু চাকরিতে একটা শান্তি আছে। একটা সময়ে চাকরি শেষ হয়। কিন্তু বাসায় কাজের কোনো শেষ নাই। পুরুষেরা তো এমনিতেও নারীদের বাসার কাজের গুরুত্ব দেয় না। আমি একজন চাকরিজীবী হয়েও কিন্তু নারীদের টিটকারি মারতে ভুলি নাই। সেদিন ওই ভাবিকে ফোন করে সরি বলেছি।

বিজ্ঞাপন

আন্টির কথা শেষ হলে আমি আবার কাপে চা ঢাললাম। প্রত্যেকের কাপে চা ঢেলে নিজের কাপে চুমুক দিলাম। চা খেতে খেতে আবার আমরা উদাসীন হয়ে চারপাশের ভবনগুলোর দিকে চোখ বুলালাম। এবার শুরু করলেন সামনের ফ্ল্যাটের ভাইয়া। সম্প্রতি তিনি প্রথম সন্তানের বাবা হয়েছেন।
তিনি শুরু করলেন। জানেন তো করোনা বয়স্কদের জন্য বেশি ভয়ানক। তাঁদের বেশি ঝুঁকি। বাবাকে কোনোভাবে বাসায় আটকিয়ে রাখা যায় না। এই ছুঁতো সেই ছুঁতো দিয়ে বাইরে যেতে চায়। একদিন নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। ইচ্ছামতো বকাঝকা করলাম। আব্বা চুপ হয়ে গেলেন। কিন্তু আমার রাগ কমছে না। বাবাকে দেখলে আরও বেশি মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। এত বোঝাচ্ছি। বোঝে না কেন সে। তাঁর ভালোর জন্যই তো বলছি। রাতে খেয়ে আব্বা-আম্মা ঘুমাতে গেল। আব্বা চোখের আড়াল হওয়া মাত্র আমার চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল। রাতে কোনোভাবে ঘুম আসে না। পুরো রাত ঘুমাতে পারিনি। সেদিন বুঝলাম ছোটবেলায় আব্বার শাসনে শুধু শাসন দেখেছি। তারপর যে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হতো তা এখন বুঝতে পারছি। সেই বয়সে আব্বা শাসনের পর আদর করতে পারত। আমার এমন বয়স, আব্বার কপালে চুমু খেয়ে সরি বলব সেটাও পারি না!
ভাইয়ার পর দক্ষিণের ফ্ল্যাটে আপু শুরু করলেন। জানেন নিশ্চয়ই করোনায় বিয়ের ধুম পড়েছে। আমরাও চিন্তা করলাম ছোট ভাইটার বিয়ে দেই। আগে একবার বিয়ে হয়েছে। ডিভোর্স হয়ে গেছে। আমার ভাই বলে সাফাই গাচ্ছি না। আমার ভাইয়ের আসলে তেমন দোষ ছিল না।

default-image

এটা মেয়ের পক্ষও মানে। তো আমরা এবার ভাইয়ের জন্য একটা মেয়ে খুঁজে পেলাম। কিন্তু মেয়েটারও আগে একবার বিয়ে হইছিল। আমরা মেয়েটার ভালোমতো খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম মেয়েটা খুব ভালো। কিন্তু আমার ভাই তাঁকে বিয়ে করবে না। তাঁর কথা হলো, এত ভালো হইলে ডিভোর্স হইলো কেন? আমি ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করব না।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আমি দেখতে পাচ্ছি আড্ডার পরিবেশ ভারী হয়ে যাচ্ছে। তাই হেসে জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কি আমার কথা শুনবেন না?
তাঁরা হেসে বলল, তাই তো! এই দেখ, আমরাও ইয়াং জেনারেশনকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। নিজেদের গল্প বলে খালাস! শুরু কর তুমি।
আমি কী বলব। আমি আসলে এক সপ্তাহ যাবৎ খুব স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছি। ভার্সিটি জীবন প্রায় শেষ হয়ে গেল। স্কুলের দিনগুলো খুব মনে পড়ছে। স্কুলের ফেসবুক পেজে লাইক দেওয়া আছে। স্যাররা দেখলাম অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন। স্কুলের পর তো কোনো দিন স্যারদের ক্লাস পাইনি। এখন অনলাইনে স্যারদের ক্লাস দেখছি। সেই গলার স্বর। সেই পড়ানোর স্টাইল। আহা! আমার হারানো শৈশবের ফিরে আসা!
*শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0