default-image

এখন অনেকেই জানেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কতখানি এগিয়ে গেছে। কয়েক বছর পরেই হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হতে পারে আমাদের জীবনযাপনের মুখ্য উপাদান।

মানুষ-প্রকৃতি। সবচেয়ে সুরেলা, সুশোভিত যুগলবন্দী!

সেই প্রকৃতির ভারসাম্যের জন্য নানা উপাদানের পরিমিতি দরকার হয়। গাছ তাদের অন্যতম। পৃথিবীকে টিকে থাকার জন্য, বসবাসের উপযোগী রাখার জন্য সবুজের সমারোহ অপরিহার্য। সবুজ কমে গেলে যেমন বিপদ, আবার তার অতিরঞ্জনও কাম্য নয়। সে জন্য বৃক্ষরোপণও বিজ্ঞান মেনে করতে হয়। অপরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ যেমন ঠিক নয়, তেমনি মাটি বা পরিবেশের ক্ষতি করে, এমন কোনো গাছও লাগানো উচিত নয়। সূর্যের আলোয় গাছের ছায়া কোনো দিকে, কোনো জমিতে, কোনো বাড়িতে কতক্ষণ পড়ে থাকবে, তার হিসাব-নিকাশ মানুষ প্রাচীনকাল থেকে করেই গাছ লাগিয়ে আসছে। শরীরে-মাথায় বড় হয়, ঝাঁকড়া হয়, এমন গাছগুলো কোথায় রোপণ করা ঠিক হবে, সে চিন্তাও তারা গভীরভাবে করত। কখনো কখনো কোনো প্রাচীন ধারণাও সুদীর্ঘকাল ধরে যুগোপযোগী থাকতে পারে। রোপিত গাছগুলো যাতে বড় হয়ে, ছায়া ফেলে পাশের জমিটিকে অনাবাদি করে না ফেলে, যাতে কৃষক বা গৃহীর ক্ষতি না হয়ে যায়, সেটা খেয়াল রাখা যথেষ্ট জরুরি। সভ্যতার শুরু থেকেই বাড়ির পাশে গাছ লাগাতে গেলে খেয়াল রাখা হতো যেন বাড়িটা অর্ধেকবেলা অন্তত রোদ পায় আর বাকি সময়টা ছায়ায় থাকে। রোদ ও ছায়া দুটোই জীবনের জন্য অপরিহার্য। কোনো জমি বা বাড়ির দক্ষিণে গাছ লাগালে সেই গাছের ছায়া সারা দিন ওই জমি বা বাড়ির ওপরেই পড়ে থাকবে। পুকুরের ধারে গাছ লাগাতেও সতর্ক থাকতে হয় যাতে, গাছের পাতা পড়ে পানি বিষাক্ত হয়ে না যায়। সেসব চিন্তা এখন কেউ করে না, শুধু সস্তা বুলি—‘গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান’। শুধু বনজঙ্গল, গাছপালাই যদি যথেষ্ট হতো, তবে প্রকৃতিতে এত বিশাল সমুদ্র, নদী, জলাধার কিংবা বিস্তীর্ণ মরুভূমি, দিগন্তব্যাপ্তী সাভানা কিংবা আকাশছোঁয়া পাহাড়–পর্বতের দরকার পড়ত না।

বিজ্ঞাপন

শুধু বৃক্ষরোপণ করে বৈশ্বিক উষ্ণতা দূর করা সম্ভব নয়, এটা একটা অবৈজ্ঞানিক ধারণা। এই উষ্ণতাযোগের অনেক কারণ আছে। সেসব অনেকেই জানেন, আবার অন্তর্জালে ঢুকলেও বিস্তর তথ্য পাওয়া যাবে। পৃথিবীর সব জমিতে চাষবাস বন্ধ করে কেবল বৃক্ষরোপণ করলে অনাহারে থাকতে হবে, নতুবা নভোচারীদের মতো কৃত্রিম কোনো ট্যাবলেট গিলে রাত-দিন গুজরাতে হবে! ইদানীং অবস্থা এমন যে অপরিকল্পিতভাবে রোপণ করা গাছের ছায়া পড়ায় কৃষক নিজ বাড়ির উঠানেই রোদের অভাবে ধান, পাট বা খড় শুকাতে পারে না। এ কারণে পাকা রাস্তায় সেসব শুকাতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। শুধু তা–ই নয়, শীতের দিনে এখন গ্রামে বয়স্ক, অসুস্থ বা শিশুদের জন্য মাদুর পেতে রোদ পোহানোর সামান্য জায়গাও কোথাও খুঁজে পাওয়া কঠিন।

আমাদের দুর্ভাগ্য, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন বা গ্রামে-গ্রামে যাঁরা বৃক্ষরোপণের দায়িত্ব আছেন, তাঁরা এসব সমস্যার তোয়াক্কা করেন না। সস্তা ধারণায় পরিবেশ রক্ষার নামে প্রকৃতির নিয়ম না মেনে জবরদস্তি করে রাস্তার ধারে কৃষকের জমি, বাড়ি, পুকুর, এমনকি ধান শুকানোর চাতালের পাশে গাছ লাগিয়ে সবিশেষ ক্ষতি করছেন। বৃক্ষরোপণের একদিকদর্শিতায় লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষককে। হুজুগে বাঙালির অবৈজ্ঞানিক বৃক্ষ–উন্মাদনার ফলে গাছের ছায়া ও পাতা পড়ে, পচে-সরে অতিরিক্ত ইউরিয়া সৃষ্টি হয়ে জমির ধান সময়ের আগেই জমিতে হেলে পড়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

খোঁজ নিলেই দেখা যাবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সূর্যের আলোর মাপজোখ না করেই, অর্থাৎ যত্রতত্র বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। এই করোনা দুর্যোগকালে এক ইঞ্চি জমিও যখন অনাবাদি রাখা উচিত নয়, তখন রাস্তার পাশের জমির মালিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে, যেখানে-সেখানে, কোনো ভালো-মন্দ, বাছবিচার না করে কিছু মানুষ সরকারের নির্দেশের নাম ভাঙিয়ে গ্রামে গ্রামে জোর করে গাছ লাগাচ্ছে।

জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলো সাধারণত বৃক্ষরোপণের ব্যাপারটি তদারকি করে থাকে। তাদের নিশ্চিত করা উচিত যেন তাদের নিজ নিজ এলাকায় বিদ্যমান গাছের বিজ্ঞানসম্মত জরিপ করা হয়। নিশ্চিত হতে হবে—এলাকায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত গাছ লাগানো হচ্ছে কি না! মনে রাখতে হবে, মানুষের জন্য গাছ যেমন অপরিহার্য, তেমনি অপ্রয়োজনে, অতিরিক্ত বৃক্ষরোপণ করে কোনো গ্রামকে আদিম জঙ্গলে পরিণত করাটাও বিজ্ঞানসম্মত হতে পারে না। একদিকে শহর হবে ছায়াহীন, আলোকোজ্জ্বল, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষার নামে গ্রামকে রোদহীন আমাজনে পরিণত করা যুক্তিসংগত হতে পারে না। প্রতিক্ষেত্রে পরিমিতিবোধই হলো প্রথম ও আসল বিজ্ঞান এবং ন্যায্যতাও। পরিমিতি থেকে সৃষ্টি হয়েছে প্রকৃতি-প্রাণ পৃথিবী, সব। বহু ক্ষেত্রেই ভারসাম্যের অভাবে পৃথিবী এখন হুমকির মুখে।

প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে জবরদস্তি করে গাছ লাগাতে গিয়ে জমির মালিকদের সঙ্গে বাদানুবাদ এখন রোজকার ঘটনা। কৃষকেরা নিরীহপ্রাণ, তাদের পক্ষে সব সময় শক্তিমানদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। একবার একটা ক্ষতিকর গাছ লাগিয়ে ফেললে সেটা সরাতে বা কাটাতে গেলে যে কতটা হয়রান হতে হয়, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন, আর যারা কৃষণ চন্দের ‘লালফিতা’ পড়েছেন তাঁরাও।

পদ্মা সেতু বানাতে যেমন বিজ্ঞান লাগে, বৃক্ষরোপণেও তা অপরিহার্য। অদৃষ্টবাদ এখন পচা শামুক, কেউ মানুন আর না মানুন ঝাড়ফোঁকের দিন আর কখনো ফিরে আসবে না। এ কথা যে আগে বুঝবে, সে আগে লাভবান হবে। সব সময় দরজিবিজ্ঞান দিয়ে যে চলা যাবে না, সবক্ষেত্রে সমান নজর দিতে হবে—একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সে কথা আমলে নিতে হবে। দুনিয়া দেখছে তেল উৎপাদনকারী ডাকসাইটে মহারাজাদের বর্তমান বিপর্যস্ত হাল। তেলের রাজনীতি এখন জংধরা বাতিল তলোয়ার। এরা ভাবতেই পারেনি যে আণবিক শক্তি, সোলার, ব্যাটারি, হাইড্রোজেন ইত্যাদি প্রযুক্তি এসে তেলের ব্যবসাকে এভাবে চ্যালেঞ্জ করে বসবে।

প্রতিনিয়ত চর্চা, সংযোজন, সংশোধনের মধ্য দিয়ে মানুষ এগিয়ে চলে। আমরা ঐকান্তিকভাবে বিশ্বাস করতে চাই যে সরকার আর দেরি না করে বৃক্ষরোপণের উপকারিতা, অপকারিতা, প্রকৃতির ভারসাম্য এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো গভীরভাবে বিবেচনা, বিশ্লেষণ করে চলতি মৌসুম থেকেই অপরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের অভিশাপ থেকে কৃষকদের মুক্তি দেবেন।

সমাজকর্মী

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0