default-image

যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি তত বেশি উন্নত। এই প্রবাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে  সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশও এগিয়েছে বহুদূর। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষা খাতের বড় প্রতিবন্ধকতা হলো যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, সেটি সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। সে কারণে বেকারত্বের সংখ্যা দিন দিন হুহু করে বেড়েই চলেছে। দেশে  শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা এখন শতকরা ৭০ জন। দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে, এটি যেমন আনন্দের খবর তেমনি শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়াটাও আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখের। শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। এই শিক্ষার পেছনে শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও বিপুল বিনিয়োগ থাকে।

শিক্ষিত তরুণদের এক-তৃতীয়াংশ যদি বেকার থাকে, তাহলে আমরা ওই শিক্ষাকে কীভাবে মানসম্মত বা যুগোপযোগী বলব? সরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সম্পূর্ণ বেকার ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। বাকিদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ সার্বক্ষণিক চাকরিতে, ১৮ দশমিক ১ শতাংশ পার্টটাইম বা খণ্ডকালীন কাজে নিয়োজিত। তাহলে এই বিপুলসংখ্যক বেকারত্ব সৃষ্টির মূল কারণ কী? কর্মসংস্থান সৃষ্টির অভাব নাকি দক্ষ জনশক্তি তৈরির অভাব! এই বেকারত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কারিগরি বা কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি আমাদের গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। তা না হলে আমাদের প্রচলিত যে শিক্ষাব্যবস্থা তা একসময় বেকার তৈরির কারখানা হয়ে দাঁড়াবে।

বিজ্ঞাপন

কারিগরি শিক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে পদে পদে আমরা অনুভব করতে পারি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ছোটখাটো জিনিসপত্র মেরামতের জন্য হাতের কাছে সময়মতো লোক পাওয়া যায় না। আবার শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি হয় প্রায়োগিক কিছু সৃষ্টি করা, সে ক্ষেত্রে আমাদের কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই। ভোকেশনাল এডুকেশন বা কারিগরি শিক্ষা এমন এক শিক্ষাপদ্ধতি, যেখানে পাস-ফেল বলে কিছু নেই। বরং এটি একজন মানুষকে যোগ্য প্রতিযোগী করে গড়ে তোলার এক প্রয়াস, যেখানে হয় আপনি যোগ্য অথবা এখনো যোগ্য নন। তাই পরিপূর্ণ দক্ষতা অর্জনের জন্য এবং একজন যোগ্য প্রতিযোগী হতে আপনাকে যতবার প্রয়োজন, ততবার পরীক্ষা দেওয়ার এবং নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ দেওয়া হয়। কারিগরি শিক্ষায় তত্ত্বীয় পড়াশোনার চেয়ে বাস্তব প্রয়োগে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে একজন কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে ভালো কাজের সুযোগ খুঁজে নিতে পারে। বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় কারিগরি শিক্ষাকে চাকরির ক্ষেত্রেও খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। একজন চাইলে খুব সহজেই কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের পূর্বের কাজ থেকে বেরিয়ে নতুন কাজ করতে পারে এবং নিজের ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করতে পারে। সৃষ্টিশীল বিষয় কর্ম সৃষ্টিতে অবদান রাখে। নতুন কিছু সৃষ্টি করে তা অন্যের কাছে বিক্রি করেও লাভবান হওয়া যেতে পারে।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মানবসম্পদের উন্নয়ন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কেবল কারিগরি শিক্ষার সাহায্যে স্বল্প সময়ে বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা সম্ভব। নানা ধরনের সমীক্ষায় দেখা যায়, যে দেশে কারিগরি শিক্ষার হার যত বেশি, সে দেশের মাথাপিছু আয় তত বেশি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম খাত বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স। বিদেশে কর্মরত দক্ষ জনশক্তির সিংহভাগই ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি প্রকৌশলী। এ দেশের ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কর্মরত। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ দেশের ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা চাকরি করে দেশের জন্য বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করছেন। বর্তমানে ৮০ লাখের বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত আছেন, যার বেশির ভাগই অদক্ষ। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অন্যদিকে প্রচলিত যে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, তা আমাদের সনদ বিতরণ করলেও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বেকার থাকা সত্ত্বেও অনেক খাতে উচ্চ বেতন দিয়ে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। যার অর্থ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সময়ের চাহিদা মেটাতে পারছে না। ফলে শিক্ষিত হলেও অনেকেই জীবিকা/কর্মসংস্থানের তাড়নায় বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ কিংবা জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপকর্মে। এতে দেশের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ও উন্নতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই জীবনমুখী শিক্ষা ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা সর্বত্র অনিবার্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে হলে তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগাতে হবে। তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। প্রয়োজনে মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অন্যান্য সম্পদের দক্ষতা বাড়িয়ে দারিদ্র্য বিমোচন, ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। আমাদের অর্থনীতিকে নিজেদের মতো করে শক্তিশালী করার প্রত্যয়ে নির্ভরতা কমানোর জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিকল্প নেই। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী বলতে স্বনির্ভর অর্থনীতি, যার অর্থ কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ বিষয়ে উপযুক্ত বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক নিজস্ব প্রযুক্তি সংবলিত উন্নয়ন আবশ্যক, তার ধারাবাহিকতা এবং মাধ্যম হলো কারিগরি শিক্ষা। বিশ্বের উন্নত দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নিজেকে দক্ষভাবে গড়ে তুলতে হলে এবং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী করতে হলে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই।

  • মো. আবদুল মান্নান, শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

বিজ্ঞাপন
আয়োজন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন