বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

রহমত দাদু দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। বয়স হয়েছে, সঙ্গে কাশিটাও বড্ড কষ্ট দেয় আজকাল; তবে তিনি সচেতন বটে। করোনা মহামারি চলাকালে সবার মুখে মাস্ক পরিয়েছেন এবং নিজেও পরেছেন। পাশে পড়ে থাকা চশমাটা চোখে দিয়ে তিনি বলেন, ‘শেখ রাসেল আমাদের ভাই। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবারের সঙ্গে ছোট্ট শিশুটিকেও অমানুষেরা গুলি করে হত্যা করে। কী নির্মম মানুষ, তাই না?’ কথাগুলো বলতে বলতে দাদুর চোখে জল আসে আর ‘আমরা করব জয়’ টিমের সবারই মন খারাপ হয়।
আচ্ছা, এবার বলো দাদু, যুদ্ধের সময় তোমরা কী কী খেতে? অনীক দাদুকে জড়িয়ে ধরে।

রহমত দাদু হাসেন। সবাই কত কঠিন কঠিন প্রশ্ন করল, কিন্তু কখনো কেউ জিজ্ঞাসা করেনি মুক্তিযোদ্ধারা কী খেয়ে বেঁচে ছিল, যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল। অথচ কত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটি। যাহোক, দাদু অনীককে বুকে জড়ালেন। শীত পড়ছে। শালের অর্ধেকটা অনীককে জড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘দেখো দাদু, শাল জড়িয়ে দেওয়ায় তোমার কেমন লাগছে। নিশ্চয়ই খুব আরাম লাগছে। আমাদের যুদ্ধের সময় সেই আরামটুকুও ছিল না। সারা রাত নদীতে বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ওপারে হানাদারদের সঙ্গে প্রচণ্ড গোলাগুলিতে অংশ নিয়েছিলাম। একটা শুকনা কাপড়ও ছিল না। ভেজা কাপড়ে চলে গিয়েছিলাম কোনো বাঙালি গেরস্তের ঘরে। তারা আমাদের চুপিসারে ঘরের মুড়ি, পান্তা, মরিচ, যা থাকত দিত। আমরা তা-ই খেয়ে না-খেয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, অনীক। খুব ভালো প্রশ্ন করেছ।’

default-image

শামীম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সে জানতে চায় চোখে দেখা বঙ্গবন্ধুর বীরত্বের কথা।

রহমত দাদু তাঁর নাতনি মর্জিনাকে এক গ্লাস পানি আনতে ইশারা করেন।

দূর থেকে দ্রুত এসে দেলু বলে, ‘জেলা প্রশাসক এসেছেন। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।’

রহমত দাদু বলেন, ‘আসতে দে। ভেতরে বসার ঘরে নিয়ে যা। আমি আমার দাদুদের সঙ্গে কথা শেষ করে আসছি। ওনাকে বলবি একটু ধৈর্য ধরে বসতে। আজ তিনি আমার ঘরের অতিথি এবং আত্মীয় হিসেবে এসেছেন। খাবারের ব্যবস্থা কর সবার জন্যই। কেউ যেন না খেয়ে না যায়।’

ঠিক আছে বলে দেলু চলে গেল।
রহমত দাদু বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে শুরু করেন।

default-image

আমি বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। তিনি একজন মহৎ প্রাণের মানুষ ছিলেন। আমাকে সিপাহি রহমত বলে ডাকতেন। খুব স্নেহ করতেন আমায়। ওনাকে যতটুকু কাছে থেকে দেখেছি, শুধু বাংলাদেশের মানচিত্র ছিল তাঁর হৃদয়ের ভেতর, এমটাই মনে হয়েছে আমার। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের কাছে কিছুতেই মাথানত করেননি। কত কষ্ট–যাতনার শিকার হয়েছেন। বছরের পর বছর জেলে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। সদা হাসিমুখে কষ্ট বরণ করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। কথায় কথায় কীভাবে দেশের উন্নয়ন হবে, স্বাধীনতার পর দেশকে কীভাবে দাঁড় করাবেন, দিনরাত পরিশ্রম করতেন। দেশ-বিদেশে সহায়তা-সমর্থন চেয়েছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, যাতে সবাই মিলেমিশে ভগ্নপ্রায় বাংলাদেশকে ফের গড়তে পারে। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন তিনি এবং তাঁর পরিবার। তবে তাঁর ভেতর দারুণ প্রতিবাদী অগ্নিশিখা ছিল। অন্যায়ের কাছে মাথানত কখনোই করেননি। তাই তাঁকে সত্য-ন্যায়ের পথে চলতে গিয়ে দেশীয় অজাতশত্রুদের হাতে নৃশংসভাবে পুরো পরিবারসহ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে তাঁর শিশুপুত্র শেখ রাসেলসহ মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। বাংলাদেশে শেখ মুজিব জন্মায় একবারই। আমরা কী বোকা বাঙালি! তাঁকেই বিনা দোষে জীবন দিতে হলো। সত্যিকার দেশপ্রেমিক ছিলেন আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’

বারান্দায় বসা সবাই জোরে করতালি দিল। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনল দাদুর মুখে বঙ্গবন্ধুর কথা। সত্যি, নতুন প্রজন্মকে এভাবে বিজয়ের ৫০ বছরেও এত সুন্দর করে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপন করতে পারলে বাঙালি জাতি আরও এগিয়ে যাবে। গর্বের হবে স্বাধীনতার সংগ্রাম।

বসার ঘরটি বেশি দূরে নয়।

সিপাহি রহমতের কথা জেলা প্রশাসক ফারুক আহমেদ শুনলেন এবং চোখের জল ফেললেন। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এত জ্বলজ্বল করা সত্য কথা, কাছ থেকে দেখা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এমন বিরল অভিজ্ঞতার কথা আগে তিনি কখনোই শোনেননি এত আবেগ দিয়ে।

জেলা প্রশাসকও হাততালি দিলেন এবং রহমতের সামনে গিয়ে তাঁকে স্যালুট দিলেন।

‘আমরা করব জয়’ টিমের সবাই উঠে দাঁড়ায়। ৭২ বছরের রহমত দাদুকে দুজন কিশোর ধরে দুই কাঁধে হাত লাগিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। সবাই মিলে আবার যথাযোগ্য মর্যাদায় তাঁকে স্যালুট জানায়।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে এসে সিপাহি রহমত মিয়া দেশ স্বাধীন করার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে বলে ভাবেন। দেশের উন্নয়ন দেখে খুশিতে চোখের জল ফেলেন। আর পরম করুণাময়ের কাছে দেশের শান্তি কামনা করেন। মনে মনে মুক্তিযোদ্ধা রহমত বলেন,

‘বাংলাদেশের উন্নতিতে আনন্দ সবার,

বিজয়ের পঞ্চাশ বছরে জাগো আবার।’

আয়োজন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন