default-image

‘বইমেলা’ কোটি বাঙালি হৃদয়ের অনুভূতিতে সাড়া জাগানো একটি নাম। যে নামের আয়োজনে শহর থেকে গ্রামবাংলার ইতিহাস–ঐতিহ্য, শিক্ষা–সংস্কৃতি তথা জীবনগাথার স্মৃতি জীবন্ত হয়ে অন্তরালের ক্যানভাসে দৃশ্যমান হয়। এ যেন মহা মিলনমেলা।

আত্মিক টানে নিজের অজান্তেই ছুটে আসে বইপ্রেমী সত্তা। প্রতিটি স্টল হয়ে ওঠে একেকটি মুখর আঙিনা। যে আঙিনায় পাঠকেরা যেন নিমন্ত্রিত অতিথি। কেউ বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে কল্পলোকে একপলক হারিয়ে যান, কেউ আবার দু-একটি পাতায় দৃষ্টি দিয়ে নিজেকে নিয়ে যান চিরচেনা কোনো ভালোবাসার রাজ্যে, কেউ ফিরে পান হারানো অতীত, কেউবা খোঁজে সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ। কী নেই এখানে! এ রাজ্যে সব আছে। ইচ্ছা করলেই সুখ–দুঃখ, হাসি–কান্না, বিরহ, প্রেম–ভালোবাসা, প্রেরণা–অনুপ্রেরণা—সব কেনা যায়। শুধু প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেই এখানে খুব কম দামে, সুলভ মূল্যে একজন জীবন্ত মানুষকে ভার্চ্যুয়ালি কিনে নেওয়া যায়। যে মানুষটি প্রিয় বন্ধু, একান্ত কাছের মানুষ হয়ে সার্বক্ষণিক পাশে থেকে জীবনবোধের চেতনায় একাকার থাকে, জীবনকে পরিপূর্ণতায় সমৃদ্ধ করে মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বাঁচতে শেখায়। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘একদিন বই পড়তে পড়তে মানুষ জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হতে পারে। তাই বই হয়ে উঠুক প্রাণের বন্ধন, জীবনের আপনজন।’

মার্কাস টুলিয়াস সিসারোর উক্তি থেকে পাওয়া যায়, ‘A room without books is like a body without a soul.’
প্রকৃতপক্ষে বই তখনই মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যায়, যখন সে তার অন্তরের মধ্যে একটি জানার জগৎ তৈরি করে আত্মভুবনে নিজেকে উপলব্ধি করার প্রয়াস সৃষ্টি করে। আর তখনই সার্থকতার ছোঁয়ায় কম্পিত হৃদয়ে জাগে প্রাণোচ্ছল সুখানুভূতির শিহরণ। মানুষ হয়ে ওঠে সত্যসন্ধানী। জ্ঞানপিপাসার তৃষ্ণা মেটাতে মানুষ তার অন্তরালের মানুষকে খুঁজতে থাকে। ছুটে আসে হাজার মানুষের ভিড়ে স্বপ্নের মানুষটির সান্নিধ্যের প্রত্যাশায়।

বিজ্ঞাপন

বইমেলা যে শুধু জ্ঞানই বিলিয়ে দেয়, তা নয়। এখানে মানুষ প্রশান্তির পরশে প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাববিনিময়ে নিজেকে উজাড় করে দেয়। ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিক জীবনের মধ্য থেকে একটু সময় করে অন্তর্নিহিত কৌতূহলে মন রাঙানোর পাশাপাশি মানসিক উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্য নিয়ে নানা রঙে রাঙিয়ে হৃদয়ের মেলবন্ধনে প্রাণের মেলা সার্থক ও প্রাণবন্ত করে তোলে। নতুন প্রজন্মের চেতনায় জাগ্রত হয় জ্ঞান আহরণের স্পৃহাসহ বইয়ের প্রতি মমত্ববোধ। খুদে পাঠক থেকে শুরু করে প্রবীণদের উপস্থিতিতে মেলায় প্রতিফলিত হয় তারুণ্য। এ যেন অন্য রকম এক সম্প্রীতির সম্ভারে উদ্বেলিত সাগরের বুকে ঢেউয়ের হাতছানি। ঝরনা যেমন চায় মুগ্ধ চোখ, তেমনি বই চায় সেই পাঠক, যিনি তাঁর হাতের পরশে অপলক দৃষ্টিতে কেবল আপন করে নেওয়ার অভিব্যক্তি প্রকাশ করবেন।

বইমেলার আয়োজন আছে বলেই দেশবরেণ্য লেখক, সাহিত্যিকদের সঙ্গে দেখা ও কথা হচ্ছে। অনুপ্রেরণায় অনেক নতুন লেখকদের আবির্ভাব হচ্ছে। নতুনদের লেখায় ওঠে আসছে নতুনত্বও। আসলে লিখতে গেলে ভালো পাঠক হতে হয়, অনেক পড়তে হয়। তাই নতুন লেখক যত সৃষ্টি হবে, ততই পাঠকসংখ্যাও বাড়বে। আর নতুনেরাই একসময় পুরোনো হয়। কাজেই নতুন লেখকদের চিন্তাধারা প্রকাশে বইমেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি শব্দ কিংবা শব্দের তৈরি বাক্য যেমন পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে, ঠিক তেমনি একটি বই বা তার বুকে লিপিবদ্ধ একটি বাক্য একজন মানুষের জীবনকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পারে। তরুণদের দিয়েই যুগে যুগে পরিবর্তন এসেছে। তথ্য-প্রযুক্তির যুগে তরুণ লেখকেরাই নতুনত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে দেশপ্রেমের প্রত্যয় নিয়ে বাঙালি জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবে, এমনটিই বিশ্বাস। বইমেলাকে ঘিরে নতুন প্রজন্মের মধ্যে যে আশা-আকাঙ্ক্ষার উদয় হয়, তা পূরণের নিমিত্তে উৎসাহ ও উদ্দীপনায় প্রেরণা জোগানোটা আমাদের মহত্বের পরিচয় বহন করে।

অনেক ঘাত- প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা, প্রাণের প্রিয় বাংলাদেশ। এ দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্বগৌরবে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্বদরবারে। একদিন উন্নত, শিক্ষিত জাতি হিসেবে আমরা প্রথম সারিতে পৌঁছাব। এই স্বপ্ন আমরা প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ ও লালন করে যাচ্ছি। তাই দেশের জনসমষ্টিকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই। মনের অন্ধকার, কুসংস্কার দূর করে সাফল্যের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়াই আমাদের একমাত্র কাম্য। বই মানুষকে ইতিবাচক ভাবনায় ভাবিয়ে তোলে, যা তার জীবনকে সুসংগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত করে দেশের সম্পদে পরিনত করে। তাই বইমেলা জাতীয় জীবনে গভীর মর্মার্থ ও তাৎপর্য বহন করে।

২০২০ সালের বইমেলায় ছিল খুবই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কারণে আগত ২০২১ সালের বইমেলা নিয়ে এখনো লেখক, প্রকাশক, পাঠকদের মনে রয়েছে সংশয়। প্রাণের মেলা তার অতীত ঐতিহ্য ধরে রেখে পাঠকের হৃদয়ের অদম্য চাওয়া পূরণ করতে পারবে কি!
যেখানে মানুষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড থেমে নেই, সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলার আয়োজন জাতীয় জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। তাই বইমেলা এগিয়ে চলুক তার আপন গতিতে, প্রতিবারের মতোই নির্ধারিত সময়ে জেগে উঠুক বইপ্রেমী হৃদয়ের স্পন্দন, বইমেলার অনিন্দ্য স্বাদের তৃপ্তিতে ভুলে যাক অতীতের যত বেদনা, চির সবুজের দেশে রক্তিম সূর্যের আলোকিত শিখায় ভরে যাক করোনার মতো মহাপ্রলয়, এমনটি প্রত্যাশা করছি।

*লেখক: জুলফিকার বকুল, শিক্ষক, ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল, গাজীপুর

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন