default-image

একটা সময় আমি কাজের তাগিদে ঘর থেকে সবার আগে বের হতাম। দরজার ওপাশে পড়ে থাকা খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে শুধু শিরোনামগুলোয় চোখ বুলিয়ে নেমে যেতাম সিঁড়ি ভেঙে। দিন শেষে ঘরে ফিরে সন্ধ্যায় এক কাপ চা নিয়ে পছন্দের কোনো গান ছেড়ে মুখস্থ করতাম রোজকার খবর। যে খবরটা বেশি ভালো লাগত, ছুঁয়ে যেত নিজেকে, সেটা আমি কবিতার মতো করে পড়ে রেকর্ডও করতাম।

খবরের কাগজের একটা গন্ধ থাকে। ভাঁজ খুলতেই সেটা টের পাওয়া যায়। আজ প্রায় এক বছর হতে চলল সেই গন্ধ টের পাই না। সারা পৃথিবীর বদলে যাওয়া সময়ের কারণে আমার বাসায় দৈনিক খবরের কাগজ আর আসে না। করোনা যতটা নয়, তার চেয়ে বলব অর্থনৈতিক কারণটা বড়। কারণ, অনলাইন নিউজে আমি যে খবরটা পাচ্ছি, সেটা এই দুঃসময়ে বাড়তি টাকা দিয়ে কেনা আমার জন্য বিলাসিতা। তবে সময়টা একটু স্বাভাবিক হলেই আবার আমার ঘরের চৌকাঠে পড়ে থাকবে ভোরের প্রথম সূর্যের মতো কোনো উষ্ণতা মাখা খবরের কাগজ, এটা ভাবতেই ভালো লাগে আমার।

খবর পড়া একটা নেশা আমার কাছে। যেমন নেশা লেখা, ঠিক তেমন। কিন্তু আজকাল এত এত খারাপ খবর চারপাশে মনে হয়, কী হবে এসব পড়ে, আরও তো হতাশা বাড়বে। তার চেয়ে বরং এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। দেশের কোথাও কি কোনো ভালো খবর, আনন্দের খবর নেই? এত ধর্ষণ, খুন, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা এসব পড়তে কার ভালো লাগে বলুন?

বিজ্ঞাপন

এই তো গত শনিবার রাতে ছোট্ট একটি মেয়েকে পাওয়া গেল উলঙ্গ রক্তাক্ত অবস্থায় জাতীয় শহীদ মিনারের পেছনে। কী নির্মম, কী ভয়াবহ কথা। যেখানে আছে মাতৃভাষার জন্য জীবন দেওয়া শহীদদের স্মৃতি, সেখানে এমন বর্বরোচিত জঘন্য অপরাধ কী করে করতে পারে মানুষ? এরা মানুষ নয়, মানুষরূপী এক ভয়ংকর প্রাণী। যাদের বিবেকবোধ বিষাক্ত সাপের মতো, যাদের হাত, পা, নখ হিংস্র বাঘের মতো। ছোট্ট ওই শিশুর রক্তাক্ত শরীর বেয়ে নামছে ভাষার মাসের প্রতিটি বর্ণমালা। সেই অক্ষর কাগজে আসছে খবর হয়ে, না আমি ওই কাগজ পড়ার সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি।

আমিও তো মাঝেমধ্যে শহীদ মিনারে যাই, একটু বসি, গল্প করি, চা খাই। মনে হচ্ছে ওই শিশুর ধর্ষণের সাক্ষী আমি, তার শরীরে এক টুকরো কাপড় না থাকবার জন্য দায়ী আমি, ওই শিশুকে হত্যা করার সময়, কষ্ট দেওয়ার সময় সেই আওয়াজ শুনতে না পারার সবটুকু ব্যর্থতা আমার। এই ব্যর্থতা নিয়ে কোনো মুখে যাব শহীদ মিনারে ফুল দিতে? হয়তো আমি বা আপনিও কোনো দিন এই ওই শিশুর হাত থেকেই একটা গোলাপ ফুল কিংবা বকুল ফুলের মালা কিনেছিলাম। সেই শিশুই আজ খবর! এমন খবর পড়তে কার ভালো লাগবে বলুন?

রোজ কারও না কারও মৃত্যু হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। খবরের মানুষগুলোও তার শিকার হয়ে হচ্ছে খবর। আমার বাসায় যে হকার মামা কাগজ দিতে আসতেন, একবার বেশ কদিন তাকে আসতে না দেখে, পেপারটা অন্যভাবে পড়ে থাকতে দেখে ফোন দিলাম। জানতে পারলাম কাগজ বিলি করবার সময় ট্রাকের ধাক্কায় সাইকেল থেকে পড়ে তিনি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। কোথায় ভালো খবর তবে?

default-image

কদিন পরেই রাস্তা আলপনা করা হবে, দেয়ালে দেয়ালে করা হবে ভাষার চিত্রাঙ্কন। ফুলে ফুলে ঢেকে যাবে শহীদ মিনার। আসছে ১৩ ফেব্রুয়ারি, মানে পয়লা ফাল্গুন। মেয়েরা সাজবে অপরূপ সাজে। আসবে পাশ্চাত্যের নিয়মে বানানো ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবস। এসব দিবসকে সামনে রেখে কত রংবেরঙের খবর। ভালো লাগবে সেসব দিবসের ছবি দেখতে গল্প পড়তে। আমরা তো ভালোটাই দেখতে চাই, ভালোটাই শুনতে চাই রোজ।

আবার কবে সুদিন আসবে। দরজার চৌকাঠে পড়ে থাকবে প্রিয় কোনো দৈনিক কাগজ। আমার চেনাজানা কত বন্ধু আজ কর্মহীন। লেখা বা সাংবাদিকতা একটা নেশা। এ নেশা যাকে একবার পেয়ে বসে, তার আর সেখান থেকে মুক্তির পথ নেই। অথচ শুধু ভালোবাসায় পেট চলে না। অসংখ্য মিডিয়াকর্মী আজ বেকার। সেদিন একটা লাইব্রেরিতে ঢুকে চোখে পড়ল দেশের সব কটি জাতীয় পত্রিকা। স্মৃতি হাতড়িয়ে বেড়িয়ে এল আমার এক বন্ধুর কাগজ। যেখানে মাঝেমধ্যে আসত আমার লেখাও। বুকটা ভারী হয়ে গেল। হাত দিয়ে স্পর্শ করলাম প্রতিটি কাগজ। মনে মনে বললাম, নিশ্চয়ই সেদিন খুব কাছে, যেদিন আবার গলির মোড়ে, বাসে হকারদের হাতে থাকবে একগাদা খবর। ঘুম ভেঙেই ছুটির কোনো সকালে ধোঁয়া ওঠা চা হাতে বসব খবরের কাগজ নিয়ে। প্রিয় কোনো মিডিয়াবন্ধু ফিরে পাওয়া চাকরিতে গিয়ে চমকে দিয়ে বলবে, এই যে আজকের কাগজে তোমার লেখা...

লেখক: রোজিনা রাখী

বিজ্ঞাপন
আয়োজন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন