default-image

৫৯তম মার্কিন নির্বাচনের উত্তাপ শুধু আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্বে। বিশ্ববাসী প্রবল আগ্রহ নিয়ে জানার জন্য অপেক্ষা করছে আগামী চার বছরের জন্য কে আমেরিকার নেতৃত্বে আসছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প না জো বাইডেন।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনপদ্ধতি অন্যান্য দেশের মতো সহজ নয়, এর প্রক্রিয়া একটু জটিল। জটিল পক্রিয়াটি সহজভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

দ্বিদলীয় নির্বাচন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল হচ্ছে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক দল। এ ছাড়া আরও কিছু রাজনৈতিক দল রয়েছে নির্বাচনে। লিবার্টারিয়ান, গ্রিন, ইনডিপেনডেন্ট পার্টি থেকেও প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

রিপাবলিকান পার্টি

রিপাবলিকান পার্টি ‘গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি’ নামেও পরিচিত। এটি একটি রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল। সাধারণভাবে দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকাগুলোতে রিপাবলিকান পার্টির সমর্থন বেশি জোরালো। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী।

ডেমোক্রেটিক পার্টি

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ডেমোক্রেটিক পার্টি উদারনৈতিক রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত। এ দলের প্রার্থী জো বাইডেন। বারাক ওবামা যখন আট বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন জো বাইডেন ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। আমেরিকার শহরাঞ্চলগুলোতে ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থন জোরালো হিসেবে মনে করা হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রতীক হাতি আর গাধা কেন

রিপাবলিকানদের প্রতীক হচ্ছে হাতি আর ডেমোক্রেটিকদের প্রতীক হচ্ছে গাধা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বের একটি উন্নত দেশের প্রতীক কীভাবে হাতি আর গাধা হয়? প্রতীক নির্বাচনের বিষয়টি খুবই মজার। যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের দৃষ্টিভঙ্গি ও স্লোগান ছিল জনগণকে শাসন করতে দাও। তাঁর এই নীতির জন্য সমালোচকেরা তাঁকে গাধা বলেন। জ্যাকসন সমালোচনার পরও এই নীতিতে অটুট থাকেন এবং নির্বাচনী প্রচারণায় গাধার ছবি ব্যবহার করেন এবং এই গাধাই হয়ে যায় ডেমোক্র্যাটদের স্থায়ী প্রতীক।
১৮৭৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইউলিসেস এস গ্রান্ট তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার শুরু করেন। তাঁর সমালোচনা করে কার্টুনিস্ট থমাস নাস্ট একটি কার্টুন ছাপান। যেখানে রিপাবলিকান ভোটকে ফুটিয়ে তুলতে হাতি ব্যবহার করেন। পরবর্তী সময়ে এটাই হয় রিপাবলিকান দলের স্থায়ী প্রতীক।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনপদ্ধতি

নাগরিকদের সরাসরি ভোটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনপদ্ধতি হলো পরোক্ষ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে প্রার্থীকে আসলে দুই ধরনের ভোটে জিততে হয়। একটি হচ্ছে পপুলার ভোট বা সাধারণ জনগণের ভোট। আরেকটি হচ্ছে ইলেকটোরাল ভোট।

প্রথমে জনগণ ভোট দিয়ে ইলেকটোরাল কলেজ বা নির্বাচকমণ্ডলী নির্বাচন করেন। এখানে একটি কথা গুরুত্বপূর্ণ, ব্যালট পেপারে কিন্তু প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের নাম লেখা থাকে। আবার একেক রাজ্যের নিয়মানুসারে নির্বাচকমণ্ডলীর নাম উল্লেখ থাকতেও পারে আবার না–ও পারে। জনগণ কোনো নির্দিষ্ট প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অর্থ হলো তার দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দেওয়া। পরে এই নির্বাচকমণ্ডলী ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন জনগণের পছন্দের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে।

নির্বাচনে প্রার্থীরা সাধারণত ইলেকটোরাল ভোট জেতার জন্য লড়াই করেন। যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। যে অঙ্গরাজ্যে জনসংখ্যা বেশি তার ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যাও বেশি। মোট ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা হচ্ছে ৫৩৮। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে একজন প্রার্থীকে ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট পেতে হয়। একটি রাজ্যে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি পপুলার ভোট পান, তিনি ওই রাজ্যের সবগুলো ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যান। অবশ্য দুটি রাজ্যের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম আছে। এভাবে একেকটি রাজ্যের ইলেকটোরাল ভোট যোগ হতে হতে যে প্রার্থী ২৭০ পার হন, তিনিই হন পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সবচেয়ে বেশি ইলেকটোরাল ভোট যে অঙ্গরাজ্যগুলোতে রয়েছে সেই অঙ্গরাজ্যগুলো হলো—
★ ক্যালিফোর্নিয়া (৫৫)
★ টেক্সাস (৩৮)
★ ফ্লোরিডা (২৯)
★ নিউইয়র্ক (২৯)
★ ইলিনয় (২০)
★ পেনসিলভানিয়া (২০)।

যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ রাজ্যই রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট বলে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তাই প্রার্থীরা প্রচারণার সময় নিরপেক্ষ ১০–১২ রাজ্যের দিকে মনোযোগ দিয়ে থাকেন। কারণ এই রাজ্যগুলোতে বোঝা যায় না তারা কোনো দলকে সমর্থন করে। এগুলোকে বলে ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’ স্টেট। অর্থাৎ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আসল লড়াই হয় এ রাজ্যগুলোতেই।
কেউ যদি মার্কিন নাগরিক হন এবং বয়স যদি ১৮ বছর হয়, তাহলে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। ভোট গণনা হতে কয়েক দিন লাগে। তবে নির্বাচনের পরের দিনই বোঝা যায় কে বিজয়ী হতে যাচ্ছেন। নতুন প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন ২০ জানুয়ারি। এই অনুষ্ঠানের পরই নতুন প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে যান তাঁর চার বছরব্যাপী মেয়াদ শুরু করার জন্য।

নির্বাচনের ইতিহাস

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন। ১৭৮৯ সালে কার্যকর হওয়া মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী তিনি নির্দিষ্ট নিয়মানুযায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস। ১৭৯৭ সালে তিনি নির্বাচিত হন। হোয়াইট হাউসে বসবাসকারী প্রথম প্রেসিডেন্ট তিনি।
★ ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। তিনি রিপাবলিকান পার্টির প্রথম প্রেসিডেন্ট। দাস প্রথার চরম বিরোধী ছিলেন। ১৮৬৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাস প্রথার অবসান ঘটান। ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম প্রেসিডেন্ট। তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে নির্বাচিত হন। ২০১২ সালের নভেম্বরে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান এবং ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি রিপাবলিকান পার্টি থেকে নির্বাচিত। তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৩০৬টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

৩ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি থেকে নির্বাচন করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে নির্বাচন করছেন জো বাইডেন। সমগ্র বিশ্ব অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে জানার জন্য আগামী চার বছরের জন্য কে যাচ্ছেন হোয়াইট হাউসে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0