default-image

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে মানুষের অন্যতম সঙ্গী হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছে এ মিডিয়া। বিনোদনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক কার্যাবলি এখন সামাজিক যোগাযোগ দ্বারা পরিচালিত ও প্রভাবিত হচ্ছে। সব বয়সী ও শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িত—ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, লিংকডইন, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, স্কাইপে, জুম, গুগল মিটিং ইত্যাদি। এসব সামাজিক মাধ্যমে নানাবিধ উপকারিতার পাশাপাশি নেতিবাচক দিক রয়েছে। কারণ, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের পরিবর্তে যখন অপব্যবহার হয়, তখন সেই প্রযুক্তি আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক যোগাযোগের এমন কিছু অ্যাপস রয়েছে, যেমন: টিকটক, লাইকি, বিগো ইত্যাদি, যেগুলোর কোনো ইতিবাচক দিক নেই। পরিতাপ ও উদ্বেগের বিষয় হলো মানুষ এসবের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা মারাত্মকভাবে এসব অ্যাপ ব্যবহারে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এসব অ্যাপ ব্যবহারের ফলে তরুণ প্রজন্ম বিপথগামী হয়ে পড়ছে। নষ্ট হচ্ছে নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। তরুণ বা কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে অপরাধমূলক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে, হয়ে উঠছে সহিংস।

এ অ্যাপসের মধ্যে বিগো লাইভ অ্যাপের মাধ্যমে তরুণ ও যুবকদের টার্গেট করে লাইভে এসে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি ও কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দিয়ে এবং যৌনতার ফাঁদে ফেলে কৌশলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক তরুণ। অ্যাপটি মূলত একটি লাইভ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে একজন ব্যবহারকারী তার অনুসারীদের সঙ্গে লাইভে মুহূর্ত শেয়ার করে। লাইভে আসা অনেকেই অশালীন অবস্থায় থাকে এবং এসব লাইভের অধিকাংশই যৌন উসকানিতেও ভরা থাকে।

বিজ্ঞাপন

টিকটক ও লাইকি অ্যাপের মাধ্যমে উৎসাহিত হয়ে অনেক কিশোর-তরুণ উদ্ভট স্টাইলে চুল কেটে ও রঙে রঙিন করে এবং ভিনদেশি অপসংস্কৃতি অনুসরণ করে ভিডিও তৈরি করে। যাতে অনেক সময় সহিংস ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট থাকে। অশালীন পোশাক পরিহিত তরুণীরা টিকটকের অশ্লীল ভিডিওতে নাচ, গান ও অভিনয়ের পাশাপাশি নিজেদের ধূমপান ও সিসা গ্রহণ করার ভিডিও আপলোড করেছেন। উদ্বেগজনক যে এই টিকটক ও লাইকি ভিডিওগুলোয় নেই কোনো শিক্ষণীয় বার্তা। উল্টো এসব ভিডিওর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা চলে যাচ্ছে। অ্যাপগুলোর মধ্যে একধরনের প্রদর্শনেচ্ছার বিষয় থাকে।

টিকটক ও লাইকি ব্যবহারকারীর অনেকে তথাকথিত স্টার বা সেলিব্রিটি হন। প্রত্যেক সেলিব্রিটি বা স্টারের বলয়ে এক বা একাধিক গ্রুপ থাকে। আর এই গ্রুপগুলোর একসময় কিশোর গ্যাংয়ে পরিণত হওয়ার খবরও মিলেছে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, কিশোর গ্যাংগুলো বিভিন্ন অপরাধ, যেমন: মাদক গ্রহণ, হত্যাকাণ্ড, মারামারি ও ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। এই তো গত ২৬ ডিসেম্বরের ঘটনা। দেশীয় বিভিন্ন পত্রিকায় এসেছে ‘টিকটক স্টার’ বানানো হবে—এমন কথা বলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করা হয়। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি নির্জন জায়গায়। সেখানে টানা তিন দিন আটকে রেখে চলে দল বেঁধে ধর্ষণ। মেয়েটির বাড়ি গাজীপুরে। মেয়েটির নিজেরও একটি টিকটক আইডি ছিল।

এ ছাড়া কিছুদিন আগে টিকটক ভিডিও করার সময় এক প্রকৌশলীসহ স্থানীয় লোকজনকে মারধর করার অভিযোগ ওঠে ‘অপু ভাই’ নামে এক টিকটকার ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে। ভয়ংকর তথ্য হলো অপসংস্কৃতির ধারক–বাহক এই অপু ভাইদেরও হাজারো ফ্যান-ফলোয়ার থাকে!

একটি ঘটনা বলি, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া আমার এক (টিউশন) ছাত্র রয়েছে। তার একটি টিকটক ও একাধিক ফেসবুক আইডি রয়েছে। একদিন দেখলাম, সে তার মাই-ডে স্টোরিতে (আনুমানিক) এক যুবতীর একটি টিকটক ভিডিও ক্লিপ শেয়ার দিয়েছে এবং ক্যাপশনে লিখেছে ‘মাই ক্রাশ’। যে বয়সে চকলেট খাওয়া উচিত ছিল, সেই বয়সে সে টিকটকে ক্রাশ খাচ্ছে। আঁচ করুন পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বেহায়াপনা ও নির্লজ্জতা ব্যতিরেকে শিক্ষামূলক কোনো কনটেন্ট ভিডিওগুলোয় থাকে না। অথচ উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা বাদ দিয়ে এসব অ্যাপে অধিক সময় ব্যয় করছে। এতে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে, নানাবিধ ভিনদেশি ও অপসংস্কৃতির বেড়াজালে আটকে এসব ছেলেমেয়ে উচ্ছন্নে যাচ্ছে। তরুণসমাজ এসব ব্যবহারের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে চায় এবং নিজেকে জনপ্রিয় ভাবতে শুরু করে। এও শোনা যায়, এসব ভিডিও বানিয়ে নাকি তথাকথিত টিকটক ও লাইকি সেলিব্রিটিরা বিশ্বের বুকে সারা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে! অথচ উচিত ছিল বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কর্মের মাধ্যমে শিক্ষা ও জ্ঞান–বিজ্ঞানে অবদান রেখে বিশ্বের বুকে প্রতিনিধিত্ব করা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তা না করে আমরা টিকটক, লাইকি ও গেমাসক্ত একটি জাতিতে পরিণত হচ্ছি।

সুস্থ ধারার বিনোদনের পরিবর্তে সস্তা ও নিম্নমানের অশ্লীল ও যৌন উসকানিমূলক এসব কনটেন্ট দেখে সমাজের কিশোর–কিশোরীদের মনোজগৎ, আচার আচরণ ও পোশাক–পরিচ্ছদে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ কারণে বাড়ছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও বিচ্যুতি। বিব্রতকর, অনৈতিক ও অশ্লীল ভিডিওগুলো পর্নোগ্রাফিকে উৎসাহিত করায় এরই মধ্যে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এসব ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনতিবিলম্বে এসব অন্তঃসারশূন্য অ্যাপ নিষিদ্ধ করা উচিত। তা না হলে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও এসব অ্যাপস ব্যবহারে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এ ছাড়া পারিবারিক ও সামাজিকভাবেও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

মো. নজরুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন