বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত ২০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৫৭৭ লোক মারা গিয়েছেন এবং প্রায় ১৬৮ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশ। রাজধানী ঢাকা দূষিত বায়ুর শহরের মধ্যে দ্বিতীয়। ক্রমাগত খাদ্য চাহিদা বাড়ায় ও শিল্পকারখানা বৃদ্ধির কারণে আমাদের বনভূমির পরিমাণও দিনে দিনে কমছে। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ ও বনভূমি উজাড়ের কারণে বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি, জলজ প্রাণী, বন্য প্রাণী, উদ্ভিদরাজি আজ বিলুপ্তির পথে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক মানুষ বাস্তুচ্যূত হচ্ছে। ফলে অভ্যন্তরীণ শরণার্থী ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে।

default-image

মানষের আচরণ, সামাজিক সচেতনতা, পরার্থপরতা শিক্ষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। স্কুল থেকেই মানুষ মর্যাদাবোধ, আচরণের শিক্ষা লাভ করে, যা তাদের ব্যক্তিত্ব নির্ধারণ করে। তাই শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সময় থেকেই পরিবেশ বিষয়ে আগ্রহী করে তোলার উপযুক্ত সময়। পরিবেশের ওপর যত্নশীল হওয়া, বাস্তুসংস্থানগত জ্ঞান লাভ করানোই হচ্ছে শিশুদের পরিবেশগত শিক্ষা দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য। পরিবেশগত শিক্ষা হলো এমন একটি শিখনপ্রক্রিয়া, যা দ্বারা ব্যক্তি পরিবেশগত সমস্যাগুলো অন্বেষণ করতে, সমস্যা সমাধানে জড়িত হতে এবং পরিবেশের উন্নতির জন্য পদক্ষেপ নিতে পারে। ফলস্বরূপ একজন পরিবেশগত বিষয়ে বোঝার সক্ষমতা গভীরভাবে অর্জন করে এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত অর্জন করে। ইউনেসকোর মতে, পরিবেশগত শিক্ষা এমন একটি শিখনপ্রক্রিয়া, যা মানুষের জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়ায় এবং প্রয়োজনীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষতা, মনোভাব, অনুপ্রেরণা, অবহিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং দায়বদ্ধ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধও করে। ইউনেসকো বলছে, চারটি কারণে শিশুদের পরিবেশগত শিক্ষা দেওয়া উচিত। কারণগুলো হচ্ছে ১. তাদের সচেতনতাবোধ বাড়ানো এবং চেতনাবোধ জাগ্রত করা, ২. তাদের আগ্রহবোধ জাগিয়ে তোলা, ৩. আমাদের চারপাশ সম্পর্কে বোঝার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ৪. বাস্তুসংস্থানগত জ্ঞান বৃদ্ধি করা।

পরিবেশগত শিক্ষার উদ্দেশ্যগুলো হচ্ছে—

১. পরিবেশ মানবজাতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ এবং উত্তরাধিকার।
২. পরিবেশের প্রতি মানুষের আরও সংবেদনশীল ও সংরক্ষণে উদ্যোগী হওয়া।
৩. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য অবদান রাখায় পরিবেশের মানোন্নয়ন, সুরক্ষা ও সুরক্ষা করার জন্য সাধারণ দায়িত্ব পালন।
৪. প্রাকৃতিক সম্পদের বিচক্ষণ ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ।
৫. প্রত্যেক মানুষ তাদের আচরণ ও কাজের মাধ্যমে কীভাবে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা পালন করবে।
৬. পরিবেশগত শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে কীভাবে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা যায় এবং পরিবেশবিষয়ক সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান করা।
৭. পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নতি সাধনের জন্য জ্ঞান, মান, আচরণ, অঙ্গীকার ও দক্ষতা বাড়ানো।
৮. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে জলবায়ু পরিবর্তন রোধের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা।

পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত দেশ, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক, এমনকি আফ্রিকার কিছু দরিদ্র দেশে পরিবেশ বিষয়ে শিক্ষা এবং পরিবেশ বিষয়ে কর্মশালার আয়োজন করলেও আমাদের দেশে কার্যকরভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বাংলাদেশ নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করছে। সম্প্রতি আফ্রিকান দেশ বতসোয়ানা ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো তাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বাধ্যতামূলক পরিবেশগত শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং মাঠপর্যায়ে শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯৬ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিত বিষয়ে জ্ঞান থাকলেও মাত্র ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে বাস্তুসংস্থানগত প্রাথমিক জ্ঞান আছে, যা আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বে আরও অনেক কম। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হলেও আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, বাস্তুসংস্থানগত ও পরিবেশদূষণ বিষয়ে ধারণা কম। এমনকি পরিবেশ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা, গবেষণাও কম। বাংলাদেশে অনেক বিষয়ে আগে থেকেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকলেও পরিবেশ বিষয়ে প্রথম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯৬ সালে আলাদা ডিসিপ্লিন তৈরি করে। তবে এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই পরিবেশবিষয়ক আলাদা ডিসিপ্লিন তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তক ঘেঁটে দেখা যায়, প্রতিটি শ্রেণিতে গড়ে প্রায় ৩.৬৬টি পরিবেশবিষয়ক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে চতুর্থ শ্রেণির সাধারণ বিজ্ঞান বইয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি বিষয় পড়ানো হয়। সরকারি শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা (১ম-৬ষ্ঠ) শিক্ষার্থীদের পরিবেশ পরিচিতি, পরিবেশের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা, মাঠ পরিদর্শনের মাধ্যমে মাটি, পানি, বায়ু ও কীটপতঙ্গের সঙ্গে পরিচিতি এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ার কথা বলা হলেও তা পাঠ্যপুস্তকেই সীমাবদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বৈশ্বিক পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন , সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি, পরিবেশদূষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা করার কথা থাকলেও এসব বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে কম উচ্চারিত হয়। অথচ পরিবেশদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন পরিবর্তনশীল বিশ্বে একটি উদ্বেগের বিষয়।

শিক্ষার্থীদের পরিবেশগত শিক্ষাদানের পদ্ধতি—
১. পরিবেশবিষয়ক কর্মকাণ্ড।
২. খামার ও উদ্যান ভ্রমণ।
৩. আশপাশের বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে রাখা।
৪. শ্রেণিকক্ষের বর্জ্য আলাদা করা।
৫. পরিবেশগত বিষয়ে আলোচনা করা।
৬. গাছ লাগানো।
৭. পরিবেশবিষয়ক লেখা পড়তে উদ্বুদ্ধ করা প্রভৃতি।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশদূষণের ভুক্তভোগী কোনো একক দেশ কিংবা অঞ্চল নয়, পৃথিবীর সব দেশই এর ভুক্তভোগী। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের এ সংকট মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়। তাই সরকারের সঙ্গে দেশের সব জনগণকে এগিয়ে যেতে হবে। ২০১৯ সালে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত কপ-২৫ লিডার্স সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যদি আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তাহলে শিশুরা আমাদের ক্ষমা করবে না।’ আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাই শিশুদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে পাঠ্যপুস্তকে পরিবেশগত বিষয়ে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার বিকল্প নেই।

লেখক: সউদ আহমেদ খান, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আয়োজন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন