default-image

১.
বর্ষপঞ্জিকার হিসাবটা ঠিক মনে করতে পারছি না। ২০০৯-১০ সালের দিকে হবে হয়তো। দিনবদলের স্লোগান দিয়ে মুঠোফোন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলালিংক কয়েকটি টেলিভিশন বিজ্ঞাপন তৈরি করে, যেখানে সমাজের বিভিন্ন শাখায় পরিশ্রম ও মেধা দিয়ে সফলতার সঙ্গে সব বাধা অতিক্রম করা কয়েকজন বাংলাদেশির জীবনকাহিনি ছোট্ট করে তুলে ধরা হয়।

তখন একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয় বাংলা পপ সংগীতের পথিকৃৎ গুরু আজম খানকে নিয়ে। সেখানে সংগীতজগতে আজম খানের কণ্টকাকীর্ণ পথযাত্রা তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞাপনটিতে দেখানো হয় তাঁর পথচলার শুরুটা কেমন ছিল। দেখতে পাই বিভিন্ন স্টেজ শো করতে গিয়ে কতটা অবহেলায় বিশ্রামাগারের এক কোনায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো আজম খান ও তাঁর দলকে। এমনকি বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পীদের নানা কটুকথায় বিদ্ধ হতে হতো তাঁদের। সেই সঙ্গে বিভিন্ন টক শোতে পপ সংগীতের সমালোচনা তো রয়েছেই। তারপরও আজম খান থেমে থাকেননি। সব প্রতিবন্ধকতাকে ছাপিয়ে ঠিকই অল্প সময়ে এ দেশে জনপ্রিয় করে তোলেন পপ সংগীতকে। জায়গা করে নেন অগুনতি মানুষের হৃদয়ে।

২.
ইউটিউবের কল্যাণে বছর দুয়েক আগে প্রয়াত আনিসুল হকের উপস্থাপনায় ‘জলসা’ নামক একটি বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান দেখতে পাই, যেটা সেই ’৯৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন উপমহাদেশের বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী প্রয়াত কলিম শরাফী ও রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, নজরুলসংগীতশিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক ও নিলুফার ইয়াসমীন, প্রয়াত সুবীর নন্দী, শাকিলা শর্মার (শাকিলা জাফর) মতো জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীরা। অনুষ্ঠানে ব্যান্ডগোষ্ঠী হিসেবে অংশ নেয় মাইলস, সোলস, রেনেসাঁ ও ফিডব্যাক।

বিজ্ঞাপন

সেই অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই ব্যান্ড শিল্পীদের সম্পর্কে নানা অভিযোগ-অনুযোগ তুলে ধরা হয়। ব্যান্ডসংগীত কণ্ঠের চেয়ে বেশি যন্ত্রনির্ভর, শিল্পীদের তেমন কোনো সাধনা করতে হয় না, বিদেশি সংস্কৃতিতে পুষ্ট ও দেশীয় সংস্কৃতিতে কিছু যোগ করতে না পারাসহ আরও বেশ কিছু অভিযোগের তির ছোটে শাফিন, মাকসুদ, হামিন, নকিব খানদের দিকে। তাঁরাও নিজেদের জায়গা থেকে সেগুলোর উত্তর দেন এবং ভুলগুলো ভাঙার চেষ্টা করেন।

আসলে ওই সময়টা ছিল বাংলা ব্যান্ড সংগীতের জাগরণের সময়। তো সেই অনুষ্ঠান দেখার পর আমার ধারণা, সে সময় ব্যান্ড শিল্পীদের পথচলা মোটেও নিষ্কণ্টক ছিল না। যেমনটা আমি আজম খানের ক্ষেত্রে বাংলালিংকের সেই টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে দেখেছিলাম।

এমনকি বাস্তবে ঠিক একই চিত্র আমাদের আশপাশে প্রায়ই লক্ষ করতাম আমি। ধরুন, ২০০৩-০৪ সালের কথা। শহরের কথা আমি বলতে পারি না। তবে গ্রাম বা মফস্বলে যাঁরা আধুনিক গানের শ্রোতা ছিলেন, তাঁরা ব্যান্ডসংগীতকে প্রচণ্ড অবহেলা ও অবজ্ঞার চোখে দেখতেন তখন। ব্যান্ডসংগীত সম্পর্কে তাঁদের কিছু বিরূপ ধারণা ছিল। তাঁরা ব্যান্ডসংগীতকে কোনো সংগীতই মনে করতেন না। মনে করতেন বেসুরা আর চিল্লাচিল্লি। তাঁদের কাছে ব্যান্ডসংগীত মানেই উচ্ছৃঙ্খল গান। তাঁদের মতে ব্যান্ডসংগীতের শ্রোতারা সাধারণত বখাটে ধরনের হয়। শৈশবে এ রকম উদ্ভট ধারণার একটি অসুস্থ চর্চা লক্ষ করতাম আমাদের সমাজে বিশেষ করে মধ্যবয়স্ক ও বয়স্ক নাগরিকদের মধ্যে।

বিজ্ঞাপন

সে সময়কার একটা ঘটনা বলি। তখন আমি প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের এলাকায় এক বড় ভাইয়ের সিডি-ক্যাসেটের দোকান ছিল। স্কুল শেষ হলেই আমি নিয়মিত সেখানে দৌড়ে যেতাম, আর এলআরবি, আর্ক, মাইলস, নগর বাউলসহ বিভিন্ন ব্যান্ডের গান শুনতাম। মূলত সেখান থেকেই ব্যান্ডসংগীত শোনার বা উপভোগ করার চর্চাটা গড়ে ওঠে আমার মধ্যে। তা ছাড়া বাসায়ও টেলিভিশনে প্রায়ই ব্যান্ডসংগীত শোনা হতো। এদিকে আমার আব্বা আবার ব্যান্ডসংগীতের কট্টর বিরোধী। তিনি রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, মান্না দে ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের ভীষণ ভক্ত।

স্বভাবতই আব্বা ব্যান্ডসংগীত একটুও পছন্দ করতেন না। এগুলো শুনলেই কেমন জানি নাক সিঁটকাতেন। তাঁর ভাষায়, ব্যান্ডসংগীত হচ্ছে উচ্ছৃঙ্খল গান ও হেড়ে গলার চিল্লাচিল্লি। আসলে উচ্ছৃঙ্খল আখ্যা দিয়ে ব্যান্ডসংগীতকে আব্বা চূড়ান্ত তাচ্ছিল্য করতেন। আমি যখনই টেলিভিশনে নগর বাউল, আর্ক, প্রমিথিউসহ অন্যান্য ব্যান্ডের গান শুনতাম, তখনই আব্বা এসে বলতেন, ‘এই সব চিল্লাপাল্লা কী শুনস!’ এতে করে প্রায়ই আব্বার সঙ্গে আমার একচোট তর্কাতর্কি হয়ে যেত।

তবে ২০১৮ সালের ঠিক এই দিনে এক ভিন্ন বাস্তবতার সাক্ষী হই আমি। সেদিন দেখতে পাই একজন কিংবদন্তি ব্যান্ডসংগীতশিল্পীর অকালপ্রয়াণ কীভাবে দেশের আবালবৃদ্ধবনিতাদের ছুঁয়ে যায়। সেই কিংবদন্তি ব্যান্ডসংগীতশিল্পী আর কেউ নন, আমাদের সবার প্রিয় আইয়ুব বাচ্চু।

বিজ্ঞাপন

কি যুবক, কি তরুণ, কি মধ্যবয়স্ক, কি বয়স্ক; বাচ্চু ভাইয়ের প্রয়াণে সেদিন দেশের সব স্তরের সব বয়সের মানুষ একসঙ্গে বেদনাহত হয়েছিলেন। বাচ্চু ভাই যেদিন চলে গেলেন, সেদিন আমি দেখলাম তাঁর প্রতি সবার গগন সমতুল ভালোবাসা, উপলব্ধি করলাম একজন আইয়ুব বাচ্চুর জন্য আমাদের কত আবেগ, কত অনুভূতি! শুধু আমরা যাঁরা তাঁর ভক্ত কিংবা তাঁর গান শুনে বড় হয়েছি তাঁরা নন, যাঁরা তাঁর গান ঠিকমতো শুনতেন না, তাঁরাও সমভাবে ব্যথিত হয়েছেন। সমভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এমনকি ব্যান্ডসংগীতকে সব সময় উচ্ছৃঙ্খল গান বলে বিদ্রূপ করা আমার আব্বাকেও সে দুঃখ ছুঁয়ে গিয়েছিল। সেদিন দৈনন্দিন কাজ সেরে রাতে বাড়ি ফিরেই সরাসরি আমার ঘরে প্রবেশ করেন আব্বা। সে সময় আমি টেলিভিশনে বাচ্চু ভাইকে নিয়ে কয়েকজন সংগীতশিল্পীর উপস্থিতিতে এক আলোচনা অনুষ্ঠান দেখছিলাম। তখন আব্বা আমাকে শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, ‘বস চইলা গেল!’

৩.
গুরু আজম খান তাঁর ‘বাংলাদেশ’ গানের একটা লাইনে বলেছিলেন, ‘যে চলে যায় সে কি আসে?’ সে আসে না। কিন্তু তাঁর কর্ম দ্বারা পৃথিবীতে ঠিকই তিনি বেঁচে থাকেন। ঠিক যেমন আজম খানের মতোই আইয়ুব বাচ্চু না থেকেও আমাদের মাঝে বেঁচে রয়েছেন তাঁর গানের মাধ্যমে। বাচ্চু ভাই তাঁর সুর, সৃষ্টি ও ছয় তারের সমন্বয়ে এক অদ্ভুত মায়াজালে আচ্ছাদিত করে গিয়েছেন এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলকে। এ মায়াজাল ভেদ করার সাধ্য কার বলুন!

মন্তব্য পড়ুন 0