সূর্য ডুবছে
সূর্য ডুবছেছবি: লেখক

মার্চ থেকে করোনাকালীন ছুটির শুরু। সেই থেকে শুরু হওয়া ছুটি এখন অবধি চলছে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর ছুটি বাড়ানো হচ্ছে। ছুটির অলস সময় যেন ফুরোতেই চায় না।

বাসায় বসে থেকে থেকে সবাই ভেতরে-ভেতরে পুড়ছিলাম। অযাচিত মনে বিশ্ববিদ্যালয়ের রঙিন দিনগুলো ফিরে ফিরে আসছিল। অনার্স লাইফে আমরা এত এত স্মৃতি জমিয়েছি, তা ভুলি কী করে!

অনেকের সঙ্গে কথা হলো একটা ট্যুর দেওয়া নিয়ে। চাচ্ছিলাম দল ভারী করতে। শেষমেশ ৮ জন জোগাড় হলো। এবার কোথায় যাওয়া যায় তা নিয়ে অনলাইনে মিনি মিটিং। অন্য সময় হলে আমাদের মিটিং ভিসি চত্বরেই হতো। ওটা আমাদের অলিখিত কনফারেন্স ভেন্যু। সে যাক। স্থির হলো আমরা যাব ভোলার চর কুকরি-মুকরিতে।

আমিই ট্যুর প্ল্যান সাজানোর ভার নিলাম। সামসুল খানিকটা সাহায্য করেছিল। সামসুলকে নিয়ে মজার কাহিনিও আছে। সেটা একটু পরেই বলা যাক।

ডেট ফিক্সড হলো। কিন্তু মাঝখানে এসে বাগড়া দিল বৃষ্টি। এবারকার বৃষ্টির যেন কোনো টাইম-টেবল নেই। সবাই যে যার বাসায় বসে বেরসিক বৃষ্টি দেখে দেখে ট্যুরের অকালপ্রয়াণ ধরেই নিলাম। সেটা সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহের কথা। অক্টোবরের ১ম সপ্তাহে আবার অনলাইন মিনি মিটিং। আবার ডেট ফিক্সড হলো। তবে ৮ জনের প্রাথমিক দল কাটছাঁট করে ৬ জনে এসে নামল। যতজনই হোক এবার যাবই যাব—এ রকমই পণ করে বসলাম।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় ডেটে আবার যাওয়া নিয়ে ধোঁয়াশা। এবারের বাধা বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ। প্রতিনিয়ত আমি এই খবরই রাখছিলাম। অবশ্য সবাইকে ট্যুরের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলে রেখেছিলাম। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম, এবার যাচ্ছি। ২৩ তারিখ রাতে সবাইকে পরদিনের জন্য রেডি হতে বললাম। সকালে জেগে শুনি সামসুল ডেট এক দিন পিছিয়ে দিয়েছে। আমি আবার সবাইকে জানিয়ে দিলাম ডেট পেছানো হবে না।

default-image

পরদিন অর্থাৎ ২৪ অক্টোবর সবার রিপোর্টিং গুলিস্তানে মুকুলের দোকানে। একে একে আমি, শাহিন, সাহেদ, মুকুল, আশিক সবাই পৌঁছে গেলাম; বাকি রইল সামসুল। ঘণ্টা দুয়েক ধরে সবাই মিলে সামসুলের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছি তো গুনছিই। ইতিমধ্যে আমরা সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে চলে এলাম। সেখানে বসেও সামসুলের জন্য অপেক্ষা করেই চলেছি। ওই দিকে ঘোষের হাটগামী শেষ লঞ্চ ছাড়ার শেষ মুহূর্ত। আমরা পাঁচজন লঞ্চে উঠে বসলাম সামসুলকে ছাড়াই। মন খারাপ লাগছিল ওকে ছেড়ে চলে আসতে। যাক আশার কথা হলো, সামসুল অন্য একটি লঞ্চে উঠতে পেরেছিল। কথা হলো ওর জন্য আমরা চর কুকরি-মুকরিগামী ঘাটে গিয়ে অপেক্ষা করব।

পরদিন সকালে আমরা ছয়জন একত্র হলাম। এবার সামসুলকে আর ফেলে রেখে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। চর কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে স্পিডবোটে পৌঁছে গেলাম বহুল আকাঙ্ক্ষিত চর কুকরি-মুকরি দ্বীপে। গিয়ে থাকার জায়গা নিয়ে ফ্যাঁসাদে পড়লাম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তারও সুন্দর বন্দোবস্ত হলো। দুপুরের খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম পুরো চর ঘোরার জন্য।

default-image

আমরা চর কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে চর কুকরি-মুকরি আসার পথে সুন্দরবনের আবহ টের পাচ্ছিলাম। দুপুরে যখন বের হলাম, চোখেমুখে যেন সুন্দরবন ভাসছিল। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সরু খাল। দুপাশে শ্বাসমূলের ছড়াছড়ি। প্রকৃতি যেন আমাদের দুহাত ভরে ডাকছে। ততক্ষণে ছোট নৌকা নিয়ে চরের মাঝখানে চলে এসেছি। এসে যেন নতুন আকাশ পেলাম। কী অসম্ভব সুন্দর এই চর কুকরি-মুকরি! বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি আমরা এখানে ঘুরে বেড়িয়েছি। চরের পাড় ঘেঁষে হেঁটে বেরিয়েছি অনেক দূর। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে তীরের কাছেই সারি সারি ছোট মাছ দেখতে পাওয়া। আমাদের আঁচ পেয়ে ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে লাফিয়ে লাফিয়ে পালিয়েছে। পুরো তীর ঘেঁষে অল্প পানিতে ওদের আনাগোনা। এই চর যেন আমাদের দুহাত ভরে দিয়েছে। পুরো চরে আমরা ছয়জন ও নৌকার মাঝি ছাড়া আর কেউ ছিল না। একটা ছোট্ট তথ্য দিয়ে রাখি, বঙ্গোপসাগরের উপকণ্ঠে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় কয়েক শ বছর আগে জেগে ওঠা একটি চর হচ্ছে চর কুকরি-মুকরি। অবশ্য এই চর বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য।

ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে এখানে হরিণের দেখা মেলে। এ ছাড়া এখানে প্রচুর মহিষ দেখতে পাওয়া যায়।

এই জল, বন্য প্রাণীর মায়া কাটিয়ে আমাদের আবার চিরচেনা গন্তব্যে ফিরতে হয়। ফেরার পথ ধরি। ফিরতি লঞ্চে উঠে বসি। ফেরার পথে লঞ্চের ছাদে কোরাস গাইতে গাইতে মধ্যরাত পেরোয়। আমাদের সুন্দরতম মুহূর্ত ঠিক ওখানটাতেই থামে। বাকি পথটুকু ঘুমিয়েই গন্তব্যে ফিরি।

*লেখক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0