default-image

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর যাত্রা শুরু করে। চট্টগ্রামের মূল শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে হাটহাজারি উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত অনিন্দ্য সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয়টি। এটি দেশের তৃতীয় এবং শিক্ষাঙ্গনের আয়তনের দিক থেকে দেশের সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়।

চবি প্রতিষ্ঠার রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চট্টগ্রাম বিভাগে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় চট্টগ্রামের অধিবাসীরা স্থানীয়ভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন অনুভব করেন। ১৯৪০ সালের ২৮ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সর্বভারতীয় সম্মেলনে মাওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামবাদী সভাপতির ভাষণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি’ নির্মাণের কথা উপস্থাপন করেন এবং একই লক্ষ্যে তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার দেয়াং-এ বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য ভূমি ক্রয় করেন। ২ বছর পর, ১৯৪২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নূর আহমদ বঙ্গীয় আইন পরিষদে চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক দাবি উত্থাপন করেন। ষাটের দশকে চট্টগ্রামে একটি ‘বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ।

প্রথমদিকে এ বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে স্থাপনের পরিকল্পনা করা হলেও ১৯৬৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ১৯৬৪ সালের ৯ মার্চ একটি জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের বৈঠকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মঞ্জুর করা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম ওসমান গণিকে চেয়ারম্যান এবং ড. কুদরাত-এ-খুদা, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এম ফেরদৌস খান ও ড. মফিজউদ্দীন আহমদকে সদস্য নির্বাচন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্থান নির্বাচন কমিশন’ গঠিত হয়। এই কমিশন সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে হাটহাজারি উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে জঙ্গল পশ্চিম-পট্টি মৌজার নির্জন পাহাড়ি ভূমিকে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান হিসেবে সুপারিশ করে।

১৯৬৪ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রাথমিকভাবে ১টি দ্বিতল প্রশাসনিক ভবন, বিভাগীয় অফিস, শ্রেণিকক্ষ ও গ্রন্থাগারে জন্য একতলা ভবন তৈরি করার পাশাপাশি শিক্ষক ও ছাত্রদের আবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়।

বিজ্ঞাপন

২০১৯ সালের হিসাবে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২৭ হাজার ৮৩৯ জন শিক্ষার্থী, যাঁদের মধ্যে ১৫ হাজার ৫৯৮ জন ছাত্র ও ৯ হাজার ১৭১ জন ছাত্রী এবং ৮৭২ জন শিক্ষক রয়েছেন। ছাত্রছাত্রীদের পরিবহনের জন্য আছে শাটল যা বিশ্বে চবিরই একমাত্র রয়েছে। ছাত্রদের জন্য বর্তমানে ১২টি আবাসিক হল ও একটি ছাত্রাবাস এবং ছাত্রীদের জন্য ৪টি আবাসিক হল রয়েছে।

চবিকে ৯টি অনুষদের অধীনে ৫৪টি বিভাগ, ৭টি ইনস্টিটিউট, ৬টি গবেষণা কেন্দ্র ও অধীন ২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

দেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম থেকে শুরু করে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন চবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস চবির শিক্ষক এবং চবিতে অধ্যাপনা করার সময় গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। চবির উল্লেখযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম, শিক্ষাবিদ প্রফেসর আহমদ শরীফ, ড. আনিসুজ্জামান, ড. হুমায়ুন আজাদ, ড. অনুপম সেন, ড. মইনুল হকসহ আরও অনেকে। চবিতে একাধিক একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাও রয়েছেন। দেশের গবেষণা, সাংস্কৃতিক, খেলাধুলাসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পদচারণ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে করোনা টেস্ট ও গবেষণায় চবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।

প্রিয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রত্যাশা থাকবে জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণা ও দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আরও বেশি অবদান রাখবে এবং একদিন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সেরা র‌্যাঙ্কিং এ অবস্থান করবে।

  • তারেক নিজাম: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য পড়ুন 0