default-image

‘প্রথম স্ত্রী নেজি মারাক মাইরা গেলে আমার আট সন্তান আমারে রাইখা যার যার মতো বউ-পোলাপান লইয়া চইলা গেল গা। এই বয়সে আমি এহন কী করি, কই যাই। পরে খুকি মারাকরে বিয়া করলাম। এই বয়সে কাম করতে পারি না। মাইনষ্যে কামেও লয় না। তারপরও কয়টা ভাতের লাইগা মাইনষ্যের জমিনে কাম করি। যা পাই, তাই দিয়া কোনোমতে দুইজনে বাঁইচা আছি। একদিন আনারসখেতে কাম করতে গিয়া আনারসপাতার খোঁচা লাইগা চোখটা থেঁইতলা গেল গা (আনারসের পাতা ধারালো)। এরপর থেইকা এক চোখে আমি কিছুই দেহি না। চোখটা মইরা গেছে, আরেক চোখ অন্ধ হওনের পথে। শেষে কী করমু, দুজন মিলা গেরামে গেরামে ভিক্ষা করা শুরু করলাম, ভাত তো খাওন লাগব, না খাইয়া কত দিন থাহন যায়। কেউ খোঁজ নিতে আসে না আমগোর। সারা দিন ভিক্ষা কইরা যা পাই, তা-ই খাইয়া থাহি দুইজনে। খুকিরে বিয়ার পর এক মাইয়া হইছে সংসারে। মাইয়ারে পাইলা-নাইলা বড় করছি, বিয়া দিছি আর শেষে হেই মেয়াও আমগোরে ফালাই থুইয়া গেছে গা। আইজ বড়দিন। সবাই কত আনন্দ করতাছে। সবার উঠানে উঠানে আনন্দ হইতাছে আর আমার উঠান খাঁ খাঁ করতেছে। আমার সন্তান-পোলাপাইন আমার মরণের পরও কি আমারে দেখতে আইবো?’

কথাগুলো বলা শেষ করে কেঁদে উঠলেন টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার মহিষমারা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গজারিচালা গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধ রণেশ সাংমা।

বিজ্ঞাপন

এক চোখে দিনটা বড় হলেও আরেক চোখে অনন্তের অন্ধকার বয়ে বেড়ান মধুপুরের গজারিচালা গ্রামের রণেশ সাংমা। একসময় এই গ্রামের গহীন অরণ্যে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন রণেশ তাঁর শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যের দিনগুলোয়। সেই গহিন অরণ্য আর নেই। বন বিভাগ আর প্রভাবশালীদের থাবায় রণেশ সাংমাদের মতো মানুষের বহু ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হারিয়েছে তাদের চাষের জমি, বসতভিটাও।

প্রথম স্ত্রী নেজি মারাকের মৃত্যুর পর সন্তানেরা ফেলে চলে যান। এরপর কোনো সন্তান এই বৃদ্ধ বাবাকে একটিবারের জন্য দেখতে আসেননি।

গজারিচালা গ্রামটিতে প্রায় ৬০ ঘর গারো সম্প্রদায়ের বসবাস। একদিকে ফুলবাড়িয়া উপজেলা, অন্যদিকে মধুপুর উপজেলার একেবারেই মধ্যবর্তী একটি গ্রাম হওয়ায় যুগের পর যুগ উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত এই গ্রামের মানুষ। ভোটের মৌসুম এলেই কেবল জনপ্রতিনিধিরা আশ্বাসের ফুলঝুরি দিয়ে গেলেও আখেরে কোনোকালেই খোঁজ নেননি এই গ্রামের মানুষগুলোর বলে অভিযোগ করেন গ্রামবাসী।

গজারিচালা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ঘরে খাবার নেই, নেই একটা চালও, বৃদ্ধ রণেশ উপোস বসে আছেন উঠোনে। পাকের ঘরে নিভে যাওয়া উনুনে পড়ে আছে গতকালের পুড়ে যাওয়া লাকড়ি। তবুও ক্ষুধা যে মানে না কোনো কিছুই।

গজারিচালা গ্রামের প্রণতি মারাক, ছন্দা মারাক, নিলিপ মারাক, বিনেশ রেমা, জিসাম জেমচাং বলেন, গজারিচালা গ্রামটা ফুলবাড়িয়া মধুপুরের শেষ সীমানা হওয়ায় সবচেয়ে বেকায়দায় রয়েছেন তাঁরা। মধুপুর থেকেও কোনো সহযোগিতা পান না, ফুলবাড়িয়া থেকেও কোনো সহযোগিতা পান না। করোনায় কাজকাম সব বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে এ গ্রামের অনেক নারী পারলারে কাজ করতেন। শহরের অনেক পারলার বন্ধ থাকায় পরিবারের অবস্থা ভালো না, অনেকেই কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার বসে আছেন। তাঁরা সরকারের সহযোগিতা চান।

মধুপুর উপজেলার জয়েনশাহী আদিবাসী পরিষদ গজারিচালা আঞ্চলিক শাখার সভাপতি লিও চিচাম বলেন, ‘কী বলব আমাদের দুঃখের কথা। আমরা একুলেও যেতে পারি না, ওকুলেও যেতে পারি না। আমরা ফুলবাড়িয়ার মানুষও না, আমরা মধুপুরের মানুষও না। আমাদের গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কাজ করলে খেতে পারে, না করলে না খেয়ে থাকে। সেখানে খুকি মারাক-রণেশের মতো পরিবারগুলো খুবই মানবেতর জীবন যাপন করছে। আমরা সবাই সহযোগিতা করি পরিবারটিকে। কিন্তু আমার মনে হয় সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন রণেশ সাংমার মতো অসহায় পরিবারগুলোর সাহায্যার্থে।’

লেখক: ইমতিয়াজ আহমেদ। [email protected]

বিজ্ঞাপন
আয়োজন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন