শামসুর রাহমানের কবিতা: সময়ের কড়চা

শ্যামলীর বাসায় টেবিলে লিখছেন কবি শামসুর রাহমান। ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি
ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন

শামসুর রাহমানের কবিতার মাধ্যমে বাংলা কবিতায় এক বাঁকবদল দেখা যায়। ভাষারীতির প্রয়োগ এবং নতুন নতুন শব্দ ও উপমা প্রয়োগ আর চিত্রকল্প নির্মাণে নতুনত্ব এনে পরিষ্কার পার্থক্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। কবিতায় ভাষা আন্দোলন, বিভিন্ন সংকট, স্বাধীনতা ইত্যাদির বৈচিত্র্যময় শব্দ, উপমা ইত্যাদি ব্যবহার করে চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন তিনি। কবি যখন কাব্যচর্চা শুরু করেন, তখন বাংলাদেশ ও বাংলা সাহিত্যে ক্রান্তিকাল চলমান। ইতিহাস-ঐতিহ্য, রবীন্দ্র-নজরুল সংকট, ভাষাবিকৃতি, বর্ণমালার ওপর আঘাত ইত্যাদি সংকটে জর্জরিত এ অঞ্চল। এসব সংকটে সামনে থেকেছেন তিনি। কবিতা ও বিভিন্ন লেখায় তুলে ধরেছেন অকুতোভয় হয়েই।

শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর ১৯২৯—১৭ আগস্ট ২০০৬)

কবি শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর ১৯২৯–১৭ আগস্ট ২০০৬) ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি/ গোলাপ নেব, ঘাতক তুমি সরে দাঁড়াও, এবার আমি/ লাশ নেব না’ (ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা) ইত্যাদির মতো প্রতিবাদী অনেক কবিতা লিখেছেন। তিনি নিরীহ প্রজাদের প্রতি শাসকদের চরম অনীহা দেখতে পান। সরকারের বিলাসিতা কিন্তু থেমে থাকেনি। অথচ সাধারণ জনগণই সব ক্ষমতার শক্তি। এরূপ পরিস্থিতিতে সরকার ও নেতাদের প্রতি কটাক্ষ করে কবি লেখেন, ‘ধন্য রাজ্য ধন্য,/ দেশজোড়া তার সৈন্য। /... দু’মুঠো নেই অন্ন,/ ধন্য রাজ্য ধন্য’ (রাজকাহিনী)।

ছবি: সংগৃহীত

শামসুর রাহমানের সর্বাধিক পঠিত ও জনপ্রিয় কবিতা ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়?’। কবিতাটির কিছু অংশ তুলে ধরা যাক—‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়? /তেমন যোগ্য সমাধি কই? /... তাই তো রাখি না এ লাশ আজ/ মাটিতে, পাহাড়ে কিংবা সাগরে,/ হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই’। তাঁর কবিতার মাধ্যমে বাংলা কবিতায় এক বাঁকবদল দেখা যায়। ভাষারীতির প্রয়োগ এবং নতুন নতুন শব্দ ও উপমা প্রয়োগ আর চিত্রকল্প নির্মাণে নতুনত্ব এনে পরিষ্কার পার্থক্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। কবিতায় ভাষা আন্দোলন, বিভিন্ন সংকট, স্বাধীনতা ইত্যাদির বৈচিত্র্যময় শব্দ, উপমা ইত্যাদি ব্যবহার করে চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন তিনি। ‘পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত/ ঘোষণার ধ্বনি–প্রতিধ্বনি তুলে,/ নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক এই বাংলায়/ তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা’ (তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা) ইত্যাদির মতো কবিতার কবি হচ্ছেন শামসুর রাহমান। তাঁকে নাগরিক কবি বলা হয়। ঢাকার স্মৃতি, পুরাতন ঢাকার দুর্ভোগ ইত্যাদির বর্ণনা তাঁর কবিতার ভাষায় পাওয়া যায়।

শামসুর রাহমান
ফাইল ছবি

নতুন স্বপ্ন ও জাগরণের গল্প শুনি শামসুর রাহমানের কবিতায়। বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক সব গণ–আন্দোলন নিয়ে কলম ধরেছেন প্রকাশ্যে, কবিতার পরতে পরতে বিরুদ্ধচারীদের বিরুদ্ধে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো শব্দবর্ষণ। রক্তজবার মতো টুকটুকে লাল ও উজ্জ্বল উচ্চারণ তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতায় বাঙালি ও বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়া যায়।

শামসুর রাহমানের কবিতার প্রধান বিষয় ছিল তাঁর সময়কার। সে সময়ের প্রবল প্রতিকূলতা ও বিষয় কবিতার উপাদান হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সমগ্র পাকিস্তান আমলে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন-সংগ্রাম ইত্যাদি তাঁর কবিতার শব্দে যুক্ত হয়েছে। আবার প্রকাশিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের নানা সংকট ও গ্লানির চিত্র। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা ছিল সবাক, সংগ্রামমুখর। প্রথম দিকে না হলেও পরের দিকের কবিতায় তিনি রাজনীতিসচেতন হয়ে উঠেছেন। নূর হোসেনকে নিয়ে লেখা ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’, অথবা ‘দুখিনী মায়ের অশ্রুজলে ফোটে ফুল’, ‘আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা’, ‘উদ্ভট উঠের পিঠে চলেছে স্বদেশ’, ‘স্বাধীনতা তুমি’ ইত্যাদি কবিতাংশ প্রবাদপ্রতিম হয়েÑবাংলা এবং বাঙালির আবেগ ও অস্তিত্বে মিশে গেছে।