ভাষা আন্দোলন ও বইমেলা

ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

বেলা এগারোটা বাজে। রত্না ওয়াশরুম থেকে গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল। খুব তড়িঘড়ি করে গোছাচ্ছে ও বইমেলায় যাবে বলে। এ বছর ওর লেখা একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

বইয়ের নাম ‘রক্তাক্ত ভাষা’। বেশ সুন্দর লেখার হাত রত্নার। যদিও রত্না কলেজপড়ুয়া উঠতি বয়সী এক ফুটন্ত তরুণী। ওর এখন যে বয়স, এ বয়সে অবশ্য ওর লেখার কথা প্রেম–ভালোবাসার রসের কবিতা। যে কবিতার মধ্যে আকর্ষণীয় সব পঙ্‌ক্তি থাকবে। থাকবে হাস্য-রস, রোমান্টিকতা। প্রেম–ভালোবাসার নানান রসালো সব ছন্দমালা।

যা পড়লে অজানা এক অনুভূতিতে দেহ শিহরিত হয়ে উঠবে। কিন্তু তা না, তার কাব্য-কবিতার মধ্যে বেশির ভাগই দেশপ্রেম ফুটে ওঠে। আর উঠবেই–বা না কেন? তার শরীরে যে বয়ে চলেছে নিখুঁত এক দেশপ্রেমিকের রক্ত। কেননা...রত্নার দাদা রহিম মিয়া ছিলেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের একনিষ্ঠ একজন সৈনিক। আর রত্নার আব্বা রফিকুল মিয়া ছিলেন ১৯৭১ সালের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

‘ঐ- যে কথায় আছে না...

রক্তে কথা কয়,

সেটাই হয়েছে ঠিক যেনো রত্নার বেলায়’

রত্না ইতিহাসের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছর অনার্স শেষ বর্ষে অধ্যয়ন করছে। কুকিং রুমে রান্না করছিল রত্নার মা রূপালী বেগম। রত্না গোছাতে গোছাতে একবার বলল...আম্মু, রান্না কি হয়েছে?

আমার যে দেরি হয়ে যাচ্ছে। রূপালী বলল, হয়ে গেছে মা। রেডি হয়ে স্বপ্নাকে ডেকে ডাইনিং টেবিলে বস। আমি এখনই খাবার নিয়ে আনছি। রত্না কয়েকবার স্বপ্নাকে একটু জোরে ডাকল। স্বপ্না...এই স্বপ্না...স্বপ্না খেতে আয়। রত্নার ছোট বোন স্বপ্না, সে নিজের ঘরে খোলা জানালার কাছে বসে বাইরের দিকে আনমনা হয়ে তাকিয়ে আছে। স্বপ্নার আনমনা হয়ে বসে থাকারও অবশ্য কারণ আছে...।

এই ফেব্রুয়ারি মাসটা এলেই আজও স্বপ্নার বুকের ভেতরটাতে কেমন যেন মোচড় দিয়ে ব্যথা করে ওঠে। কলিজাতে তীব্র রক্ত ছোটে তার। যদিও সে বয়সের দিক থেকে এখনো কিশোরী। সবে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। বয়স বারো-তেরো হবে। তবু তার দাদুর কাছে শোনা সেদিনের সে ভাষা আন্দোলনের গল্পের কথা আজও ভুলতে পারেনি। দাগ কেটে আছে স্বপ্নার মনে। স্বপ্নার দাদু রহিম মিয়া যদিও আজ বেঁচে নেই। কিন্তু দাদুর বলা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সেই গল্প আজও তার মনে আছে। সে কল্পনায় ডুবে ভাবতে লাগল...তখন স্বপ্না কেজি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ফেব্রুয়ারি মাসের বইমেলার এমনি একদিন স্বপ্না ওর মা-বাবা–বোনের সঙ্গে অমর একুশের বইমেলায় যাবে বলে তৈরি হচ্ছিল। স্বপ্নার দাদু বলল, কি দাদু ভাই বইমেলায় যাচ্ছ? উত্তরে স্বপ্ন বলল, হুম দাদু, বইমেলায় যাচ্ছি। অনেক মজা করব দাদু। ফুল, পাখি, সাগর, আকাশ, চাঁদ, সূর্য নদীনালা, পাহাড় রঙিন প্রজাপতি আঁকা নানা রকম মজার ছড়ার বই কিনব। ভালো হবে না দাদু? রহিম মিয়া হেসে ওঠে বলল...হুম খুব ভালো হবে দাদু।

সঙ্গে কিন্তু আমাদের দেশ, দেশের মানুষ, মাটি, সবুজ ফসলের মাঠ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ—এসব ছবি আছে। এসব নিয়ে লেখা ছড়া–কবিতা আছে। সেসব বইও কিনে এনো, কেমন দাদু ভাই? স্বপ্নার ছোট মনে প্রশ্ন জেগেছিল। তাই সে দাদুর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, কেন দাদু? উত্তরে রহিম মিয়া বলল, ওসব ছবি আঁকা। আর ওই সব বিষয় নিয়ে এখন থেকে তুমি না পড়লে এদেশ, এ দেশের মানুষ, এ দেশের মাটির প্রতি ভক্তি, প্রেম, ভালোবাসা, মমতাবোধ জন্মাবে কীভাবে?

তুমি আজকের যে অমর ২১ বইমেলায় যাচ্ছ। জানো দাদু...এই বাংলা ভাষার প্রাণ বর্ণমালা স্বরবর্ণ অ, আ, ই, ঈ; ব্যঞ্জনবর্ণ ক, খ, গ, ঘ—এই বর্ণমালাকে টিকিয়ে রাখতে রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার, বরকতের মতো কত নওজোয়ান জীবন দিয়েছেন ১৯৫২ সালে। সেদিনের সে মিছিলে আমি হয়তো বেঁচে গিয়েছিলাম। কিন্তু একটা পা হারিয়ে ছিলাম খান সৈন্যদের ছোড়া বুলেটের আঘাতে। আজও ভয়াবহ সে দিনটির কথা মনে পড়লে শিহরিত হয়ে উঠি। উহু! কত রক্ত, কত গুলিবিদ্ধ মানুষের আহাজারি। কত লাশ পড়ে ছিল রাজপথে। এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এদেশ, মাটি থেকে শত্রুমুক্ত করতে লাখ লাখ বাঙালি জীবন দিয়েছিলেন। সাত বীরশ্রেষ্ঠর নাম হয়তো শুনেছ দাদু। লেফটেন্যান্ট মতিউর, মোস্তফা কামাল, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, নুর মোহাম্মদ, রুহুল আমিন, মুন্সী আব্দুর রউফ, হামিদুর রহমান। এ ছাড়া

কত যে লাশ পড়েছিল তার ইয়ত্তা নেই। সেই ১৯৭১–এর মুক্তিযুদ্ধে তোমার আব্বুও গিয়েছিল। হয়তো তোমার আব্বু অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরে এসেছিল যুদ্ধ শেষে। কিন্তু কত মা-বাবার বুক যে খালি হয়ে গিয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে। তা কী বলব দাদু। ওই সব বীর সন্তান সেদিন যদি ভাষার জন্য আন্দোলন না করতেন, এ দেশের জন্য যুদ্ধ না করতেন, তাহলে এ দেশ স্বাধীন হতো না। মাতৃভাষা বাংলাকেও হারিয়ে ফেলতাম।

আজকের এই বইমেলাও হতো না। আজকের এই বইমেলা, বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য–শিল্প–সংস্কৃতি তাই তো ভাষা আন্দোলন আর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ দাদু ভাই।

সেদিন স্বপ্না ওর দাদুর মুখে শুনেছিল কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৯৫২ সালে পূর্ব বাংলার বাঙালিদের এই মাতৃভাষা বাংলা কেড়ে। বাঙালিদের ওপর জোর করে ওদের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাঙালিরা তা সেদিন মেনে নেয়নি। সে দিনটি ছিল বাংলা ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ৮ ফাল্গুন বৃহস্পতিবার। ইংরেজি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেদিন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গড়া ১৪৪ ধারা কঠিন আইন ভঙ্গ করে। জীবনের পরোয়া সবাই না করে।

গর্জে উঠেছিল বাঙালি ছাত্রসমাজ থেকে শুরু করে শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক—সবাই। তারা শত্রুদের বন্দুকের নলের সামনে নির্ভীক অকুতোভয় মনে এগিয়ে গিয়েছিল মিছিল করতে করতে। তা দেখে শত্রুরা নিরস্ত্র বাঙালিদের মিছিলের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। তাদের ছোড়া তপ্ত ঝাঁজালো বুলেটের সামনে নিরস্ত্র বাঙালিদের মুখে একটাই স্লোগান ছিল...

বাংলা আমার মায়ের ভাষা

রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,

রাষ্ট্রভাষা উর্দু আমরা মানি না...

মানব না কেউ আমরা তাই।

রত্না আবার ডাকছে এই স্বপ্না...স্বপ্না এই খেতে আয়। হঠাৎ রত্নার ডাক কানে আসতেই সে সংবিৎ ফিরে পেল। উঠে খেতে গেল। রূপালী বলল, কিরে মা স্বপ্না, তুই তোর আপুর সঙ্গে বইমেলায় যাবি না? স্বপ্না বলল, হুম, যাব আম্মু। রত্না বলল, গেলে খাওয়া শেষে দ্রুত গুছিয়ে নে স্বপ্ন।

স্বপ্ন বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। এরপর খাওয়া শেষ করে রুমে গিয়ে দ্রুত গুছিয়ে ওর আপুর সঙ্গে বইমেলায় গেল। বইয়ের স্টলে পৌঁছাতেই রত্নাকে সব পাঠক–ভক্ত ঘিরে ধরল। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের ও মিডিয়ার সাংবাদিকও আছে।

বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে রত্নার বইটি। অনেক পাঠকের হাতে রত্নার বই দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ এগিয়ে এসে অটোগ্রাফ চাইছে রত্নার কাছে। সাংবাদিকেরা রত্নার কাছে তার বইয়ের পাঠকপ্রিয়তা পাওয়া নিয়ে অনুভূতি জানতে চাইছে। রত্না আবেগপূর্ণ অনুভূতি ব্যক্ত করল। কথার মধ্যে তার দাদু ও আব্বু–আম্মুর কথাও তুলে ধরল। বেশ আনন্দঘন এক মুহূর্ত কাটল পাঠকদের সঙ্গে বইমেলায় রত্না আর স্বপ্নার।

স্বপ্ন তার দাদুর কথা ভোলেনি। সে বিভিন্ন স্টলে ঘুরে ঘুরে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তি যুদ্ধের ওপর লেখা বিভিন্ন কবি-লেখকদের বই কিনতে লাগল। একসময় সন্ধ্যা নামতেই ওরা দুবোন সবার কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে একটা গাড়ি ধরে বাড়ির দিকে রওনা দিল।