জলবায়ু পরিবর্তনরোধে স্কুলশিক্ষার্থীদের জলবায়ু ক্লাব

মানুষের নির্বিচার আচরণে পরিবেশ হয়ে পড়েছে রুগ্ন-ভগ্ন কোনো বৃদ্ধের মতো, যেন তাকে দেখার কেউ নেই। ভগ্ন শরীরে সে আর কতটা পথ এগোবে একাকী! রুগ্ন পরিবেশের প্রভাব এসে পড়ছে মানুষের নিত্য জীবনযাত্রায়। পরিবেশের প্রতি মানুষের অযাচিত আচরণের ফলে পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ু। পৃথিবী হয়ে উঠছে উত্তপ্ত, বরফ গলে বাড়ছে সমুদ্রের পানির উচ্চতা। বিশ্বে ভয়াবহভাবে এগিয়ে আসছে বন্যা-খরাসহ নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে, তবুও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে এবং সরকারের একার পক্ষে সম্পূর্ণ নিরসন করা কঠিন। এর জন্য সমাজের সর্বস্তরের লোকদের এগিয়ে আসা ও অংশগ্রহণ করা উচিত। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় এক–তৃতীয়াংশ যুবক (যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর)। যদি তরুণ প্রজন্মকে জলবায়ু শিক্ষা, দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে তারা ভবিষ্যতে দেশ যে অনিবার্য সংকটের মুখোমুখি হবে, তা মোকাবিলা করার জন্য ভালোভাবে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হবে।

পরিবেশের এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী মূলত মানুষ। মানুষ সচেতন হলে এবং পরিবেশের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় না। এই সচেতনতা তৈরি হওয়া দরকার গোড়া থেকেই। তাই প্রয়োজন বিদ্যালয় বা স্কুল থেকেই সচেতনতার সূচনা করা। সেই লক্ষ্য থেকেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর ইনোভেশন অ্যান্ড লার্নিং’ বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য জলবায়ু সচেতনতা কর্মসূচি শুরু করেছে। আর এ কর্মসূচির চূড়ান্ত রূপ হিসেবে স্কুলে স্কুলে তৈরি করে দিচ্ছে জলবায়ু ক্লাব। 
জলবায়ু ক্লাব হলো মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের একটি দল, যারা তাদের অর্জিত দক্ষতার মাধ্যমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্কুল এবং তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য অধিক দায়িত্বশীল হবে। এটি মূলত অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম, যাতে তারা পরিবেশগত ঝুঁকি হ্রাসের জন্য স্বপ্রণোদিত হয়ে ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি কিশোর ও তরুণদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং যুব নেতৃত্বের বিকাশের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কিশোর ও তরুণদের দ্বারা গঠিত ও পরিচালিত। ক্লাবের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী ও তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বের বিকাশ, দলগত দক্ষতা, ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা, চিন্তাচেতনার বিকাশ, সচেতনতা সৃষ্টি, ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনযাত্রার মান বিকাশ করে। বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার মাধ্যমে তারা পরবর্তী সময় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মজীবন জলবায়ু ও পরিবেশন সচেতন নাগরিক হিসেবে তৈরি হবে। 

জলবায়ু ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে থেকে নেতৃত্ব চর্চা করছে। প্রত্যেকে তারা ক্লাইমেট লিডার বা জলবায়ু নেতা হিসেবে প্রস্তুত হবে, যারা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে গড়ে তুলবে টেকসই, পরিবেশ সম্মত ও সবুজ দেশ হিসেবে। এই শিক্ষার্থীরা জলবায়ু নিয়ে পাঠচর্চা করে, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক আয়োজন, স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম, বিভিন্ন ক্যাম্পেইন, সভা-সেমিনার, জলবায়ু সামিটসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে ক্রমান্বয়ে নিজেদের বৈশ্বিক পৃথিবীর সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম হবে।

মিরপুর ল্যাবরেটরি গার্লস ইনস্টিটিউট জলবায়ু ক্লাব গঠনের মধ্য দিয়ে প্রথম এ যাত্রার সূচনা হয়। পরবর্তীকালে যাত্রা করেছে শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় জলবায়ু ক্লাব। এভাবে ক্রমান্বয়ে ঢাকার প্রায় সব স্কুল এবং তারই ধারাবাহিকতায় দেশের সব স্কুলে জলবায়ু ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে জলবায়ু প্রতিরোধে বিস্তৃত কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে গ্লোবাল সেন্টার ফর ইনোভেশন অ্যান্ড লার্নিং(জিসিএফআইএল)। প্রতিষ্ঠানটির এমন সময়োপযোগী উদ্যোগকে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষিকা সাধুবাদ জানিয়ে এই ক্লাবকে তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জলবায়ু ও পরিবেশ সচেতন করতে দায়িত্ব গ্রহণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীরা পরিবেশ সচেতনতায় এমন একটি ক্লাবের অংশ হতে পেরে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। তারা ভবিষ্যৎকে পরিবেশসম্মত ও সুন্দর করে তুলতে চায়। এই ক্লাব পরিচালনার মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে জলবায়ু নেতা হিসেবে তৈরি করতে চায়। 
জলবায়ু ক্লাব গঠনে এগিয়ে আসতে চাইলে গ্লোবাল সেন্টার ফর ইনোভেশন অ্যান্ড লার্নিংয়ের ওয়েবসাইট (gcfil.us) কিংবা অফিশিয়াল মেইল [email protected] এ যোগাযোগের জন্য আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এটি মূলত অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ ও উন্নয়ন কার্যক্রম, যেখানে সব শ্রেণির প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এই উদ্যোগের সহযোগী হতে পারেন।