গল্পের ভেতর মানুষের মুখ
গল্প সময়ের দলিল। গল্প হৃদয়ের ভাষা। সেই গল্পকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘পরমকথা’, যেখানে শব্দের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভাবনা। মতের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সাহিত্য।
এটি কোনো আনুষ্ঠানিক পাঠসভা নয়। এটি গল্পের এক আন্তরিক আয়োজন। এখানে মিলিত হন দেশের স্বনামধন্য গল্পকার, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যসমালোচক ও পাঠক। সবাই আসেন গল্পের ভেতর প্রবেশ করতে, গল্পকে বুঝতে, গল্পকে নতুন চোখে দেখতে।
পরমকথার ৭৯তম আসরও ছিল তেমনি এক উজ্জ্বল বিকেল। রাজধানীর সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের তৃতীয় তলায় জমেছিল সাহিত্যপ্রেমীদের প্রাণবন্ত সমাবেশ। অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল গল্পের আবহ। ছিল মনোযোগী শ্রোতা। ছিল আলোচনার গভীরতা।
সেদিন নতুন গল্প পড়েন অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক আবুল ইসলাম শিকদার। গল্প পড়েন ছড়াকার ও থিয়েটারকর্মী মাহবুবা হক কুমকুম। দুটি ভিন্ন স্বরের গল্প। দুটি আলাদা অভিজ্ঞতা। দুটি পৃথক জীবনবোধ।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
গল্পপাঠ শেষেই শুরু হয় আলোচনা। কেউ ভাষা নিয়ে বললেন। কেউ চরিত্র নিয়ে। কেউ নির্মাণশৈলী নিয়ে। কেউ প্রশ্ন তোলেন। কেউ ভিন্নমত জানান। আবার কেউ গল্পের অন্তর্নিহিত দর্শন খুঁজে দেখেন। মতের ভিন্নতা ছিল। কিন্তু সৌজন্যের অভাব ছিল না। এটাই পরমকথার সৌন্দর্য। এখানে প্রশংসা যেমন আছে, তেমনি আছে সমালোচনাও। তবে সেই সমালোচনা আঘাত করার জন্য নয়। আরও ভালো লেখার পথ দেখানোর জন্য। একজন লেখকের পাশে আরেকজন লেখকের দাঁড়িয়ে থাকার জন্য।
আসরের প্রতিটি মুখে ছিল মনোযোগ। প্রতিটি চোখে ছিল কৌতূহল। হাতে ছিল গল্পের কাগজ। মনে ছিল সাহিত্যের প্রতি গভীর টান। কেউ পড়ছেন। কেউ শুনছেন। কেউ নোট নিচ্ছেন। আবার কেউ নীরবে ভাবছেন। একটি গল্প কতভাবে পাঠ করা যায়, তারই যেন জীবন্ত অনুশীলন।
পরমকথার আরেকটি বড় শক্তি এর আন্তরিক পরিবেশ। এখানে বড়-ছোটর দূরত্ব নেই। প্রতিষ্ঠিত লেখক ও নবীন গল্পকার একই বৃত্তে বসেন। একই আলোচনায় অংশ নেন। একই মনোযোগে একে অন্যকে শোনেন। সাহিত্য এখানে অহংকার নয়। সাহিত্য এখানে সংলাপ।
আজকের সময়ে, যখন গভীর পাঠের অভ্যাস ক্রমেই কমছে, তখন পরমকথার মতো আয়োজন নতুন আশার আলো জ্বালায়। কারণ ভালো সাহিত্য শুধু লিখে তৈরি হয় না। ভালো সাহিত্য তৈরি হয় পাঠে। আলোচনায়, প্রশ্নে, আত্মসমালোচনায়।
পরমকথা সেই চর্চারই একটি সুন্দর ঠিকানা, যেখানে গল্প শেষ হলেও আলোচনা শেষ হয় না। একটি গল্প থেকে জন্ম নেয় আরেকটি ভাবনা। আর সেই ভাবনাই সাহিত্যকে এগিয়ে নেয়।
পরমকথা তাই শুধু একটি গল্পপাঠের আসর নয়। এটি গল্পকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক নান্দনিক সাহিত্যি পরিবার, যেখানে শব্দের প্রতি ভালোবাসাই সবার বড় পরিচয়।