বাংলায় বারবার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পরিবর্তনের কারণে স্থাপতিক উন্নয়নে কালক্রমে ভিন্নতার সৃষ্টি হয়, যা স্থাপত্যের দুনিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করে। এ ভিন্নতা ইতিবাচক, এ ভিন্নতা সমৃদ্ধশীল ইতিহাসের দর্পণ, ভিন্নতা মনে করিয়ে দেয় প্রাচীন, মধ্যযুগ, রাজকীয় মোগল ও পরবর্তী সব সময়ের কথকতা। ইতিহাসে নতুন যুগের আবির্ভাব মানে নির্মাণ বা বিনির্মাণ। সময়ের হাত ধরে বাংলাদেশের বয়স ৫০ বছর হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশ, কিন্তু এ ভূখণ্ডের বয়স অতিপ্রাচীন। প্রাচীন তার কলা ও সাংস্কৃতিক ধারা, আবহমান ও বুদ্ধিদীপ্ত। নদীবিধৌত এ সমতলে স্থাপত্যের প্রকাশ ব্যক্ত করা সহজ বিষয় নয়, ওই সব প্রত্নতত্ত্ব সাইটে দাঁড়িয়ে আপনি অনুধাবন করতে পারবেন, অনুভব করতে পারবেন—কীভাবে এসব স্থাপত্যশৈলী নির্মিত হয়েছিল, বাতাসে শুনতে পাবেন অস্পষ্ট কিছু ফিসফাস, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবেন ধ্বংসস্তূপের দিকে। আমি পাহাড়পুর তথা সোমপুর বৌদ্ধবিহারের কথা বলছি। শুধু এক পাহাড়পুর নয়, এই বঙ্গভূমির আনাচকানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পুরাকীর্তি। সব কটিরই অভিজ্ঞতা একক মানের। আমি বলতে চাচ্ছি, আমাদের স্থাপতিক ইতিহাস অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে আজও বহমান, তার মধ্যে সামাজিক সাংস্কৃতিক বেষ্টনী, রাজনৈতিক পটভূমিকার মাধ্যমে প্রভাবিত। এত কিছু বলার উদ্দেশ্য আছে, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বহমান ধারা, স্থাপত্য ও রাজকাহন একই সূত্রে গাথা।

বাংলাদেশের স্থাপত্যের ইতিহাসের সঙ্গে বিশেষ কিছু ভবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ভবনগুলো বাংলাদেশের জন্মলগ্নের স্মৃতি বহন করে। এ ভূখণ্ডের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার উৎস বেশ কিছু স্থাপনাকেন্দ্রিক, যা সব বাঙালির হৃদয়ে বিরাজ করে। এমন কিছু স্থাপনা আজও বাংলাদেশের জন্মের দলিলরূপে অম্লান।

উদাহরণস্বরূপ, রোজগার্ডেন, কে এম দাস লেন, টিকাটুলী, পুরান ঢাকা, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ফটক, বর্ধমান হাউস (বাংলা একাডেমি), মধুর ক্যানটিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা ভবন (স্থাপত্যাচার্য মাজহারুল ইসলামের অনবদ্য সৃষ্টি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঐতিহাসিক কার্জন হল, রমনা পার্ক এলাকা, এস এম হল ইত্যাদি। এসব স্থাপনার সঙ্গে এ দেশের কীর্তিমান ব্যক্তিদের, গোষ্ঠীর বা দেশ ও জাতির লালিত স্মৃতি অনুপ্রেরণারূপে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাতিঘর হয়ে দিকনির্দেশনা দেবে।

ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র, টিএসসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যতিক্রম কিছু নয়। ষাটের দশকে নির্মিত এ স্থাপত্যকলা সমসাময়িক দৃষ্টান্ত, গণজমায়েতের উদ্দেশে ভবনটির আবির্ভাব।

চিত্তাকর্ষক ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানপিপাসুদের শুধু মিলনকেন্দ্র নয়, বরং সর্বসাধারণের ছাত্রছাত্রীদের মিথস্ক্রিয়ার পরিসর। এ স্থাপত্যটির সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কত কিছু যে জড়িয়ে রয়েছে, কত আন্দোলন, আলোচনা, কত অভিলাপ, কত পরিকল্পনা কত অভিপ্রায়, কত ত্যাগ..., এমনি অনেক ঘটনার প্রাণকেন্দ্র এই টিএসসি। মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম, নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টির সন্ধিক্ষণ, স্মরণবেদনা এবং অর্জনের চাঁদোয়া এই টিএসসি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে ভবনটির। পৃথিবীতে এ ঘটনা বিরল।

১৯৬১ সালে গ্রিক স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ কনস্ট্যান্টিনোস এপোস্টোলো ডক্সিয়াডিসের (১৯১৩-১৯৭৫) কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে ভবনটির অভিষেক ঘটে। স্থাপতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভবনটির মেজাজ বদ্বীপের বসতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। একজন গ্রিক স্থপতি এই দেশের কৃষ্টি, জলবায়ু, সংস্কৃতি, আচার–আচরণ ও স্বদেশজাত সহজাত স্থাপত্যের প্রতি বিনীত ও শ্রদ্ধাশীল হয়ে জ্ঞান আহরণ করেন এবং ক্রান্তীয় এলাকায় গণজমায়েত সর্বস্ব স্থাপনার সুচিন্তিত দৃষ্টান্ত গড়ে তোলেন, যা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়। উপমহাদেশে ষাটের দশকের সময় ক্রান্তীয় আধুনিকতার শৈলীর (Tropical Modernism Style) প্রথম দিকের উদাহরণ বলা যায়। ভবনের তিনটি বড় স্থাপনা রয়েছে, প্রথম ভবনটি অফিস, ক্লাব, সংস্কৃতি ক্রিয়াকলাপের জন্য রিহার্সাল কক্ষ ইত্যাদি দ্বারা পরিবেষ্টিত। মধ্যখানের বিশালাকৃতির ভল্ট টি মিলনায়তন ও বহুমুখী অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন হয়, এবং সর্বশেষ দক্ষিণের ভবন ক্রমান্বয়ে খেলাঘর ও ক্যাফেটেরিয়া। পশ্চিমে ছোট উঠানসমেত চৌবাচ্চা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনটি ভবন চিকন লম্বা আলো-বাতাস পূর্ণ করিডর দ্বারা সংযুক্ত, মানে বর্ষাকালে না ভিজে যেকোনো ভবনে বা কক্ষে চলে যাওয়া যাবে। চিকন ওই করিডরগুলো মালার মতো যোগসূত্র স্থাপনে সচেষ্ট। করিডরের পূর্ব পাশে সবুজ ঘাসে ভরা বিশাল উঠান দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র বললে ভুল হবে না। উঠানটি গ্রামবাংলার আবহমান পরিকল্পনাপ্রসূত। বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিসরটি উপস্থাপন করা হয়েছে। এই বিশালাকার সবুজ উঠান গলে আলো-বাতাসে পরিপূর্ণ হয় ভবন চত্বরটি।

ভবনটির ছাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য সুচিন্তার দাবিদার! ভাসমান প্রজাপতি পারাসল ছাদটি ভবনের দালান থেকে শুনে ক্ষীণ কলামের দ্বারা সংযুক্ত। বিশেষ এই ছাদটি গরম বাতাসকে ওপরে তুলে দেয়, ঠান্ডা বাতাস আসতে সাহায্য করে। বড় ওই ভাসমান ছাদটির কারণে ভবনটি আরামদায়ক তাপমাত্রা তৈরি করতে সক্ষম হয়।

প্রথম ভবনে আরও কিছু উপাদান আছে, যা ভবনটির ঝিল্লির স্তর স্বরূপ। পশ্চিমের খররৌদ্র থেকে রক্ষা করে, তাপমাত্রা হ্রাস করে, ফলে ভবনে অনুকূল তাপমাত্রা বিরাজ করে। অনুভূমিক ও উল্লম্ব লুভারের মাধ্যমে প্রখর সূর্যরশ্মিকে বিভাজনের প্রক্রিয়াটি প্রশংসার দাবিদার, পূর্ব-পশ্চিম বরাবর প্রলম্বিত ভবনটি উত্তর-দক্ষিণের উন্মুক্ত। ফলে অবিরাম বাতাসপ্রবাহ ভবনের পুরো অংশজুড়ে বিদ্যমান।
মিলনায়তনটির আকার-অবয়ব মনে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের সব ছাত্রছাত্রীর ‘মনের ছবির’ মতো।

টিএসসির কথা তাদের মনে পড়লেই আর্চ আকৃতিবিশিষ্ট মিলনায়তনটির ছবি মানসপটে ভেসে ওঠার কথা। বিশাল ভল্ট আকৃতির ছাদটি গণজমায়েতের জন্য বিশেষ উপযোগী, এর উচ্চতা, আকার, আলো-বাতাসের আসা-যাওয়া, বাহির-প্রান্ত বারান্দা ইত্যাদি একে ওপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং স্থাপতিক সমাধানে সমৃদ্ধ।

প্রাচীন বাংলায় গণজমায়েতের স্থানগুলো যেন এমনই হতো; একটু ভেঙে বলি, হাজার বছর আগে পাল যুগে আদি বাংলায় উপাসনালয়ের অস্তিত্ব ছিল। শালবনবিহারের বিচ্ছিন্ন একক মন্দিরগুলো, পাহাড়পুরের কেন্দ্রীয় চতুর্মুখী স্তূপ মন্দিরের একেকটি প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট হলঘর, আবার কুমিল্লার ত্রিরত্নের (কুড়িলামুরা প্রত্নস্থল) তিনটি স্তূপের পেছনে তিনটি চৈতহল (ধ্বংসপ্রাপ্ত), আবার ভারতবর্ষের অজন্তা-এলোরা’র গুহা স্থাপত্যের চৈতহল আমাদের মনে করিয়ে দেয় একযোগে ধ্যানচর্চার সম্পর্ক স্থাপনের কথা। এসব প্রাচীন স্থাপতিক উদাহরণের আলোকে টিএসসির চোখজুড়ানো মিলনায়তনটি হয়তো অতীত আর বর্তমানের মেলবন্ধন।

আবার দক্ষিণ প্রান্তের ভবনটি লম্বা করিডর দ্বারা সংযুক্ত। এ ভবনটিতে ক্যাফেটেরিয়া, গেম রুমসহ আরও কিছু সংগঠনের অফিস আছে। এ ভবনটির ছাদের নকশাশৈলী গ্রামবাংলার দোচালা ছাদের ক্রমাগত ধরনস্বরূপ, বিশালাকার সবুজ মাঠের উঠানের অপর দিক থেকে দেখে মনে হয় দিগন্তে যেন গ্রামের মেলা বসেছে। এই স্থাপনাটিতে বাংলার গ্রামীণ পরিসরের ধ্রুপদি রূপ ফুটে উঠেছে। ভবনের এই অংশে ভেতরে গেলে দুই উচ্চতায় ছাদের বিন্যাস দেখা যায়। অনেক মানুষের সমাগমের জন্য অনুকরণীয় উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত ক্যাফেটেরিয়াটি।  

দীর্ঘ করিডরটি পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টির মাধ্যমে ভেতরের ও বাইরের পরিসরের সঙ্গে অন্যমাত্রায় প্রাণবন্ত সম্পর্ক স্থাপন করে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দময় সময়ের উপাখ্যান।

টিএসসি ভবনটি স্থাপত্য শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন শিক্ষাসফরে এ পরিসরে আনা হয়, তারা অনুপ্রাণিত হয়, তারা অবাক হয়ে অনবদ্য স্থাপত্যগাথার নির্মাণশৈলী অবলোকন করে, ক্রান্তীয় আধুনিক স্থাপত্যের জলজ্যান্ত উদাহরণ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। শাণিত করে তাদের প্রতিভা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ল্যান্ডমার্ক টিএসসি সব অগ্রজ ও অনুজ, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, বর্তমান ও আগামীর প্রজন্মের জ্ঞানপিপাসুদের, এমনকি ঢাকাবাসীর স্মৃতির সেই চৌকাঠটি; কেউ এই চৌকাঠ পার হয়েছেন, আবার কেউ পার হবেন, সবার স্মৃতি হৃদয়ে লালন করবেন। শিক্ষাজীবনের সুন্দর মুহূর্ত, হাসি–কান্না, রাগ–অনুরাগ, অর্জনের সন্ধিক্ষণ একটি ভবনের সঙ্গে মিলেমিশে আছে। আমাদের দেশের মানুষের সঙ্গে যোগে-বিয়োগে টিএসসি ও তার পরিসর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

টিএসসি ভবন আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের গৌরব। বিশেষ ঘটনাবলির কেন্দ্রবিন্দু এমন একটি স্থাপত্য আমাদের চেতনা, অনুপ্রেরণা দেয় সম্মুখপানে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। আধুনিক ঐতিহ্যরূপে একে আমাদের স্বীকৃতির তালিকায় নিবন্ধিত করা যায়। সময়ের প্রয়োজনে স্থান সংকুলান একটি বৃহৎ সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণে, নতুন স্থাপনা চত্বরের প্রয়োজন, অন্যদিকে ঐতিহাসিক পটভূমির সঙ্গে সম্পর্কিত এ স্থাপত্যধারা, এর সংরক্ষণ শিরোধার্য। নতুন টিএসসির জন্য নিশ্চয়ই জায়গার ব্যবস্থা হবে, কিন্তু ঐতিহ্যমণ্ডিত ৬০ বছরের নবীন টিএসসি ভবন আলোকিত করে রেখেছে আমাদের স্মৃতিপট, দেয় দিকনির্দেশনা, জাতির গভীর সংকটে আলোর বিচ্ছুরণে পথপ্রদর্শন করে বাতিঘরের ন্যায়। পারি না আমরা তাকে বাঁচিয়ে রাখতে...!
   
* লেখক: স্থপতি সাজিদ বিন দোজা, বিভাগীয় প্রধান, স্থাপত্য বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ