‘মেঘ বলছে যাব যাব’, বর্ষার বিদায়বেলায় বাকৃবিতে উৎসব

বর্ষার আকাশে জমে থাকা মেঘ যেন বিদায়ের বার্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কখনো ঝুম বৃষ্টি, কখনো মেঘের আড়ালে সূর্যের লুকোচুরি খেলা। প্রকৃতির এমন এক সন্ধিক্ষণে বর্ষাকে বিদায় জানাতে প্রস্তুতি নিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) টিম উৎসব। বাঙালির চিরচেনা বর্ষা, লোকঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলা, সঙ্গে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসকে একমঞ্চে নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো বর্ষা বিদায়ের বিশেষ আয়োজন ‘মেঘ বলছে যাব যাব’।

বাকৃবির সাংস্কৃতিক সংগঠন টিম উৎসব আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে গান, নাচ, নাটকসহ ছিল নানা রকমের আনন্দঘন আয়োজন। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ষাকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি বাংলার শিকড়ের সঙ্গে যে একটা গভীর সম্পর্ক আছে, তা গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

মেঘের মঞ্চে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস—

বর্ষার সৌন্দর্য মানেই যে শুধু বৃষ্টি তা নয়; বরং বৃষ্টিভেজা বিকেলে সবাই একসঙ্গে বসে গানের সুর মেলানো, কখনো কবিতা আবৃত্তি, আবার কখনো আড্ডায় হারিয়ে যাওয়া। আড্ডায় থাকে শৈশবের স্মৃতিচারণা। কিংবা সুখ–দুঃখের আলাপন। সেই অনুভূতিকে ধারণ করে সাজানো হয়েছে এ অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘মেঘের মঞ্চ’। সবাই যেন আজ নিজ নিজ জায়গা থেকে সরে এসে একসঙ্গে তাঁদের এ অনুভূতি উদ্‌যাপন করেন। এই মঞ্চে গানের সুরে, নাচের তালে ফুটে ওঠে বর্ষার নানা রূপ। কখনো রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান। কখনো লোকজ সুর। আবার কখনো তরুণদের নিজস্ব পরিবেশনা। সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটি যেন হয়ে উঠেছে সংস্কৃতির এক বর্ণিল মিলনমেলা।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

আধুনিকতায় দ্রুত পরিবর্তনের কারণে লোকঐতিহ্যের অনেক উপাদান ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এমন আয়োজন ঐতিহ্যকে স্মরণ ও উদ্‌যাপনের পাশাপাশি তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও সুযোগ তৈরি করে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতির অন্যতম অকর্ষণ তার বৈচিত্র্য। দেশের একেক অঞ্চলের খাবার, কারুশিল্প ও পণ্যে রয়েছে আলাদা আলাদা ঐতিহ্য। সেই বৈচিত্র্যকে তুলে ধরতে আয়োজন করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জিআই পণ্য ও বৈচিত্র্যময় স্টল প্রদর্শনী।

বর্ষার সঙ্গে কাগজের নৌকার সম্পর্ক যেন বাঙালির শৈশবেরই একটি অংশ। বৃষ্টির পানিতে কাগজের নৌকা ভাসানোর সেই ছোট্টবেলার আনন্দ অনেকের স্মৃতিতেই আজও জীবন্ত। সেই শৈশবের স্মৃতিকে আবারও ফিরিয়ে আনতে ছিল কাগজের নৌকা ভাসানোর আয়োজন।

শিক্ষার্থীরা ফিরে যায় তাদের শৈশবের সেই সোনালি দিনগুলোতে। যেখানে আনন্দের জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন ছিল না। বৃষ্টির পানিতে কাগজের নৌকা ভাসানোই যথেষ্ট ছিল।

সংস্কৃতির পাশাপাশি ছিল বিনোদনের নানা আয়োজন। বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিয়ে আকর্ষণীয় পুরস্কার জেতার সুযোগ।

ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা, ক্লাস-পরীক্ষার চাপের একঘেয়েমি কাটিয়ে তুলতে এমন আয়োজন শিক্ষার্থীদের জন্য হয়ে ওঠে আনন্দ ও স্বস্তির এক উপলক্ষ। এ অনুভূতি নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে বাকৃবির ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্টের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ক্যাম্পাসে কখন এ রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে, সে আশা নিয়ে থাকি। এ অনুষ্ঠানগুলো একঘেয়েমি কাটার পাশাপাশি সবাই মিলে একটা উৎসবের আমেজ তৈরি করে। যা আমাদের দৈনন্দিন ক্লাস–পরীক্ষার চাপ কাটাতে অনেক সাহায্য করে। টিম উৎসবকে অনেক ধন্যবাদ এত সুন্দর একটা আয়োজন করার জন্য।’

আয়োজন সম্পর্কে টিম উৎসবের সাধারণ সম্পাদক যাহ্’রা তাসনীম আদিবা বলেন, ‘প্রথমে শুনলে মনে হতে পারে যে রবীন্দ্রনাথেরই কোনো বিখ্যাত গানের লাইন মনে হয় আমরা লিখতে একটু ভুল করে ফেলেছি। ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। শ্রাবণ প্রায় যায় যায়। সে ভাবনা থেকে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত লাইনটিকে একটু পরিমার্জনা করে আমাদের এই প্রোগ্রামের নামকরণটা করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের ক্যাম্পাসে প্রোগ্রামের আয়োজনগুলো একটু কমে এসেছে। তাই আমরা চেষ্টা করছি একটা ভালো উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করতে। আমরা আশাবাদী, এই আয়োজনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে আবারও একটি সুন্দর ও প্রাণবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে।’

টিম উৎসবের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ বলেন, ‘বাকৃবিতে বিভিন্ন এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস কমে যাচ্ছে। আমরা সেটা পুনরুত্থান করতে চাচ্ছি। পড়ালেখাকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামগুলা হলে শিক্ষার্থীরা তাদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারবে। নবীনরাও এতে উৎসাহ পাবে।’

মেঘ যখন সত্যিই বলে উঠছে ‘যাব যাব’, তখন তার বিদায়কে বিষণ্নতায় দিয়ে নয়; বরং গান, নাচ, নাটক, লোকঐতিহ্যের মাধ্যমে বিদায় দিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন টিম উৎসব।

*লেখক: সাইয়্যেদা গালিবা রুহী, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়